সুচরিতা সেন চৌধুরী, ভুবনেশ্বর: সন্ধে থেকেই কলিঙ্গ স্টেডিয়ামের আকাশে জ্বল জ্বল করছিল লালচে চাঁদ। পুরো ম্যাচে একইভাবে সেই চাঁদ সাক্ষী থেকে গেল কলিঙ্গ সুপার কাপ ফাইনালের। সাক্ষী থাকল সাড়ে ১০ হাজারের গ্যালারি। সাক্ষী থাকল ভারতীয় ফুটবল, এক অদম্য লড়াইয়ের, এক অসাধারণ ফুটবলের। দুই দলের হাল না ছাড়া লড়াইয়ের সঙ্গে চলল দুই কোচের মস্তিষ্কের লড়াই। যেখানে বাজিমাত করতে পারতেন যে কেউ। যে কারণে শেষ মিনিটে ঘুরে গেল খেলার মোর। যদিও অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলে জিতে ১২ বছর পর ট্রফি জয়ের স্বাদ পেল ইস্টবেঙ্গল। জ্বলল মশাল, বাজল ঢাক, এ যেন দমিয়ে রাখা এতদিনের উৎসবের বিস্ফোরণ।
কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে এমন ভরা গ্যালারি ফুটবলে অন্তত অতীতে দেখিনি। কলিঙ্গ সুপার কাপের ফাইনাল বলে কথা। অনেকটা অংশ ভরে থাকল স্থানীয় সমর্থকেই। কলকাতার দল ইস্টবেঙ্গলের মুখোমুখি ওড়িশা এফসি। চলতি আইএসএল-এর সফলতম দল এই ওড়িশা। তাই হয়তো ঘরের মাঠ পেয়ে বাড়তি উদ্যমের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসেরও তুঙ্গে ছিল দল। তবে পিছিয়ে ছিল না ইস্টবেঙ্গলও। বাইরের মাঠে একটা পুরো টুর্নামেন্টে একটিও ম্যাচ না হেরেই ফাইনালে পৌঁছেছিল লাল-হলুদ ব্রিগেড। তার উপর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বি মোহনবাগানকেও হারিয়ে তাদের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেওয়ার মতো কৃতিত্বও রয়েছে ইস্টবেঙ্গলের দখলে। তাই ধরেই নেওয়া হয়েছিল মরসুমের প্রথম ট্রফিটা হয়তো ওড়িশা থেকেই নিয়ে ফিরবে ইস্টবেঙ্গল। হলও তাই।
দিনের শুরুটা ছিল ওড়িশা এফসিরই। প্রথম থেকেই ইস্টবেঙ্গল বক্সকে সচল রাখলেন রয় কৃষ্ণা, মরিসওরা। যা সুযোগ তাঁরা মিস করলেন তাতে লাল-হলুদের ভাগ্য ভাল। যদিও প্রথমার্ধে এগিয়ে গেল ওড়িশা এফসিই। ৩৮ মিনিটে যে গোল করলেন দিয়েগো মরিসিও তাতে অনেকটাই ভুল থেকে গেল বোরহা হেরেরার। মাঝ মাঠ থেকে ফ্রিকিক বক্সের মধ্যে পাঠিয়েছিলেন জহু। সেই বল যখন রয় কৃষ্ণার কাছে পৌঁছয় তখন সামনেই ছিলেন বোরহা। কিন্তু তাঁকে কাটিয়েই মরিসিওকে বল বাড়ান কৃষ্ণা। সেই বল ইস্টবেঙ্গলের জালে জড়াতে একটুও ভুল করেননি মরিসিও।
প্রথমার্ধে ইস্টবেঙ্গলের একটাই সুযোগ ক্লেটনের কর্নার থেকে সিভিরিওর হেড। যা দুরন্ত দক্ষতায় সেভ করে দেন ওড়িশা গোলকিপার রালতে। প্রথমার্ধ শেষ হয় ওড়িশা এফসির পক্ষে ১-০ গোলে এগিয়ে থেকেই। বিরতিতে মোবাইলের টর্চ জ্বলে ওঠে ওড়িশা গ্যালারিতে।পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয়ার্ধ খেলতে নেমে শুরুতেই জোড়া পরিবর্তন করেন কোচ কার্লেস কুয়াদ্রাত। সিভেরিও তোরোর জায়গায় নামিয়ে দেন নাওরেম মহেশ ও মন্দার রাও দেশাইয়ের জায়গায় লাল চুংনুঙ্গাকে। দুই জাতীয় দলের প্লেয়ার নামতেই বদলে যায় প্রথমার্ধের ইস্টবেঙ্গল। সঙ্গে হয়তো ড্রেসিংরুমে কোচের ভোকাল টনিকও ছিল কিছু। আর প্রথম থেকেই মাঝমাঠে শৌভিক আর রক্ষণে হিজাজির লড়াই চোখে পড়ছিল। মহেশ নামতেই আক্রমণেও ঝাঁঝ বাড়ল।

যে বাঁ দিক অচল হয়ে ছিল প্রথমার্ধে, দুই জাতীয় দলের প্লেয়ারের আগমনে তা সচল হয়ে উঠল। মাঝ মাঠ থেকে একা টেনে নিয়ে বক্সের বাইরে যে বল বাড়ালেন মহেশ সিং সেই বলকে যোগ্য সম্মান দিলেন নন্ধা। ঠান্ডা মাথায় সেই বলকে টেনে নিয়ে গেলেন বক্সের ভিতরে গোল কিপারের সঙ্গে একের বিরুদ্ধে এক পজিশনে। সেখান থেকে মাথা ঠান্ডা রেখেই তাঁর গোলে শট। থেমে যাওয়া ইস্টবেঙ্গল গ্যালারি যেন মুহূর্তে আবেগে ভাসল। জায়ান্ট স্ক্রিনে ধরা পড়ল আনন্দে চোখের জল মুছছেন কোনও এক ফ্যান। ইস্টবেঙ্গল, ইস্টবেঙ্গল হুঙ্কারে আরও একবার কেঁপে উঠল কলিঙ্গর গ্যালারি।
৫২ মিনিটে সমতায় ফেরার পর ৬০ মিনিটে পেনাল্টি পেয়ে গেল ইস্টবেঙ্গল। বক্সের মধ্যে বোরহাকে ফাউল করে পেনাল্টি পাইয়ে দেন মোর্তাজা। সেখান থেকে গোল করতে ভুল করেননি সল ক্রেসপো। ২-১ গোলে এগিয়ে গিয়ে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে পৌঁছে যায় ইস্টবেঙ্গল। যদিও এক গোলের ব্যবধান যথেষ্ট ছিল না। এর মধ্যেই বোরহাকে ফাউল করে সরাসরি রেড কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় মোর্তাজা ফলকে। তবে আক্রমণ ছেড়ে দেয়নি ওড়িশা। না হলে ১০ জনে হয়ে যাওয়ার পরও অ্যামি রানাওয়াডের শট পোস্টে লেগে না ফিরলে ২-২ হয়ে যেত তখনই। এর পরও সহজ সুযোগ নষ্ট করেন বিষ্ণু। যার ফল ১০ মিনিটের জন্য মাঠে নামিয়েই তাঁকে তুলে নেন কোচ।
সাত মিনিটের অতিরিক্ত সময় যেন নিঃশ্বাস বন্ধ করেই কাটাচ্ছিলেন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা। বুকের ভিতর ঢিপঢিপানিটা শোনা যাচ্ছিল স্পষ্ট। কিন্তু মুহূর্তে তা থমকে গেল। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মিনিটে পেনাল্টি পেয়ে গেল ওড়িশা। সেখান থেকে সমতায় ফিরল গতবারের চ্যাম্পিয়নরা। এক মিনিটের জন্য থমকে গেল ইস্টবেঙ্গলের জয়। ম্যাচ গড়াল এক্সট্রা টাইমে। তার মধ্যেই মাঠে ঢুকে পড়লেন সমর্থক। খেলা থামিয়ে চলল সেলফি। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তরক্ষীরা চ্যাংদোলা করে তাঁকে বাইরে পাঠালেন।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে শৌভিকের শট ক্রসবারে লেগে ফেরার পরই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লেন তিনি। এর পর থেকে দুই দলই ১০ জনে খেলল। ১১০ মিনিটে খেলাটা শেষ করে দিলেন ক্লেটন সিলভাই। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক দিয়ে বল নিয়ে গোল লাইনের গা ঘেঁষে দ্বিতীয় পোস্টের কোণা দিয়ে জলে বল জড়ালেন তিনি। তার পর আর মাত্র কয়েক মিনিট। শেষ বাঁশি বাজতেই সব উচ্ছ্বাসের বাঁধ ভাঙল ইস্টবেঙ্গল গ্যালারিতে। লাল-হলুদ জোয়াড়ে ভেসে গেল ওড়িশার খেলার শহর।
ইস্টবেঙ্গল: প্রভসুখন গিল, মহম্মদ রাকিপ (সুহের), পার্দো লুকাস, হিজাজি মেহের, মন্দার রাও দেশাই (লাল নুনচুংনুঙ্গা), বোরহা হেরেরা (অজয় ছেত্রী), সল ক্রেসপো, শৌভিক চক্রবর্তী, সিভেরিও তোরো (নাওরেম মহেশ), নন্ধা কুমার (পিভি বিষ্ণু) (সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায়), ক্লেটন সিলভা।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
