অলস্পোর্ট ডেস্ক: সবুজ-মেরুন বাহিনীর প্রশিক্ষণের দায়িত্বে ফের সেই আন্তোনিও লোপেজ হাবাস, যিনি এর আগেও ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে কাজ করে গিয়েছেন। গত বুধবার হুয়ান ফেরান্দোকে সরিয়ে হাবাসকেই মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের কোচের পদে তাঁকে আনার ঘোষণা করে ক্লাব। উদ্দেশ্য, এএফসি কাপ ও আইএসএলে দলের পড়তে থাকা পারফরম্যান্সের রেখচিত্রকে ফের উর্দ্ধমুখী করে তোলা। হাবাসের মতো কড়া হেডস্যারকে দিয়ে সেই কাজটা হবে বলেই মনে করছেন ক্লাব কর্তারা। তাই এই সিদ্ধান্ত।
ডুরান্ড কাপ জয় দিয়ে শুরু করলেও যে উদ্দেশ্য নিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে এ মরশুমের আগে দল গড়েছিল সবুজ-মেরুন বাহিনী, সেই এএফসি কাপে অপ্রত্যাশিত ভাবে খারাপ ফল করে তারা। বাংলাদেশের বসুন্ধরা কিংসের বিরুদ্ধে যেমন কোনও ম্যাচে জিততে পারেনি, তেমন ওডিশা এফসি-কে প্রথমে চার গোলে হারালেও পরে তাদের কাছে হেরে টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে যেতে হয় তাদের।
একই ভাবে আইএসএলে শুরুটা ভাল করলেও বছরের শেষ তিন ম্যাচে টানা হারে তারা, যা তাদের আইএসএল ইতিহাসে কখনও হয়নি। সম্ভবত এই ব্যর্থতার কারণেই দলের দায়িত্ব ছেড়ে দেন ফেরান্দো। অন্তত সরকারি ভাবে সে রকমই বলা হয়েছে ক্লাবের পক্ষ থেকে।
ইতিহাস ফিরে আসে
ফেরান্দো-বিদায়ের পর তাঁর বিকল্প ক্লাবের কাছে তৈরিই ছিল। তিনি আন্তোনিও লোপেজ হাবাস, যাঁকে গত জুনেই ক্লাবের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পদে আনা হয়। তাই ফেরান্দোর দায়িত্ব ছাড়ার পরে তাদের আর নতুন করে কোচ খুঁজতে বেরোতে হয়নি। প্রত্যাশিত ভাবেই হাবাসকে হেড কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর মতো আইএসএলে সফল কোচ থাকতে আর অন্য কাউকে কেনই বা এই দায়িত্ব দেওয়া হবে?
উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, যে কারণে ফেরান্দো কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন বলে জানানো হয়েছে, একই কারণে তিন বছর আগে হাবাসও দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁর জায়গা ভরাট করার জন্যই এফসি গোয়ার দায়িত্ব ছেড়ে ফেরান্দো চলে আসেন কলকাতায়। এ বা হল উল্টোটা। ব্যর্থতার দায় কাঁধে নিয়ে ফেরান্দো সরে গেলেন এবং ফের তাঁর জায়গায় চলে এলেন হাবাস। ইতিহাস যে সত্যিই ফিরে আসে, এর চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আর কীই বা হতে পারে?
কঠিন চ্যালেঞ্জ অন্যতম সেরা কোচের
এখন প্রশ্ন হল, যে উদ্দেশ্যে হাবাসকে কোচের পদে বসালেন সবুজ-মেরুন কর্তারা, অভিজ্ঞ স্প্যানিশ কোচ কি তাঁদের সেই উদ্দেশ্য সফল করতে পারবেন? হাবাস অভিজ্ঞ। এর আগেও আইএসএলে অনেক অসাধ্য সাধন করেছেন। আইএসএলে সফল কোচেদের মধ্যে সামনের সারিতে অবশ্যই থাকবেন হাবাস। যখন এটিকে এফসি-র কোচ ছিলেন, তখন তাদের দু’বার হিরো আইএসএল খেতাব জিতিয়েছেন। ২০১৪ ও ২০১৯-২০-তে। ২০১৫-য় তাঁর প্রশিক্ষণে কলকাতার দল সেমিফাইনালে উঠেছিল। ২০২০-২১-এ এটিকে মোহনবাগানকেও তিনি তোলেন ফাইনালে।
কিন্তু পরের মরশুমেই তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন। সেই মরশুমে মুম্বই সিটি এফসি-র বিরুদ্ধে ১-৫ গোলে হারার পর থেকে এটিকে মোহনবাগান জামশেদপুরের কাছে ১-২-এ হারে, চেন্নাইন এফসি-র বিরুদ্ধে ১-১ ও বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে ৩-৩ ড্র করে। এর পরই কোচ হাবাসকে অব্যহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ক্লাব কর্তৃপক্ষ। তখন ছয় ম্যাচে দুটি করে জয়, ড্র ও হার নিয়ে লিগ টেবলে ক্লাবের অবস্থান ছিল সাত নম্বরে। সেই ছয় ম্যাচে ১৩টি গোল দিয়ে ১৩টি গোল খায়ও তারা। আর এ বার ফেরান্দোকে সরিয়ে যখন হাবাস আসছেন, তখন মোহনবাগান এসজি দশ ম্যাচে ছ’টি জয় একটি ড্র ও তিনটি হার নিয়ে লিগ টেবলের পাঁচ নম্বরে।
