অলস্পোর্ট ডেস্ক: সেরা ছয়ের লক্ষ্যের দিকে দৌড়নো ইস্টবেঙ্গল এফসি ক্রমশ পিছিয়ে পড়লেও তারা এখনও লক্ষ্যপূরণের আশায় রয়েছে। কারণ, তাদের এখনও সাতটি ম্যাচ বাকি। অর্থাৎ, তাদের সামনে এখনও ২১টি পয়েন্ট রয়েছে। ইন্ডিয়ান সুপার লিগের সেরা ছয়ে থাকার দৌড় এখন যে অবস্থায় রয়েছে, যে ভাবে অঘটনও ঘটছে প্রায়ই, তার পরে এখন কেউই জোর গলায় বলতে পারবে না যে, এ বছরও প্লে-অফে ওঠা হবে না লাল-হলুদ শিবিরের। গত ম্যাচে জামশেদপুরের বিরুদ্ধে অল্পের জন্য হারের পর তাদের কোচও সেই আশার কথাই শুনিয়েছেন।
কার্লস কুয়দ্রাত এখনও আশাবাদী, তাঁর দলের প্লে অফে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, এই মুহূর্তে ছ’নম্বরে থাকা জামশেদপুর এফসি ২০ পয়েন্ট নিয়ে সেখানে বসে রয়েছে। কিন্তু তাদের আর পাঁচটি ম্যাচ বাকি। ছ’নম্বরে থাকার দৌড়ে এই দুই দল ছাড়াও রয়েছে নর্থইস্ট ইউনাইটেড (১৬ ম্যাচে ১৯ পয়েন্ট), বেঙ্গালুরু এফসি (১৭-য় ১৮), পাঞ্জাব এফসি (১৫-য় ১৪) এবং চেন্নাইন এফসি (১৫-য় ১৫)— মোট ছ’টি দল। এদের পিছনে ফেলে ছ’নম্বরে পৌঁছে যাওয়ার একটাই রাস্তা, পরের ম্যাচগুলিতে একটিও পয়েন্ট না খোয়ানো। সোমবার ঘরের মাঠে চেন্নাইনের বিরুদ্ধে সেই লক্ষ্য নিয়েই নামবে লাল-হলুদ বাহিনী।
গত ম্যাচে জিতলে এতদিনে ছয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেত ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু সে দিন যে ভাবে তিন পয়েন্ট হাতছাড়া হয় তাদের, তা খুবই হতাশাজনক। ৮০ মিনিট পর্যন্ত এক গোলে এগিয়ে থাকার পর ৮১ মিনিট ও স্টপেজ টাইমের সাত মিনিটের মাথায় গোল খেয়ে হারতে হয় তাদের। ম্যাচের শেষ ১৬ মিনিটের মধ্যে জামশেদপুর দু’টি গোল করার আগেই ব্যবধান বাড়ানোর একাধিক সহজ সুযোগ পায় লাল-হলুদ বাহিনী। সেই সুযোগগুলি হাতছাড়া করার মাশুলই দিতে হয় কার্লস কুয়াদ্রাতের দলকে।
বিদেশীরাই ভরসা, সমস্যাও
এই প্রথম নয়, বারবার এমন হয়েছে ইস্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রে। তবে তা মরশুমের শুরুর দিকে। ক্রমশ এই রোগ সারিয়ে তুলেছিলেন কুয়াদ্রাত। কিন্তু ঠিক আসল সময়েই ফের সেই পুরনো রোগে আক্রান্ত হয় তারা। এগিয়ে থেকেও হার। কিন্তু নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার দশ মিনিট আগে পর্যন্ত এগিয়ে থাকার পরও হেরে যাওয়াটা যে কোনও দলের মানসিক শক্তির দফা রফা করে দিতে পারে। সোমবার চেন্নাইনের বিরুদ্ধে যখন খেলতে নামবে লাল-হলুদ ব্রিগেড, তখনই বোঝা যাবে, সেই হারের ধাক্কা আদৌও তারা সামলাতে পেরেছে কি না।
চোটের জন্য হোসে পার্দো, সল ক্রেসপোরা এমনিতেই দলের বাইরে। পার্দো তো সারা মরশুমের জন্যই ছিটকে গিয়েছেন। তাই লাল-হলুদ শিবিরে আপাতত পাঁচজন বিদেশী খেলার মতো অবস্থায় আছেন। সদ্য দলে যোগ দেওয়া মিডফিল্ডার ভিক্টর ভাজকেজ, ফরোয়ার্ড ফেলিসিও ব্রাউন, সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিজাজি মাহের ও স্ট্রাইকার ক্লেটন সিলভা। পার্দোর জায়গায় সদ্য শিবিরে যোগ দেওয়া সার্বিয়ান সেন্টার ব্যাক আলেকজান্দার প্যানটিচকে বৃহস্পতিবার মাঠে দেখা যায় ম্যাচের শুরু থেকেই। কিন্তু ক্লেটন ও মাহের ছাড়া তিন নতুন বিদেশীকে একেবারেই তৈরি মনে হচ্ছে না। এটাই কার্লস কুয়াদ্রাতের দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
