অনিরুদ্ধ থাপাকে কাটিয়ে গোল নন্ধ কুমারের।
সুচরিতা সেন চৌধুরী: শুরুতেই কলকাতা ডার্বির মুড কিছুটা হলেও হতাশ করেছিল। তবে সময় যত গড়িয়েছে, গ্যালারি একটু একটু করে সমর্থক-সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। কিন্তু চির চেনা ডার্বির গ্যালারি এ দিন অধরাই রইল পুরো ৯০ মিনিট। ম্যাচ লেখা থাকল ইস্টবেঙ্গলের নামে। ফল ১-০। নন্দকুমার সেকারের গোলে চার বছর পর কলকাতা ডার্বি জয় লাল-হলুদ ব্রিগেডের। নতুন হিরো পেল কলকাতা ডার্বি। কার্লেস কুয়াদ্রাতের আগমনে আবার জেগে উঠল কলকাতার এই দল। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই উচ্ছ্বাসের বাধ ভাঙল সমর্থকদের। গ্যালারির ফেন্সিং টপকে দলে দলে মাঠে নেমে পড়লেন সমর্থকেরা। কেউ জড়িয়ে ধরলেন প্রিয় ফুটবলারকে। কেউ সটান গিয়ে পায়ে পড়ে গেলেন। তাঁদের সঙ্গেই গোটা মাঠ ঘুরে ঘুরে সমর্থকদের শুভেচ্ছা নিলেন প্লেয়াররা। একরাশ হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়লেন হুয়ান ফেরান্দো। দুই স্প্যানিশ কোচের মস্তিষ্কের লড়াইয়ে এ দিন জয় অবশ্যই কুয়াদ্রাতের।
যে ইস্টবেঙ্গলকে নিয়ে কোনও আশাই দেখছিলেন না সমর্থকেরা, তারাই সফল মোহনবাগানকে পুরো ম্যাচে আটকে রাখল। সঙ্গে গোলে পর পর শটে কিছুটা ব্যস্ত রাখল সবুজ-মেরুনকে। ম্যাচের শুরুতে প্রায় গোল করেই ফেলেছিলেন নন্দকুমার। কিন্তু অল্পের জন্য হল না। গোলের নীচে নিজের জাত চেনালেন মরসুমের সব থেকে দামি গোলকিপার প্রভসুখন সিং গিল। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ফ্রিকিক থেকে বোরহার মাপা শট লাফিয়ে যে ভাবে বাঁচালেন না হলে গোল নিশ্চিত ছিল মোহনবাগানের। পরবর্তী সময়েও নিশ্চিত গোল বাঁচাতে দেখা গেল তাঁকে। তাঁর জন্য সব থেকে কঠিন পরীক্ষায় তিনি পাস করে গেলেন পুরো নম্বর নিয়ে। সব মিলে অনেকটাই ‘আন্ডারডগ’ হয়ে নেমে ম্যাচ ছিনিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল লাল-হলুদ ব্রিগেড।
দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলকেই দেখা গেল আক্রমণের ধার বাড়াতে। আক্রমণ পাল্টা-আক্রমণে ম্যাচ চলল অনেক ক্ষণ। একে অপরের গোলের কাছে পৌঁছে গেল বার কয়েক। আর এর মধ্যেই দুই গ্যালারিতে জ্বলে উঠল সান্ধ্যপ্রদীপ। তার মধ্যেই মুহূর্তে এক গ্যালারির সব উচ্ছ্বাস থেমে গেল অন্য গ্যালারির উৎসবে। যে ইস্টবেঙ্গলকে নিয়ে কোনও প্রত্যাশাই ছিল না, সেই লাল-হলুদ ব্রিগেডই এগিয়ে গেল গোল করে। এখানেই শেষ হয়ে গেল ম্যাচ। ৬০ মিনিটে মোহনবাগান অর্ধ থেকে নন্দকুমারকে লক্ষ্য করে বল বাড়িয়েছিলেন সল ক্রেসপো। সেই বল প্রায় মাঝ মাঠ থেকে ধরে একা দৌড় শুরু করেন নন্দকুমার। তাঁকে গার্ড করছিলেন মোহনবাগানের অনিরুদ্ধ থাপা। কিন্তু তাঁর পা থেকে বল কাড়তে ব্যর্থ তিনি। বক্সের মধ্যে যখন বল নিয়ে পৌঁছে যান নন্দকুমার তখন পাস দেওয়ার মতো কাউকে পাননি। কিন্তু হাল ছাড়েননি। ছাড়েননি বলের দখলও। অনিরুদ্ধকে কাটিয়ে বাগান কিপার বিশাল কাইথকে পরাস্ত করল নন্দকুমারের বাঁ পায়ের জোরালো শট।