সেই জায়গা থেকে যে ভাবে দলকে টেনে তুলেছিলেন ফেরান্দো, যে ভাবে টানা ১৩টি ম্যাচে অপরাজিত থেকে লিগে ২০ ম্যাচে ৩৭ পয়েন্ট নিয়ে তিন নম্বরে থেকে শেষ করে দলকে নক আউটে তুলেছিলেন তিনি, সে ভাবেই এই অবস্থা থেকে সবুজ-মেরুন ব্রিগেডকে টেনে তোলার কঠিন চ্যালেঞ্জ হাবাসের সামনে। তাঁর চ্যালেঞ্জ শুধু মোহনবাগান এসজি-কে বিপদ থেকে মুক্ত করা নয়, ফেরান্দো যে পরীক্ষায় সসন্মানে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, সেই একই রকম কঠিন পরীক্ষায় পাস করে দেখানো। এখানেই দুই স্প্যানিশ কোচের মধ্যে ফারাকটা বোঝা যাবে।
ছত্রভঙ্গ বাগান
এ বারের আইএসএলে দলের একাধিক নির্ভরযোগ্য তারকাকে ছাড়াই সাতটি ম্যাচে অপরাজিত ছিল তারা। পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে দাপুটে জয় দিয়ে শুরু করলেও, দ্বিতীয় ম্যাচে বেঙ্গালুরু এফসি-র বিরুদ্ধে ততটা দাপট দেখাতে পারেনি মোহনবাগান এসজি। বুমৌসের গোলে জেতে তারা। চেন্নাইয়ে আত্মবিশ্বাস ও আধিপত্য নিয়ে ৩-১-এ জয় পায় তারা। জামশেদপুরে এক গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষে ৩-২-এ জেতে সবুজ-মেরুন বাহিনী। ২-০-য় হায়দরাবাদ এফসি-কে হারিয়ে টানা পাঁচ ম্যাচে জয়ের নজির তৈরি করে তারা। শেষ এগারো মিনিটে ব্রেন্ডান হ্যামিল ও আশিস রাই গোল করেন।
ওডিশার বিরুদ্ধে কঠিন ম্যাচে সাদিকুর জোড়া গোলে ২-২ ড্র করে তারা। নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে দীপক টাঙরি, জেসন কামিংস ও শুভাশিস বোসের গোলে ৩-১-এ জয়ে ফেরে তারা। কিন্তু সাতটি ম্যাচে অপরাজিত থাকার পর মুম্বইয়ে গিয়ে প্রথম হার মানতে হয় তাদের, ১-২-এ। তার ওপর একসঙ্গে তিনজনের লাল কার্ড দেখা। এর পর ঘরের মাঠে এফসি গোয়া এবং কেরালা ব্লাস্টার্সের কাছেও হার। আইএসএলে এর আগে কখনও টানা তিনটি ম্যাচে হারেনি মোহনবাগান।
এএফসি কাপের গ্রুপ পর্বে প্রথম দুটি ম্যাচে জেতার পর টানা চারটি ম্যাচে জয়হীন থাকে তারা। ফলে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয় তাদের। পিছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে এ বছর শেষ ১১টি ম্যাচের মধ্যে তিনটিতে জিততে পেরেছে তারা। দু’টি ম্যাচ ড্র হয়েছে এবং বাকি ছ’টি ম্যাচেই হেরেছে তারা। গত ২৪ অক্টোবরের পর থেকে পরিসংখ্যান এ রকমই। এই হারগুলির মধ্যে আইএসএলের শেষ তিনটি ম্যাচে হার ছাড়াও ছিল এএফসি কাপে টানা তিনটি ম্যাচে হার। ওডিশা এফসি-র কাছে তারা ২-৫-এ হারে। বসুন্ধরা কিংসের কাছে হারে ১-২-এ। এমনকী মাজিয়া এসআরসি-র কাছেও তাদের হারতে হয় এক গোলে। অবশ্য সেই ম্যাচে দ্বিতীয় সারির দল নামিয়েছিল মোহনবাগান।
হাবাসের নীতি
বড়দিনের ছুটি কাটাতে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন হাবাস। সেখান থেকেই জরুরি তলব পেয়ে কলকাতায় এসে কলিঙ্গ সুপার কাপে দলের দায়িত্ব নেবেন, এমনই ঠিক আছে। তবে শোনা যাচ্ছে সবই নির্ভর করছে তাঁর ভিসা পাওয়ার ওপর। ঠিক সময়ে ভিসা পেলে তিনি সুপার কাপের সময়ই ভারতে এসে দলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু করবেন। আপাতত দলের দেখভালের দায়িত্ব রয়েছেন সহকারী কোচ ক্লিফোর্ড মিরান্ডা।
কোচ হিসেবে কাজ করার সময় বরাবরই তিনি বলে এসেছেন দলের রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিপক্ষ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল তৈরি করে খেলার ওপরই বেশি জোর দেন তিনি। তাই অনেকেই তাঁর নামের পাশে রক্ষণাত্মক কোচের তকমা সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
কিন্তু বারবার হাবাস তা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, “শুধু রক্ষণ দিয়ে তো আর ফুটবল হয় না। আক্রমণেও উঠতে হয়। কিন্তু ঘন ঘন আক্রমণে ওঠা বা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়া, এ সবই নির্ভর করে প্রতিপক্ষ কতটা ভাল খেলছে, তারা প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে কি না এবং ম্যাচের পরিস্থিতি কী রকম, মানে আমরা এগিয়ে রয়েছি, না পিছিয়ে, না কি ড্র চলছে, এ সবের ওপর। যখন যে রকম খেলার প্রয়োজন হবে, সে রকমই তো খেলতে হবে। যে অবস্থায় রক্ষণাত্মক খেলার প্রয়োজন, সেই অবস্থায় আক্রমণাত্মক হতে গেলে তো হিতে-বিপরীত হতে পারে। আমি সেটাই করি, যেটা যে সময়ে করা প্রয়োজন”। এ বারও নিশ্চয়ই তাঁর এই ধারণায় কোনও পরিবর্তন হবে না।
নতুন কোচকে যা করতে হবে
দলকে সাফল্যের রাস্তায় ফিরিয়ে আনতে গেলে যেমন চোটগ্রস্থ খেলোয়াড়দের ফিরিয়ে আনতে হবে হাবাসকে। তেমনই কৌশলেও বদল আনতে হবে তাঁকে। ফেরান্দোর তিন ব্যাকে খেলার সিদ্ধান্তের সমালোচনা হয়েছে বহুবার। এমনকী আনোয়ার আলির মতো নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার চোট পেয়ে দলের বাইরে চলে যাওয়ার পরও দলের রক্ষণ যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনও তিন ব্যাকে খেলার সিদ্ধান্তে টিকে ছিলেন তিনি। ফলে কম গোল খেতে হয়নি মোহনবাগানকে। হাবাস দায়িত্ব নেওয়ার পর দলের সেই মানসিকতায় বদল আসতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা যে বিদেশি ও দেশীয় খেলোয়াড়রা এখন দলে রয়েছেন, যেমন দিমিত্রিয়স পেট্রাটস, আরমান্দো সাদিকু, জেসন কামিংস, হেক্টর ইউস্তে, হুগো বুমৌস, আশিস রাই, অনিরুদ্ধ থাপা, লিস্টন কোলাসো, মনবীর সিং এবং দলের জুনিয়র খেলোয়াড়দের সঙ্গে তিনি কত তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিতে পারবেন, এটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চলতি দলবদলে তিনি পছন্দের খেলোয়াড়ও আনতে পারেন। সেক্ষেত্রে নতুন সদস্য দলের অন্যদের সঙ্গে কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন, সেটাও কম বড় প্রশ্ন নয়।
ফেরান্দো ও হাবাস দুই প্রান্তের ব্যক্তিত্ব। ফেরান্দো দলের খেলোয়াড়দের কাছে যতটা গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন, হাবাস ততটা হয়ে উঠতে পারবেন কি না, সেটাও দেখার। কারণ, তিনি কড়া ধাতের মানুষ। দলের সবাইকে একই স্তরে রেখে কাজ করেন। তাঁর কাছে তারকাদের কোনও বিশেষ জায়গা নেই। দলের তারকা ফুটবলাররা তাঁকে কী ভাবে নেবেন, সেটাও কম আকর্ষণীয় বিষয় নয়।
দল সেরা ছয়ের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই যে কোচ পরিবর্তন করেছে ক্লাব ম্যানেজমেন্ট, এটা অবশ্যই একটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এই অবস্থা থেকে দলকে টেনে তোলার চ্যালেঞ্জটা হয়তো অতটা কঠিন হবে না, যতটা কঠিন হত দল লিগ টেবলে আরও নীচে নেমে গেলে। মোহনবাগান শিবির এখন থেকে ফেরান্দো সরণি ছেড়ে হাবাস সরণি দিয়ে হাঁটা শুরু করবে। দুই সরণিরই যদিও একটাই লক্ষ্য, জয়ের সরণি। কিন্তু কোন রাস্তা কেমন, সেটাই বোঝা যাবে এ বার।
(লেখা আইএসএল ওয়েব সাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