এই তিন বিদেশীই ইউরোপ থেকে ভারতের মতো সম্পুর্ণ আলাদা আবহাওয়া ও পরিবেশের দেশে এসে পৌঁছেছেন মরশুমের মাঝখানে। এমনিতেই বিদেশী ফুটবলাররা সম্পুর্ণ নতুন কোনও পরিবেশে এলে তাদের নিয়ে প্রস্তুতি শিবির হয়, অন্য মানসিকতার ভারতীয় খেলোয়াড়দের সঙ্গে তাঁদের মানিয়ে নিতে সময় লাগে। সেই জায়গায় ভারতের মাটিতে পা রাখার চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই যদি তাঁদের মাঠে নেমে পড়তে হয়, তা হলে যে সমস্যা হবেই, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই এবং সেটাই ঘটছে ইস্টবেঙ্গল দলে।
জানুয়ারির দলবদলে হাভিয়ে সিভেরিও ও বোরহা হেরেরাকে ছেড়ে দেওয়াটা যে খুব একটা ঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি, তা এখন ভাল মতোই টের পাচ্ছেন কোচ, কর্তারা। জামশেদপুর শিবিরে যাওয়া সিভেরিও গত ম্যাচেই তা প্রমাণ করেছেন। যে দুই বিদেশী ভাল খেলছেন, সেই ক্লেটন ও মাহেরের ওপর আবার বেশি নির্ভর হয়ে পড়ছেন তাঁদের সতীর্থরা। দলের মোট ১৭টি গোলের মধ্যে সাতটিই করেছেন ক্লেটন। গত চারটি ম্যাচের দু’টিতেই গোল পেয়েছেন ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড।
দেশীয়দের সমস্যা
দুই উইঙ্গার নাওরেম মহেশ সিং ও নন্দকুমার শেখরও অবশ্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করছেন। নন্দকুমার চারটি গোল করেছেন ও তিনটি অ্যাসিস্ট করেছেন। দলের গোলে অবদানের ক্ষেত্রে তিনি পিছনে ফেলে দিয়েছেন মহেশকে, যিনি দু’টি গোল করেছেন ও দু’টি করিয়েছেন। শুরুর দিকে মহেশ বেশি তৎপর ছিলেন, কিন্তু নন্দকুমার ছিলেন কিছুটা বিবর্ণ। এখন হচ্ছে উল্টোটা। দুই উইঙ্গার সমান তৎপর হলে দলের গোলের সংখ্যা বাড়তে পারে। মাঝমাঠে শৌভিক চক্রবর্তী ছাড়া দলের কোনও ভারতীয় ফুটবলারই ধারাবাহিক ভাবে ভাল খেলতে পারছেন না।
গোলের সামনে তরুণ ফরোয়ার্ড পিভি বিষ্ণু, সায়ন ব্যানার্জিরা কার্যকরী হয়ে উঠতে পারছেন ঠিকই। কিন্তু গোল করার ক্ষেত্রে তারা এখনও পিছিয়ে। প্রতিপক্ষের গোলের সামনে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিদ্যে তাদের এখনও শিখতে হবে কুয়াদ্রাতের কাছে।
কিন্তু গোল করেও যে তা ধরে রাখতে পারছেন না তারা, তাও দেখা যাচ্ছে প্রায়ই। যদিও গত মরশুমে এই পরিসংখ্যানের চেয়ে এই মরশুমে তা ভাল। চলতি লিগে তিনটি ম্যাচে এগিয়ে থাকার পরেও হেরেছে ইস্টবেঙ্গল, ড্র করেছে দু’টিতে। প্রথমে গোল করে এগিয়ে গিয়েও পরে গোল হজম করে মোট ১৩ পয়েন্ট খুইয়েছে তারা। কিন্তু পিছিয়ে গিয়ে দল ঘুরে দাঁড়িয়েছে মাত্র একটি ম্যাচে। একটিতেও ড্র করতে পারেনি তারা। গত তিনটি হোম ম্যাচে ঘরের মাঠের সুবিধাও আদায় করতে পারেনি তারা। এই পরিসংখ্যানগুলিই ভাবাতে পারে কুয়াদ্রাতকে।
রহস্যময় চেন্নাইন
চেন্নাইন এফসি এমন এক দল, যারা নীচের দিকে থাকা পাঞ্জাব এফসি, হায়দরাবাদ এফসি-কে হারিয়েছে, আবার প্রথম ছয়ে থাকা কেরালা ব্লাস্টার্সকেও হারিয়েছে। হারিয়েছে বেঙ্গালুরু এফসি-কেও। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা ধারাবাহিকতা। লিগের প্রথম তিন ম্যাচে হারার পর তারা টানা দুই ম্যাচে জেতে হায়দরাবাদ ও পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে। এর পরে টানা চারটি ম্যাচে জয়হীন (তিনটি ড্র, একটি হার) এবং ফের জেতে বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে। এই জয়ও তাদের ছন্দে আনতে পারেনি। ফের তিনটি ম্যাচে হারে তারা। কিন্তু তার পরেও ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে জেতে। কিন্তু গত ম্যাচে ফের মুম্বই সিটি এফসি-র কাছে হেরে যায়।
