Cart Total Items (0)

Cart

All Sports India

অলস্পোর্ট ডেস্ক: মঙ্গেশ যাদবের কাছে আইপিএল ২০২৬-এর নিলাম ছিল তাঁর জীবনের সব থেকে বিশেষ মুহূর্ত—শুধুমাত্র এই কারণে নয় যে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (আরসিবি) তাঁকে বিপুল অঙ্কের ৫.২০ কোটি টাকায় দলে নিয়েছে, বরং এই কারণেও যে, এটি তাঁর পরিবারের বহু বছরের লড়াই শেষের ইঙ্গিতও দিয়েছে। মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দা মঙ্গেশ একটি সাধারণ পারিবার থেকে উঠে এসেছেন। তাঁর বাবা রাম অবধ যাদব, পেশায় একজন ট্রাক চালক; যিনি ভোর তিনটের সময় ঘুম থেকে উঠে পরিবারের ভরণপোষণের তাগিদে দীর্ঘ সময় ধরে বিপদসংকুল পথে ট্রাক চালিয়ে দিন অতিবাহিত করতেন।

ছেলের ক্রিকেট যাত্রায় সহায়তা করতে গিয়ে মঙ্গেশের বাবাকে অনেক কষ্ট ও প্রতিকূলতা সহ্য করতে হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ; কোচিং, খেলার সরঞ্জাম এবং যাতায়াত খরচ মেটাতে তাঁর বাবাকে ধারদেনা করতে হয়েছে এবং ঋণ নিতে হয়েছে। আইপিএল-এ সুযোগ পাওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণেও, তাঁর পরিবার তখনও ছিন্দওয়ারা শহর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বোরগাঁওয়ের একটি ভাড়া বাড়িতেই থাকছিল।

কোচিং এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের টাকা কীভাবে জোগাড় করবেন—এই চিন্তায় তাঁর বাবা প্রায়শই নির্ঘুম রাত কাটাতেন। “টাকার জন্য আমাকে প্রচুর লড়াই করতে হয়েছে। মাঝেমধ্যে রাতে ঘুম আসত না—ভাবতাম, ওর খরচের টাকা আমি কীভাবে জোগাড় করব। ট্রাক চালকের জীবনকে ঠিক ‘জীবন’ বলা চলে না। ঠিকমতো খাওয়া বা স্নান করারও সময় পাওয়া যায় না। ট্রাক যখন বোঝাই থাকে, তখন পণ্য খালাস করার চিন্তা; আর যখন খালি থাকে, তখন সেটা আবার পূর্ণ করার চিন্তা—এভাবেই দিন কেটে যায়,” ইন্ডিয়া টুডের সঙ্গে কথপোকথনে মঙ্গেশ যাদবের বাবা বলেন।

মঙ্গেশের আইপিএল চুক্তি তাঁর পরিবারকে অবশেষে কিছুটা আর্থিক স্বস্তি দিয়েছে। আর আইপিএল ২০২৬ শুরু হতে যেহেতু আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, তাই মঙ্গেশের অভিষেক হওয়ারও জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে—বিশেষ করে যখন বর্তমান চ্যাম্পিয়ন দলটির হয়ে যশ দয়ালকে এই মুহূর্তে পাওয়া যাচ্ছে না।

আনুষ্ঠানিক বা পেশাদার ক্রিকেটে পা রাখার আগে, মঙ্গেশ টেনিস-বলের টুর্নামেন্ট খেলে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রায়শই তাঁকে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তিশগড়ের বিভিন্ন প্রান্তে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতো—কখনও ট্রেনের সাধারণ কামরায়, আবার কখনও বাসে চড়ে। তার কাছে টাকা উপার্জনের চেয়েও বড় অর্জন ছিল এই বিষয়টি যে, তাঁকে আর নিজের বাবার কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য হাত পাততে হতো না। ১৬ বছর বয়সে তাঁর সুসংগঠিত ক্রিকেট-যাত্রার সূচনা হয়; স্থানীয় একটি টুর্নামেন্টে অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শনের পর এক পারিবারিক বন্ধু তাঁকে নয়ডায় স্থানান্তরিত হতে সহায়তা করেন। ‘ওয়ান্ডার ক্রিকেট ক্লাব’-এর কোচ ফুলচাঁদ শর্মা তাঁর সুপ্ত প্রতিভা চিনতে পারেন এবং টানা তিন বছরের জন্য তাঁর হোস্টেল ফি-তে ছাড় দেন। মঙ্গেশ অকপটে স্বীকার করেছেন যে, শর্মার সহায়তা না পেলে হয়তো তিনি কখনওই পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে পারতেন না।

