সুচরিতা সেন চৌধুরী: গ্যালারিতে তখন দ্বিতীয় গোলের অপেক্ষা। এএফসি কাপ গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে মাজিয়ার বিরুদ্ধে তখন এক গোলে এগিয়ে মোহনবাগান। ঘরের মাঠ, গ্যালারিতে সমর্থকদের সমাগম। বক্সের মধ্যে আর্মান্দো সাদিকুকে ফাউল করে মোহনবাগানকে পেনাল্টি পাইয়ে দিয়েছেন ব্রানিমির। একটা বল ঘিরে তখন মাজিয়া বক্সে মোহনবাগান প্লেয়ারদের জটলা। কে নেবেন পেনাল্টি শট। কামিন্স বলছেন তিনি, তো দিমিত্রি বলছেন তিনি। সাদিকুই বা বাদ যাবেন কেন? ফাউল তো তাঁকেই করা হয়েছে। এর মধ্যেই মধ্যস্থতা করতে ঢুকলেন এই ম্যাচের অধিনায়ক ব্রেন্ডন হ্যামিল। কী আলোচনা হল তা বোঝা না গেলেও, শট নেওয়ার পর বোঝা গেল সব সিদ্ধান্ত সবার জন্য নয়। অপ্রয়োজনীয় কারুকার্য করতে গিয়ে গোল মিস। যা হয়তো এদিন রাতে কোচ হুয়ান ফেরান্দোর ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
সোমবার এএফসি কাপ গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচ খেলতে নেমেছিল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। প্রথম ম্যাচে ওড়িশা এফসির বিরুদ্ধে তাদের ঘরের মাঠে ৪-০ জিতে আত্মবিশ্বাস তো তুঙ্গে ছিলই তার সঙ্গে আইএসএল-এর প্রথম দুটো ম্যাচেও জয় সেই আত্মবিশ্বাসকে ধরে রেখেছিল। আর পর পর তিন জয় নিয়েই এএফসি কাপের গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে ঘরের মাঠেই খেলতে নেমেছিল মোহনবাগান। যদিও আগের দিন কোচ হুয়ান ফেরান্দো জানিয়ে দিয়েছিলেন যতই পর পর জয় আসুক না কেন মাজিয়া শক্তিশালী দল এবং তাদের কোনওভাবেই সহজ প্রতিপক্ষ ভাবার কোনও কারণ নেই। যদিও ঘরের মাঠে ২৮ মিনিটেই গোল করে এগিয়ে গিয়েছিল মোহনবাগান।
হোম টিম এগিয়ে গেলেও মাজিয়া লড়াই ছাড়েনি। বরং পিছিয়ে পড়ার পরই আক্রমণে শক্তি বাড়ায় তারা। এবং তা থেকে মোহনবাগান বক্সে একবার রীতিমতো টেনশনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে সকলে মিলে গোল হজম আটকাতে সক্ষম হয় মোহনবাগান। তার আগেই অবশ্য মাঝ মাঠ থেকে হুগো বুমৌসের পাস ধরে বক্সের বাইরে থেকে জেসন কামিন্সের শট সোজা চলে গিয়েছে মাজিয়া গোলে। প্রতিপক্ষ গোলকিপার বলের নাগাল পাননি। এখান থেকে মোহনবাগানের আরও জ্বলে ওঠার কথা ছিল। সেই সুযোগও চলে এসেছিল। কিন্তু দলের অদ্ভুত পরিকল্পনায় পেনাল্টি নষ্ট করে বসল মোহনবাগান। এবং প্রথমার্ধের শেষে হজম করতে হল এক গোল। যার ফলে প্রথমার্ধ শেষ হল ১-১ গোলে। যখন ড্র ম্যাচ ভেবে হতাশ গ্যালারি তখনই ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে আবারও জ্বলে উঠল সেই জেসন কামিন্সের পা। ৯০+৩ মিনিটে লিস্টন, সামাদ হয়ে বক্সের মধ্যে বল পেয়ে গিয়েছিলেন কামিন্স। গোলকিপারকে কাটিয়ে বল জালে জড়াতেই উচ্ছ্বাসের বাঁধ ভাঙল।
প্রথমার্ধে দুরন্ত গোল করে মাজিয়াকে সমতায় ফিরিয়েছিলেন তোমোকি ওয়াদা। ম্যাচের বয়স তখন ৪৫ মিনিট। মাঝ মাঠ থেকে পাস বাড়িয়েছিলেন রেগান ওবেং। সেই বল প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে গোলে শট নেন তোমোকি। যা বিশাল কাইথের মাথার উপর দিয়ে ডানদিকের কোনা দিয়ে চলে যায় গোলে। দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না তাঁর। কিন্তু তার আগেই বড় দুর্ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেলেছেন মোহনবাগানের দুই বিদেশি। ছ’জন বিদেশিকে প্রথম দলে রেখে এদিন মাজিয়ার বিরুদ্ধে নেমেছিলেন হুয়ান ফেরান্দো। তাতে কোনও লাভই হল না। বরং তাঁদের অদ্ভুত পরিকল্পনায় পেনাল্টিটাও জলাঞ্জলি গেল।
পেনাল্টি শট নেওয়ার সময় মোহনবাগানের বিদেশিদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে বোঝাই যাচ্ছিল শট কে নেবে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সমস্যা। শেষ পর্যন্ত শট নিতে গেলেন কামিন্স। যিনি ইতিমধ্যেই মোহনবাগানের হয়ে এক গোল করে ফেলেছেন। গোলে শট নিতে প্রস্তুত কামিন্স। গ্যালারি জুড়ে নিস্তব্ধতা। নিজের ডানদিকে ছোট্ট একটা টোকা দিয়ে বল পাঠালেন কামিন্স। দেখে মনে হল পরিকল্পনা অনুযায়ী পিছন থেকে উঠে এসে সেই বল গোলে শট নেওয়ার কথা দিমিত্রি পেত্রাতোসের। কিন্তু তিনি সঠিক সময় আর সঠিক পেসের সঙ্গে তাল মেলাতে পারলেন না। তাই তিনি বলের কাছে পৌঁছনোর আগেই তা ক্লিয়ার করে দিল প্রতিপক্ষ রক্ষণ। যে গ্যালারি অধীর আগ্রহে ২-০ হওয়ার অপেক্ষা করছিল তাদের আর উৎসব করা হল না।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আশিস রাইকে তুলে মনবীর সিংকে নামানোয় খেলায় গতি বাড়ল। মোহনবাগানের পর পর আক্রমণে ব্যস্ত থাকল মাজিয়া রক্ষণ থেকে গোলকিপার। কিন্তু গোলের ব্যবধান বাড়াতে পারল না মোহনবাগান। শেষ বেলায় মনবীর বেশ কয়েকবার গোলে শট নিলেন কিন্তু মাজিয়া গোলের নিচে তখন প্রাচীর তৈরি করেছিলেন গোলকিপার হুসেন শরিফ। এদিন প্রায় ২৭ হাজার সমর্থক এসেছিল দলকে সমর্থন করতে, শেষ হাসি হাসলেন তাঁরাই।
মোহনবাগান: বিশাল কাইথ, আনোয়ার আলি (শুভাশিস বোস), ব্রেন্ডন হামিল, হেক্টর ইউয়েস্তে, আশিস রাই (মনবীর সিং), লিস্টন কোলাসো, হুগো বুমৌস, গ্লেন মার্টিন্স (অনিরুদ্ধ থাপা), দিমিত্রি পেত্রাতোস (সহাল আব্দুল সামাদ), আর্মান্দো সাদিকু, জেসন কামিন্স।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