কোইলের দলে রাফায়েল ক্রিভেলারো, জর্ডন মারে, কোনর শিল্ডসের মতো অ্যাটাকর থাকলেও কেউই ধারাবাহিক ভাবে ভাল খেলতে পারছেন না। বাংলার রহিম আলিও ন’টি ম্যাচে একটির বেশি গোল করতে পারেননি। সোমবার ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে তাঁরা কেমন খেলবেন, তা তাঁরা নিজেও বলতে পারবেন না। তবে তারা ভাল খেললে যে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তা সম্প্রতি বুঝে নিয়েছে কেরালা ব্লাস্টার্স। প্রথম লেগেও ৮৬ মিনিটে গোল করে ইস্টবেঙ্গলের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয় চেন্নাইন। এ বার সেই লড়াই কোন পর্যায়ে পৌঁছয়, সেটাই দেখার।
পরিসংখ্যান বলছে
ঘরের মাঠে গত তিন ম্যাচে জিততে পারেনি ইস্টবেঙ্গল। দু’টি ম্যাচে ড্র করেছে ও একটি ম্যাচে হেরেছে তারা। এর আগে ২০২২-এ ঘরের মাঠে টানা চার ম্যাচে জিততে পারেনি তারা। ইস্টবেঙ্গলের কোচ কার্লস কুয়াদ্রাত এখন পর্যন্ত আইএসএলে চেন্নাইনের কোচ ওয়েন কোইলের বিরুদ্ধে কোনও ম্যাচ জিততে পারেননি। দুটি ম্যাচে ড্র করেছেন ও একটিতে হেরেছেন। চলতি লিগে এরিয়াল ডুয়েলে ইস্টবেঙ্গলের সাফল্যের শতকরা হার ৫৩.২। চলতি লিগে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, মোহনবাগান এসজি-র (৫৬.৭) পরেই তারা।
হেডে বল ক্লিয়ার করার দিক থেকে চলতি লিগে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্ডার হিজাজি মাহের। প্রতি ম্যাচে গড়ে ৩.৭টি করে ক্লিয়ারেন্স তিনি মাথা দিয়ে করেছেন। লিগের ভারতীয় ফুটবলারদের মধ্যে দলের গোলে যুগ্ম ভাবে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন ইস্টবেঙ্গলের নন্দকুমার শেখর (চারটি গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট)। একই পরিসংখ্যান সুনীল ছেত্রীরও।
আইএসএলের ইতিহাসে একমাত্র ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধেই কখনও হারেনি চেন্নাইন এফসি। সোমবার তারা হারলে তা হবে এই লিগে লাল-হলুদ বাহিনীর কাছে তাদের প্রথম হার। গত পাঁচটি অ্যাওয়ে ম্যাচে জিততে পারেনি তারা। এর আগে নভেম্বর, ২০১৮ থেকে জানুয়ারি, ২০২০ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের মাঠে টানা ন’টি ম্যাচে জয়হীন ছিল তারা। শুধু তা-ই নয়, গত তিনটি অ্যাওয়ে ম্যাচে তারা কোনও গোলও করতে পারেনি।
দ্বৈরথের ইতিহাস
ইন্ডিয়ান সুপার লিগে দুই দল মুখোমুখি হয়েছে সাতবার। চেন্নাইন এফসি জিতেছে দু’বার। ইস্টবেঙ্গল কখনও তাদের হারাতে পারেনি। পাঁচবার ড্র হয়েছে। প্রথম চারবারের মুখোমুখিতেই ড্র করে দুই দল। প্রথম চার ম্যাচে ড্র হওয়ার পর ২০২২-২৩ মরশুমে প্রথম লেগে চেন্নাইন ১-০-য় জেতে এবং দ্বিতীয় লেগে ২-০-য় জেতে। চলতি মরশুমের প্রথম মুখোমুখিও ১-১-এ শেষ হয়। এই সাত ম্যাচে চেন্নাইন আট গোল করেছে ও ইস্টবেঙ্গল এফসি পাঁচ গোল করেছে। গত তিন মরশুমে এবং এ মরশুমেও আজ পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গল চেন্নাইয়ের দলের বিরুদ্ধে জিততে পারেনি।
ম্যাচ- ইস্টবেঙ্গল এফসি বনাম চেন্নাইন এফসি
ভেনু- বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন, কলকাতা
কিক অফ- ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, সন্ধ্যা ৭.৩০
সরাসরি সম্প্রচার ও স্ট্রিমিং
টিভি চ্যানেল: ডিডি বাংলা ও কালার্স বাংলা সিনেমা- বাংলা, স্পোর্টস ১৮ খেল- হিন্দি, স্পোর্টস ১৮ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ, ভিএইচ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ
অ্যাপ: জিও সিনেমা ও ওয়ানফুটবল
(লেখা আইএসএল ওয়েব সাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