“আজ আমি যে ক্রিকেট খেলছি, তা একমাত্র ফুলচাঁদ স্যারের কারণেই সম্ভব হয়েছে। আমি যখন দিল্লিতে যাই, তখন আমার বাবা অত্যন্ত কষ্ট করে আমাকে ২৪,০০০ টাকা দিয়েছিলেন। প্রথম মাসেই সেই টাকা কীভাবে যে ফুরিয়ে গেল, তা আমি নিজেও বুঝে উঠতে পারিনি,” মঙ্গেশ জানান।

“দিল্লিতে মঙ্গেশ অন্য একজনের বাড়িতে থাকছিল। আমি লক্ষ্য করলাম যে সে একজন দক্ষ বোলার, কিন্তু তার কাছে ঠিকমতো খাওয়ার অর্থটুকুও ছিল না। তাই আমি তাকে আমার হস্টেলে এসে থাকার প্রস্তাব দিলাম। মূলত সেখান থেকেই তার প্রকৃত ক্রিকেট-যাত্রার সূচনা হয়। কোনও খেলোয়াড়ের টাকা-পয়সা আছে কি নেই—তা নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাই না। যদি কোনও খেলোয়াড় প্রতিভাবান বা দক্ষ হয়, তবে সে নির্দ্বিধায় এখানে আসতে পারে—খাওয়াদাওয়া, থাকা এবং অনুশীলন—সবকিছুরই সুযোগ তার জন্য অবারিত,” ফুলচাঁদ শর্মা বলেন।

মঙ্গেশের সাফল্যের মোড় আসে ২০২৫ সালের মধ্যপ্রদেশ টি-টোয়েন্টি লিগে, যেখানে তিনি ‘গোয়ালিয়র চিতা’ দলের হয়ে ছয়টি ম্যাচে ১৪টি উইকেট নেন এবং ‘টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়’ নির্বাচিত হন। তাঁর এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে তিনি মুম্বই ইন্ডিয়ান্স, দিল্লি ক্যাপিটালস, রাজস্থান রয়্যালস এবং রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর মতো বেশ কয়েকটি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ পান; দলগুলো মূলত পেশাদার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সক্ষমতা যাচাই করে দেখছিল।

এর পরপরই যাদব মধ্যপ্রদেশের সিনিয়র দলে জায়গা করে নেন এবং ২০২৫-২৬ মরসুমের সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে তাঁর অভিষেক ঘটে। এই টুর্নামেন্টে তিনি দু’টি ম্যাচে তিনটি উইকেট শিকার করেন এবং পঞ্জাবের বিপক্ষে মাত্র ১২ বলে ২৮ রান করে নিজের ব্যাটিং নৈপুণ্যেরও পরিচয় দেন। আইপিএল ট্রায়াল চলাকালীন দীনেশ কার্তিক মঙ্গেশ যাদবের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা পরীক্ষা করে দেখেন; তিনি মঙ্গেশকে ম্যাচের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে—নতুন বল দিয়ে বোলিং করা থেকে শুরু করে ‘ডেথ ওভার’ পর্যন্ত—বোলিং করার নির্দেশ দেন।

“ট্রায়াল চলাকালীন ডিকে [দীনেশ কার্তিক] স্যার আমার কাছে এসে বললেন, ‘তুমি বেশ ভালো বোলিং করছ। এবার আমাকে এই বলটি করে দেখাও।’ তিনি আমাকে ম্যাচের ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে বোলিং করালেন—নতুন বল দিয়ে, পঞ্চম ওভারে, দশম ওভারে, চতুর্দশ ওভারে এবং এমনকি আঠারো ও বিশতম ওভারেও। ওই পর্যায়ের একজন খেলোয়াড় কীভাবে চিন্তা করেন, তা কাছ থেকে দেখাটা আমার কাছে সত্যিই বিস্ময়কর ছিল,” মঙ্গেশ জানান।

মঙ্গেশের আইপিএল চুক্তি প্রসঙ্গে তাঁর বাবা বলেন, “আমি কখনওই ভাবিনি যে একজন ট্রাক চালক এতখানি সম্মান ও মর্যাদা পেতে পারেন। মঙ্গেশ আমার জন্য এমন অনেক কিছুই করেছে, যা আমি তার কাছে কখনোই চেয়ে দেখিনি।”

আরসিবি হলো এবারের আসরের অন্যতম আকর্ষণীয় একটি দল; গত মরসুমে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আইপিএল শিরোপা জয়ের পর, এই মরসুমে তারা নিজেদের সেই শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছে। দলের অন্যতম বোলার দয়াল এই মুহূর্তে অনুপলব্ধ থাকায়, মঙ্গেশের সামনে নিজের জাত চেনানোর এবং আইপিএলে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলার (প্রথম ‘ক্যাপ’ অর্জনের) একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগামী ২৮ মার্চ টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে আরসিবি যখন সানরাইজার্স হায়দরাবাদের মুখোমুখি হবে, তখন মঙ্গেশ এই সুযোগটি কাজে লাগানোর জোর প্রচেষ্টা চালাবেন।

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *