Cart Total Items (0)

Cart

All Sports India
মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল

বিপ্লব দাশগুপ্ত: মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ হচ্ছে বাঙালির স্পন্দন। এই ম্যাচকে ঘিরে শহর কলকাতা এবং শহরতলী এমনকি আরও দূরে, সব সময়ই একটা অন্য আবেগ কাজ করেছে। সব সময়ই দু’দলের সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার পারদ চড়েছে। দিনের পর দিন রকে রকে ঝগড়া, এমনকি ঘরে ঘরে ডিভোর্সও ছিল। সব সময়ই এই উত্তেজনা বেশি দেখা গিয়েছে দু’দলের মুখোমুখি সাক্ষাৎকারে। আমি অনেক বড় ম্যাচ দেখেছি, ১৯৬৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত। বিশেষ একটা ম্যাচকে বাছা আমার পক্ষে খুব কঠিন। তবুও আমি চেষ্টা করছি। হয়ত আপনাদের মন মতো নাও হতে পারে। তবুও আমি আমার চোখে দেখা সেরা ম্যাচ নিয়ে কিছু কথা বলছি। তার পিছনে অনেক কারণ রয়েছে।

ম্যাচটা ছিল ১৯৮৪ সালের আইএফএ শিল্ড ফাইনাল। তার আগে ফেডারেশন কাপের রিপ্লে সেমিফাইনালে ইস্টবেঙ্গল জিতেছিল বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যের গোলে। কলকাতা লিগে মোহনবাগানের পক্ষে জবাব দিয়েছিলেন বাবু মানি। প্রসঙ্গত ইডেন উদ্যানে দুই বড় দলের মুখোমুখি লড়াই শেষ বারের মতো ওই ম্যাচেই। প্রথম লড়াইয়ে ইস্টবেঙ্গল জিতেছিল ২-১ গোলে। সেটা ১৯৬৭ সালে। শেষ খেলায় জিতল মোহনবাগান। ফল ১-০।

১৯৮৪-র শিল্ড ফাইনাল অনুষ্ঠিত হল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। দুই বড় দলের মুখোমুখি লড়াই যুবভারতীতে সেদিনই প্রথম। সেদিন পর্যন্ত গ্যালারির পুরো কাজ সম্পন্ন হয়নি। এক লক্ষ দর্শকের সামনে ইস্টবেঙ্গল জিতেছিল ১-০ গোলে। বলতে দ্বিধা নেই দুই বড় দলের লড়াইয়ে লক্ষাধিক দর্শকের সমাগম সেদিনই প্রথম। এই ম্যাচে কোনও দলকেই প্রথমে এগিয়ে রাখেননি ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। কারণ এই ম্যাচের আগে দু’দলই একবার করে জিতেছিল। শুকনো খটখটে মাঠ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের। মুখোমুখি লাল-হলুদ এবং সবুজ-মেরুন।

মাঠে লড়াই হলেও ফুটবলারদের মধ্যে কিন্তু মাঠের বাইরে সব সময়ই বন্ধুত্ব বজায় থাকত। বড় ম্যাচের আগের দিন মোহনবাগানের বিকাশ পাজি এবং কৃশানু দে ও ইস্টবেঙ্গলের মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ও সুদীপ চট্টোপাধ্যায় পার্ক স্ট্রিটের এক রেস্তোঁরাতে অনুশীলনের পর লাঞ্চ করতে গিয়েছিলেন। মাঠের বাইরে ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল গভীর। ম্যাচের ক’দিন বাদেই ছিল শারদীয়া উৎসব। বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ, মাঠে ঘাটে কাশফুলের সমাহার। কিন্তু বাঙালির তো হৃদয়ে ফুটবল, সব পথ সেদিন মিশেছিল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে।

খেলা শুরু হল। কোনও দলই ফেভারিট নয়। প্রথম কয়েক মিনিট দাপট ছিল মোহনবাগানের। শুকনো খটখটে মাঠে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিলেন কৃশানু। একবার এক লহমায় মনোরঞ্জনকে টপকে গিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য কৃশানুর, তাঁর শট বারে লেগে ফিরে এসেছিল। মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন মনোরঞ্জন, সটান উঠে দাঁড়িয়ে আবার ভাল করে বুট বেঁধে নিলেন। আবার কৃশানুর পায়ে বল এল। বিপদের আতঙ্কে মনোরঞ্জন কড়া ট্যাকল করলেন কৃশানুকে। ছিটকে গেলেন কৃশানু। পরে গিয়ে বল উঠলেন, ‘মনাদা!’ মনোরঞ্জনের জবাব ছিল, ‘কে মনাদা? তুই তোর খেলা খেল।’

বল পেন্ডুলামের মতো এ প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ঘুরছে। কখনও ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণ কখনও বা মোহনবাগানের। তখন খেলা ভাঙতে মিনিট সাতেক বাকি। উত্তরদিকের কর্ণার ফ্ল্যাগের বরাবর জায়গা থেকে বাঁ পায়ে সেন্টার করলেন সুদীপ চট্টোপাধ্যায়। কোথা থেকে ছুটে এসে কার্তিক শেঠ সেই চলতি বল পাঠিয়ে দিলেন জালে। এই গোল সম্পর্কে পরবর্তীতে সুব্রত ভট্টাচার্য বলেছিলেন, ‘কোথা থেকে উঠে এসে কার্তিক গোল করল বুঝতেই পারলাম না।’ তার পর গোল শোধের জন্য মরিয়া সুব্রত অনেকবার হানা দিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গল রক্ষণ দূর্গে। একবার তো প্রায় গোল করেই ফেলেছিলেন। সেই মুহূর্তে তাঁর পা থেকে ছোঁ মেরে বল কেড়ে নিয়েছিলেন মনোরঞ্জন।

ম্যাচে হিরো নিশ্চই কার্তিক শেঠ। কিন্তু দু’দলের দুই স্তম্ভ, স্টপার সুব্রত এবং মনোরঞ্জন সেদিন বিশাল পাহাড়ের মতো তাঁদের দূর্গ সামলে গিয়েছেন। আর একজনের কথা বলতে হবে, তিনি সুদীপ চট্টোপাধ্যায়। ওই ম্যাচে তাঁকে স্টপার থেকে তুলে এনে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন বিদগ্ধ কোচ অমল দত্ত। এবং এটাও ঘটনা, সেদিন থেকেই সুদীপ সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে দক্ষতার শীর্ষে থেকেছেন। এখানেই কৃতিত্ব কোচ অমল দত্তের। নতুন নতুন উদ্ভাবনী শক্তি তাঁর মধ্যে সব সময় কাজ করত। হ্যাঁ, সে বছর মোহনবাগানের কোচ ছিলেন পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়।

এই ম্যাচের একটা ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। দ্বিতীয়ার্ধে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গল স্টপার মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য। মোহনকোচ পিকে বন্দ্যোপাধ্যায় ছুটে গিয়েছিলেন তাঁর শুশ্রুষায় সাহায্য করার জন্য। সেই সময় দৌঁড়ে এসে অমল দত্ত পিকেকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়েছিলেন। পিকে তো অবাক। পরে অবশ্য অমল দত্ত বলেছিলেন, ‘কেন আমার ফুটবলারে শুশ্রষা ও করবে! পেশাদার ফুটবলে এসব চলে না।’

কলকাতা লিগে হারের পর অমল দত্তকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছিল। সেদিন দেখেছিলাম ড্রেসিংরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে সেই মানুষটা চোখের জল মুছছেন। আসলে ফুটবল আবেগ এটাই, আর তাঁকে ছাঁপিয়ে যেটা জায়গা করে নেয় বাংলার ফুটবলে তা হল ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান।

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *