পর্তুগাল ২( রোনাল্ডো-পেনাল্টি, র্যামোস) ক্রোয়েশিয়া ১ (পেরিসিচ)
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: মন ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্ত। ম্যাচ শেষে টরেন্টোর মাঠে একরাশ হতাশা নিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তী ফুটবলার বহু লড়াইয়ের নায়ক লুকা মদ্রিচ। বেদনাভরা মুখে নিজের কান্নাটা লুকোনোর আপ্রাণ চেষ্টা। মাথাটা নাড়ছিলেন লুকা এমনভাবে, যাতে বোঝা যাচ্ছিল, দেশের জার্সিতে রাউন্ড অফ ৩২য়ে পর্তুগালের কাছে ১-২ গোলে হেরে ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের আসর থেকে বিদায় নেওয়াটা মানতে পারছেন না। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার রানার্স ও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান পাওয়ার পিছনে মদ্রিচের ভূমিকা সকলেরই জানা। কিন্তু ২০২৬য়ে ক্রোয়েশিয়ার দৌড় থেমে গেল নকআউটের প্রথম পর্যায়ে। বলা ভাল মদ্রিচের হল সারা, আর পর্তুগালের মেগা তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন,আশা জিইয়ে থাকল আরও এক ম্যাচ। শেষ ষোলোয় স্পেনের মুখোমুখি হবে পর্তুগাল। মেসি-রোনাল্ডো দ্বৈরথ আদৌ দেখা যাবে কিনা চলতি বিশ্বকাপে, আর সেটাও শেষ বারের জন্য, স্পেনের ইয়ামাল আর পর্তুগালের রোনাল্ডোর মধ্যে কে বাজিমাত করেন পরের রাউন্ডে, তার ওপর নির্ভর করছে সবকিছু।
ফুটবলের গ্রেটরা এমনই হন। মদ্রিচ যখন ম্যাচ শেষে হারের যন্ত্রণায় বিদ্ধ, তখন ম্যাচ জেতার সাময়িক উচ্ছাস প্রকাশ করে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলেন পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। বুকে জড়িয়ে ধরলেন মদ্রিচকে পরম শ্রদ্ধায়। দেশের জার্সিতে শেষবার খেলে ফেললেন মদ্রিচ এটা বলেই ফেলা যায়। পর্তুগাল হারলে ক্রিশ্চিয়ানোরও এটাই দেশের জার্সিতে শেষ ম্যাচ খেলা হয়ে যেত। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হারের দিন রোনাল্ডোর কান্না গ্যালারির প্রেসবক্সে বসে দেখেছিলাম। হারের ব্যথা রোনাল্ডো জানেন বলেই বন্ধু মদ্রিচকে সান্ত্বনা দিতে দ্বিধা করেননি রোনাল্ডো। মদ্রিচকে কিছু একটা বললেন। হয়ত এটাই বললেন, তোমার দল ক্রোয়েশিয়া আজ হেরেছে ঠিকই, তবে তুমি হারোনি। তুমি সারাজীবন বিশ্বের মানুষের হৃদয়ে থেকে যাবে। এটাই তো তোমার জিত। তারপর মদ্রিচকে আরও একবার আলিঙ্গন করলেন রোনান্ডো। খেলার মাঠে এই সুযোগ তো আর আসবে না। রোনান্ডোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন মদ্রিচের।
এরপর একে একে সতীর্থরা তো বটেই, পর্তুগালের সব ফুটবলাররা মদ্রিচের সঙ্গে হাত মেলালেন, কেউ কেই বুকেও জড়ালেন ফুটবলের এক লড়াকু যোদ্ধাকে। অনেকেরই হয়ত জানা আছে, ফুটবল মাঠে আসার আগে মদ্রিচের জীবন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এক শরনার্থী শিবিরে। ক্রোয়েশিয়ার গৃহযুদ্ধে পরিবারের নিকট আত্মীয়দের প্রাণ যাওয়ার পর বাড়ি ফেরা হয়নি মদ্রিচের। প্রাণ বাঁচাতে পরিবারের জীবিত সদস্যদের সঙ্গে তাঁর ঠাই হয়েছিল শরণার্থী শিবিরে। সেখান থেকে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখা ও লড়াই শুরু। পরে এসেছে ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও অনেক সাফল্য। একটা সময় সবাইকেই থামতে হয়। সেটা সবসময় মধুর হয় না। মদ্রিচের ক্ষেত্রেও এই বিদায় বেদনার হলেও, তাঁর বিজায় ‘বিজয়ী’ বীরের মতোই।