তত ক্ষণে অন্ধকার নেমেছে মোহনবাগান গ্যালারিতে। জ্বলে উঠেছে ইস্টবেঙ্গলের দীর্ঘ দিন ধরে নিভে থাকা দীপ। যদিও তখনও হাতে বাকি আরও ৩০ মিনিট। বাগান সমর্থকদের একটা আশা তো ছিলই, কিন্তু স্বপ্ন পূরণ হল না। আর মরসুমের শুরুতে এই আত্মবিশ্বাসটাই দরকার ছিল কার্লেস কুয়াদ্রাতের দলের। টানা আট ডার্বি হারের পর ইস্টবেঙ্গলকে ডার্বি জয়ের স্বাদ দিলেন কুয়াদ্রাত। তার পরেও আক্রমণ হল ইস্টবেঙ্গলের তরফে। মোহনবাগানের তরফে পজিটিভ সুযোগ বলতে আনোয়ারের শট ক্রসবারে লেগে ফেরা। বেশ কিছু আধা চান্স তৈরি হলেও আর গোল হয়নি কোনও তরফেই। কথায় আছে, ‘ডার্বি অন্য বল গেম’। সেটা আরও এক বার প্রমাণ হয়ে গেল। প্রমাণ হয়ে গেল এই ম্যাচের ৯০ মিনিটই শেষ কথা, যেখানে কোনও ইতিহাস-ভূগোল কাজে লাগে না। টানা আট ডার্বি জয়, মরসুমে টানা আট ম্যাচ জিতে খেলতে নেমেও এ দিন হারের মুখ দেখল মোহনবাগান।
শেষ মুহূর্তে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই ঠায় গ্যালারিতে বসে থাকলেন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকেরা। কেউ জায়গা ছেড়ে নড়লেন না এক ইঞ্চিও। হতাশায় অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেল মোহনবাগান গ্যালারি। এ যেন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের স্বস্তির বৃষ্টি। চার বছরের খরা কেটে গিয়ে বৃষ্টি এল লাল-হলুদের ঘরে। একটা সময় বৃষ্টির দাপটে মাঠ ঝাপসা দেখাচ্ছিল। তার মধ্যেই চলল খেলা। শেষ বাঁশি বাজতেই উচ্ছ্বাসের বাঁধ ভাঙল ইস্টবেঙ্গল জনতার। বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে গেল তাঁদের আনন্দাশ্রুও। এই দিন তো বহু বছর দেখেনি ইস্টবেঙ্গল জনতা। আজ তাঁদেরই দিন।
ইস্টবেঙ্গল: প্রভসুখন সিং গিল, লাল চুংনুঙ্গা, হরমনজ্যোত সিং খাবরা, মন্দার রাও দেশাই, জর্ডন এলসে, নন্ধ কুমার (মহম্মদ মোবাসির), সল ক্রেসপো, সৌভিক চক্রবর্তী (এডউইন ভন্সপল), বোরহা হেরেরা (সুহের), নাওরেম মহেশ সিং (মহম্মদ রাকিপ), জ্যাভিয়ের স্যাভিয়েরো (গুইতে)।
মোহনবাগান: বিশাল কাইথ, আনোয়ার আলি, ব্রেন্ডন মিশেল হামিল, শুভাশিস বোস, আশিস রাই, অনিরুদ্ধ থাপা (আশিক কুরুনিয়ান), হুগো বুমৌস (দিমিত্রি পেত্রাতোস), গ্লেন মার্টিন্স, লিস্টন কোলাসো (সুহেল ভাট), আর্মান্দো সাদিকু (জেসন কামিন্স), মনবীর সিং (সাহাল আবদুল সামাদ)।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
