Cart Total Items (0)

Cart

All Sports India

সুচরিতা সেন চৌধুরী: বয়স এখন বাইশের কোটায়। ‘গ্র্যান্ডমাস্টার’ হয়েছেন ২০২০-তে। কিন্তু পরিস্থিতির বদল হয়নি। প্রথমে ভেবেছিলেন,‘ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার’ হলে দিন ফিরবে। তার পর মনে হল,‘গ্র্যান্ডমাস্টার’ হলে কিছু হবে। এবার ভাবছেন, ২৬০০ রেটিং হলে কিছু হবে! লক্ষ্যটা ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে। তিনিও এভাবে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলেছেন। সমর্থন না পাওয়ার হতাশাকে সঙ্গে নিয়েই স্বপ্ন দেখছেন দাবাকে নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার। এবার কি কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে—প্রশ্ন ‘গ্র্যান্ডমাস্টার’ মিত্রাভ গুহ-এর।

প্রশ্ন: দাবা খেলার ইচ্ছেটা কবে থেকে শুরু?

মিত্রাভ: প্রথম জন্মদিনে আমি একটা দাবার বোর্ড উপহার পেয়েছিলাম। তার পর যখন বুঝতে শিখলাম তখন আগ্রহ তৈরি হল। সেটা দেখে বাবা আমাকে ‘দিব্যেন্দু বড়ুয়া অ্যাকাডেমি’তে ভর্তি করে দিল। তখন আমার বয়স চার।

প্রশ্ন: চার বছর বয়সে কোচিং শুরু করে প্রথম প্রতিযোগিতা এবং সাফল্য কবে এল?

মিত্রাভ: যে বছর অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়েছিলাম, সেই বছরই প্রথম টুর্নামেন্ট খেলি। প্রথম চ্যাম্পিয়ন হই অনূর্ধ্ব-৭ স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে, সেটা ২০০৬ সাল।

প্রশ্ন: সেই চার বছর বয়স থেকে টুর্নামেন্ট খেলা। একটা দীর্ঘ সময়।এখনও পর্যন্ত কেরিয়ারে সব থেকে কঠিন প্রতিপক্ষ কাকে পেয়েছেন?

মিত্রাভ: অনেক টুর্নামেন্টই খেলেছি। যেগুলো হেরেছি, সেগুলো কঠিন ছিল। যেমন ওয়ার্ল্ড র‌্যাপিডে খেলেছিলাম লেভন অ্যারোনিয়নের সঙ্গে। বিশ্বের সেরা পাঁচ জনের মধ্যে একজনের সঙ্গে খেলার সুযোগ ওই প্রথম। অন্যরকম অভিজ্ঞতা ছিল সেটা। ম্যাগনাস কার্লসনের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতাও অনবদ্য। কারণ আমি কার্লসেনকে সামনে রেখেই দাবা খেলি। ও যদিও ক্লাসিক্যাল দাবা থেকে নিজেকে প্রায় সরিয়ে নিয়েছে। তবে ওই আমার প্রেরণা।

মিত্রাভ গুহ

প্রশ্ন: গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়া লকডাউনের মধ্যে।সেটা সাহায্য করেছিল না সমস্যা হয়েছিল?

মিত্রাভ: লকডাউনে আমার কোনও সমস্যাই হয়নি। কারণ, সেই সময় ঘরে বসে সারাক্ষণ অনলাইনেই দাবা খেলা হত। এক কথায়, অনলাইনে দাবা খেলাটা সেই সময় থেকেই বেড়ে গিয়েছিল। লকডাউনের সময়েই বাংলাদেশে দুটো গ্র্যান্ড মাস্টার টুর্নামেন্ট হয়েছিল। তাতে কোনও অসুবিধে হয়নি। বরং সুবিধে হয়েছে অনেক। কারণ অনলাইন টুর্নামেন্টে অনেক ‘প্রাইজ মানি’ চলে এসেছে। প্রায় সমান সমান পর্যায়েই চলে এসেছে অনলাইন আর ওভার দ্য বোর্ড টুর্নামেন্ট। সেটা অ্যাডভান্টেজ।

প্রশ্ন: দাবা খেলার ক্ষেত্রে একটা সময়ের পর কোচিং পাওয়াটা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের দেশে। সেটা কেন?

মিত্রাভ: ভারতে তেমন কোচিংয়ের সুযোগ নেই।পশ্চিমবঙ্গে তো আরওই নেই। ভারতে যেটা রয়েছে, সেটা খুব ব্যয়বহুল। বিদেশ থেকে নিতে গেলে তো তা আরও বেশি।স্পনসরশিপ না থাকলে সেই কোচিং নেওয়া প্রায় অসম্ভব সাধারণ ঘরের দাবাড়ুদের পক্ষে।

প্রশ্ন: এই সমস্যার সমাধান তাহলে কী?

মিত্রাভ: আমি কোনও কোচিং নিই না সেভাবে। ২০১৪-র পর থেকে কোনও প্রাইভেট কোচিং নিইনি।নিজে নিজেই অনুশীলন করে নিজেকে প্রতিনিয়ত তৈরি করি। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

প্রশ্ন: এভাবে কী সাফল্য পাওয়া সম্ভব?

মিত্রাভ: এখন মনে হচ্ছে, গ্র্যান্ড মাস্টার পর্যন্ত সম্ভব। কারণ, কোচিং ছাড়াই আমি গ্র্যান্ড মাস্টার হলাম। এর পর জানি না। যেমন ভাবে চলছে, এখন সেভাবেই খেলে যাচ্ছি। এর পরেরটা সত্যিই জানি না।

প্রশ্ন: এর পর তো সামনে বিশ্ব পর্যায়ে অনেক বড় বড় টুর্নামেন্ট থাকবে।যেটা নিশ্চয়ই যে কোনও দাবাড়ুর জন্য স্বপ্ন। সে সব নিয়ে কী ভাবছেন?

মিত্রাভ: আমার পরবর্তী লক্ষ্য, ২৬০০ এলো রেটিং পাওয়া। তার পর ধীরে ধীরে রেটিং বাড়িয়ে ২৭০০-তে পৌঁছনো। তার পর ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য চেষ্টা করা।

প্রশ্ন: কী কী টুর্নামেন্ট খেলতে হবে বা কী পদ্ধতিতে বা কত সময়ের মধ্যে এই রেটিংয়ে পৌঁছনো সম্ভব?

মিত্রাভ: ২৭০০ এখনই বলতে পারছি না। তবে, ২৬০০ মনে করছি আগামী এক দু’বছরের মধ্যে পেয়ে যাব। তার জন্য আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলো খেলতে হবে পর পর।

প্রশ্ন: আগামী কোন কোন টুর্নামেন্টকে লক্ষ্য হিসেবে রাখছেন?

মিত্রাভ: এই বছর চেক প্রজাতন্ত্রে রয়েছে তিনটি টুর্নামেন্ট। জুন-জুলাই মাসে এই টুর্নামেন্টগুলো হওয়ার কথা। এর পর অগস্টে শারজাতে টুর্নামেন্ট রয়েছে। আপাতত এই ক’টাই নিশ্চিত রয়েছে। এর পর এখনও কিছু ঠিক নেই।

মিত্রাভ গুহ

প্রশ্ন: দাবার বাইরে বেরিয়ে যদি জিজ্ঞেস করি, এই মুহূর্তে কেরিয়ারকে আর কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন?

মিত্রাভ: আমি সদ্য গ্র্যাজুয়েশন করলাম। বিবিএ করেছি। ইচ্ছে আছে এমবিএ করার। তবে কেরিয়ার দাবা নিয়েই ভাবছি। দাবা থেকে ‘স্পোর্টস কোটা’য় চাকরির সুযোগ থাকে। সেটাও ভাবছি।

প্রশ্ন: দাবা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কারা আপনার প্রেরণা?এখনও খেলা নিয়ে কাদের সঙ্গে আলোচনা করেন?

মিত্রাভ: এমনিই অনেক বন্ধু রয়েছে।আড্ডা হয়।কথা হয়। কিন্তু খেলা নিয়ে তেমনভাবে কারও সঙ্গে কথা হয় না। নিজের খেলাটা নিজেই তৈরি করি নিজের মতো করে।

প্রশ্ন: কোচিং না নিতে পারা, স্পনসরশিপ না পাওয়াটা কতটা সমস্যার? অন্য রাজ্যের চিত্রটাও কি একই?