একটা সময় মনে হয়েছিল পর্তুগালকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় পৌঁছে যাবে ক্রোয়েশিয়া। প্রথামার্ধ গোলশূণ্য থাকার পর ৫৩ মিনিটে গোল করে ক্রোয়েশিয়াকে এগিয়ে দেন পেরিসিচ। কিন্তু ফুটবল দেবতা যখন সহায় থাকেন, তখন পর্তুগালের অকাল বিদায় সম্ভব হবে কীভাবে? ৬৮ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে সমতা ফেরান ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। বক্সের মাঝে ভেসে আসা বল রুখতে ক্রোয়েশিয়ার নিকোলা ভ্লাসিচ কোমর জড়িয়ে ধরে রেনাতো ভেইগাকে ফেলে দিলে, রেফারি ভার প্রয়োগ করে পেনাল্টি দেন পর্তুগালের অনুকূলে। রোনাল্ডো পেনাল্টি কাজ লাগাতে কোনও ভুল করেননি। এটা তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। জানলে অবাকই হবেন, এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোল পেলেন রোনাল্ডো।
গোল হজম করে দমেনি ক্রোয়েশিয়া। আক্রমণের ঝড় তুলেছিল পর্তুগাল বক্সে। ক্রোয়েশিয়ার একটি প্রচেষ্টা পোস্টে লেগে ফেরে। প্রমাদ গোনেন পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্টিনেজ। আগেই চারটি বদল করেছিলেন সমতা ফেরানোর আগে। দলের খেলায় তরতাজা ভাব আনতে ৮১ মিনিটে তুলে নেন রোনাল্ডোকে। সেসময় রোনাল্ডোর মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল কোচের সিদ্ধান্ত। গভীর উদ্বেগ নিয়ে রিজার্ভ বেঞ্চের ধারে বসেছিলেন তিনি। স্বস্তিব নিঃশ্বাস ফেলেন রোনাল্ডো ৯৪ মিনিটে রাফায়েল লিয়াওয়ের ক্রশে সুপার সাব র্যামেস হেড গোল করে পর্তুগালকে মোক্ষম সময়ে ২-১ এগিয়ে দিলে। নিজের উচ্ছ্বাস ধরে রাখতে না পেরে মাঠে ঢুকে র্যামসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন রোনাল্ডো সতীর্থদের সঙ্গে। আসলে ওই গোলটাই বিশ্বকাপে আরও একটা ম্যাচ খেলার অক্সিজেন জোগাল যে তাঁকে।
তবে শেষমুহূর্তের নাটক রোনাল্ডোকে কয়েক মুহূর্তের জন্য চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। ১০৩ মিনিটের মাথায় ক্রোয়েশিয়া গোল শোধের মরিয়া চেষ্টা চালায়। বক্সের ভেসে আসা বল ক্লিয়ার করতে রুবেন নাভাস নিজের গোল বল পাঠিয়েছিলেন। ক্রোয়েশিয়া ফুটবল শিবির ও সমর্থকরা যখন সমতা ফেরানোর গোল ভেবে আনন্দ আত্মহারা, তখন রেফারি ভার প্রয়োগ করে ওই গোল বাতিল করেন অফসাইডের কারণে। আর সময় ছিল না ক্রোয়েশিয়ার হাতে হার বাঁচানোর।
স্মরণীয় এমন একটা জয়ের রাতে সাময়িক আনন্দ প্রকাশ করলেও পর্তুগালের ফুটবলারদের চোখে মুখে শরীরি ভাষায় একটা কষ্ট ধরা পড়ে ম্যাচের শেষ হওয়ার অল্প কিছুক্ষণ বাদেই। সেটা বোঝা গেল রোনাল্ডোদের আচরণে। সিআর সেভেন নিজের ৭ নম্বর জার্সির ওপর ততক্ষণে পরে নিয়েছেন ২১ নম্বর জার্সি। সতীর্থ ফুটবলারদের কয়েকজনের হাতেও ২১ নম্বর জার্সি। আসলে এটা প্রয়াত সতীর্থ দিয়েগো জোটার জার্সি। ঠিক একবছর আগে এইসময় গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন জোটা। ম্যাচের আগেই কোচ মার্টিনেজ বলেছিলেন, জোটার প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে পর্তুগাল দল, ফল যাই হোক না কেন। সেই শ্রদ্ধাই অর্পণ করলেন রোনাল্ডো এ তাঁর সতীর্থরা। মাঠের একধারে গ্যালারিতে থাকা পর্তুগালের সমর্থকদের দিকে মুখ করে একসাথে দাঁড়িয়ে দিয়েগো জোটার ২১ নম্বর জার্সিটা তুলে ধরলেন তাঁরা। এক আশ্চর্যরকম নীরবতা তখন গ্রাস করেছিল গোটা মাঠে। জয়ের মাঝেও জোটার জন্য সকলের মন ডুকরে কেঁদে উঠেছিল। রোনাল্ডো নিজে উদাস নয়নে চেয়ে ছিলেন আকাশের দিকে। জোটার কথা ভেবে তাঁর চোখের কোন চিকচিক করছিল।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