মিত্রাভ: বাংলায় তো কোনও স্পনসরশিপ নেই। ২০০০ রেটিংয়ের উপর কোচিং নিতে গেলেই গ্র্যান্ড মাস্টারদের কাছে কোচিং নিতে হবে।যা খুব ব্যয়বহুল হয়ে যায়। অন্য রাজ্যের চিত্রটা একদমই আলাদা। ওদের মোটা টাকা স্পনসরশিপ রয়েছে। মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ুতে সরকারের তরফেই প্রচুর পায়। সঙ্গে প্রাইভেট স্পনসরশিপও থাকে। তাই ওদের কোনও সমস্যাই নেই। ওরা নিশ্চিন্তে বিদেশেও কোচিং নিতে পারে।

প্রশ্ন: গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার পর স্পনসরশিপের চেষ্টা করা বা সরকারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন?

মিত্রাভ: জিএম হওয়ার পর বেশ কয়েকটি বেসরকারি জায়গায় আবেদন জমা দিয়েছিলাম। সরকার প্রতিবার যেমন আবেদনপত্র নেয়, সেটাও জমা দিয়েছিলাম, কিন্তু কিছুই হয়নি। জিএমের পর আশা ছিল, কিছু পাব। এখন ভাবছি, যদি ২৬০০ হওয়ার পর পাই।

প্রশ্ন: এখানে স্পনসর পাওয়ার জন্য সঠিক পদ্ধতিটা কী বা কোথায় পৌঁছলে পাওয়া যায়?

মিত্রাভ: মহারাষ্ট্র বা দক্ষিণ ভারতে যেমন ২২০০ রেটিং, টাইটেলহীন প্লেয়াররাও স্পনসর পেয়ে যায়। আমি আগে ভাবতাম, প্রথমে আইএম হলে স্পনসর আসবে। তার পর মনে হল, জিএম হলে পাব। এখন দেখছি, এটাও যথেষ্ট নয়। এখন ভাবছি যদি ২৬০০ হলে পাই।

প্রশ্ন: এই স্পনসরের অভাবই কি রাজ্যে বেশি পরিমাণে গ্র্যান্ডমাস্টার উঠে আসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

মিত্রাভ: একদমই।এটা অনেক বড় কারণ। আমার বয়সে যেমন ৭-৮ জন ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার রয়েছে। আমরা দু’জন গ্র্যান্ডমাস্টার হলাম। আমরা যদি স্পনসর পেতাম, তাহলে সবাই গ্র্যান্ডমাস্টার হয়ে যেত। সবাই আটকে রয়েছে স্পনসরের জন্য।

প্রশ্ন: আগামীতে বিদেশে টুর্নামেন্ট খেলার কী পরিকল্পনা রয়েছে?

মিত্রাভ: এতদিন যেভাবে খেলেছি, সেভাবেই খেলব। একটা টুর্নামেন্টের পুরস্কারমূল্য দিয়ে পরের টুর্নামেন্টে অংশ নেব। সেভাবে বছরে খুব বেশি হলে দুটো টুর্নামেন্টই বিদেশে গিয়ে খেলতে পারব। তবে আগের থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। অনলাইন টুর্নামেন্টের জন্য। দিন-রাত জেগে অনলাইন টুর্নামেন্ট খেলি। যখনই সুযোগ পাই। সেখান থেকে কিছু টাকা আসে। তবে বড় জায়গায় যেতে গেলে স্পনসর লাগবে।

প্রশ্ন: বাংলার দাবা খেলোয়াড়দের বিভিন্ন রকমের সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে কোচিং সমস্যা। ভবিষ্যতে কি এমন কোনও পরিকল্পনা রয়েছে এই সমস্যা মেটানোর?

মিত্রাভ: হ্যাঁ, তা আছে। আমরা দাবা জগতের বন্ধুরা মিলে একটা অ্যাকাডেমি খুলব। তবে সেটা এখনই না। ৫-৬ বছর পর। আরণ্যক, নিলাশ, কৌস্তভ, শুভায়ন, আমি—সবাই মিলেই এই পদক্ষেপটা করার স্বপ্ন দেখি। যেখানে সব রকমের দাবা খেলোয়াড়রা শিখতে পারবে।

এটা সত্যিই একটা বড় উদ্যোগ। কিন্তু তার আগে নিজের জায়গাটা শক্ত করতে হবে। কারও পাশে দাঁড়াতে গেলে নিজেকে শক্তিশালী করতে হবে। তবেই এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন মিত্রাভরা। স্বপ্ন অনেক বড়। তবে, রাস্তাটা বেশ কঠিন। সেই কঠিন রাস্তা পেরিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন বাংলার এই গ্র্যান্ডমাস্টার।

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুকটুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *