অলস্পোর্ট ডেস্ক: গত তিন মরশুম ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) তালিকার একেবারে শেষ দিকে থেকে অভিযান শেষ করার পর এই মরশুমের প্রথম সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছে ইস্টবেঙ্গল এফসি। ৫৫ মাস পরে তারা যেমন চিরপ্রতিদ্বন্দী মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে হারিয়েছে, তেমনই অপরাজিত থেকে ডুরান্ড কাপের ফাইনালেও উঠেছে। তাই এ বার লাল-হলুদ সমর্থকরা ফের আশায় বুক বাঁধছে তাদের প্রিয় দল নিয়ে।
ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের আস্বস্ত করেছেন তাঁদের নতুন কোচ কার্লস কুয়াদ্রাত। বেঙ্গালুরু এফসি-কে আইএসএল খেতাব এনে দেওয়া কোচ এ বার লাল-হলুদ শিবিরে যোগ দেওয়ার পর বলেছিলেন, এটাই তাঁর কোচিং জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ডুরান্ড কাপে প্রথম ধাপ পেরিয়েছেন। এ বার আরও ওপরে ওঠার পালা। প্রথমবার আইএসএলের নক আউটে জায়গা অর্জন করাটাই তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। তবে সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে এখনয়ও অনেক পরিশ্রম করতে হবে বলে মনে করেন স্প্যানিশ কোচ।
বুধবার কলকাতায় আইএসএল মিডিয়া ডে-তে অংশ নিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “পাঁচ-ছ’সপ্তাহ আমরা ভাল ভাবে অনুশীলন করতে পেরেছি। এখনও অনেক কাজ বাকি। এই ক্লাবের একটা বড় ঐতিহ্য রয়েছে, যেটা অস্বীকার করা যায় না। আমাদের মানসিকতা বদলাতে হবে। যত সময় এগোবে, নিজেদের উন্নত করে তোলা দরকার, যাতে আরও আরও ভাল ফল করতে পারি। এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। আমরা একটা নতুন প্রক্রিয়ায় কাজ করা শুরু করেছি। সবে ছ’টা অফিশিয়াল ম্যাচ খেলেছি। এখনও ২৫টা ম্যাচ খেলতে হবে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে। দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আমাদের এই প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে”।
এ বার আইএসএলের দশম মরশুম। গত ন’বছরের বেশিরভাগ সময়ই কুয়াদ্রাত জড়িয়ে ছিলেন দেশের এক নম্বর লিগের সঙ্গে। আইএসএল-কে খুব কাছ থেকে দেখা কোচ বলেন, “আইএসএলের অনেকগুলো মরশুমে আমি কাজ করেছি। তাই জানি এই ন’বছরে অনেক উন্নতি করেছে আইএসএল। অনেক কোচই এখানে কাজ করেছেন এবং ভারতীয় ফুটবলেও বিদেশি কোচ আছেন। সব মিলিয়ে ভারতীয় ফুটবল এখন অনেক উন্নত জায়গায় রয়েছে। আইএসএলের সবার অবদান রয়েছে এ দেশের ফুটবলের এই উন্নতিতে”।
ডুরান্ড কাপের সাফল্যের পর সমর্থকেরা ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ বারের আইএসএলে ইস্টবেঙ্গলের সেরা ছয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক কোচ কোনও নিশ্চয়তা দিতে রাজি নন। তিনি বলেন, “এখনই বলতে পারব না কোথায় গিয়ে শেষ করব আমরা। এই লিগে সব দলই যথেষ্ট ভাল এবং প্রত্যেক দলে ভাল ভাল খেলোয়াড় আছে। অনেক কোচ আছেন, যাঁরা দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। তাই এই লিগ জমজমাটই হবে। আমাদেরও কাজটা মোটেই সোজা হবে না”।
মরশুমের শুরু থেকেই দল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছেন বলে জানান কুয়াদ্রাত। বলেন, “মরশুমের শুরুতেই আমরা একাধিক কৌশল ব্যবহার করে খেলেছি। কোনটার প্রভাব কতটা, কোনটা আমরা ভাল পারছি, সেই ফিড ব্যাকও আমরা পেয়েছি। প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের শক্তিশালী করে তুলতে আমাদের এখনও অনেক কাজ করতে হবে, অনেক দূর এগোতে হবে। আমরা মরশুমের শুরুতেই বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছি। এ রকম পরিস্থিতি আরও আসবে। সেগুলো সামলাতে জানতে হবে আমাদের”।
গত মরশুমে ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড ক্লেটন সিলভা ছাড়া আর তেমন কোনও বিশেষজ্ঞ ফরোয়ার্ড ইস্টবেঙ্গল দলে ছিলেন না। এ বার হাভিয়ে সিভেরিও, বোরহা হেরেরা ও সল ক্রেসপোদের মতো আক্রমণাত্মক ফুটবলার রয়েছেন দলে। কিন্তু তাই বলে লিগের শুরু থেকেই যে ইস্টবেঙ্গল আক্রমণের ঝড় তুলে দিতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা এখনই দিতে পারছেন না কুয়াদ্রাত। তিনি বলেন, “ওদের আরও তৈরি হতে হবে। ডুরান্ড কাপের আগে আমরা সব খেলোয়াড়দের একসঙ্গে আনাতে পারিনি। সিভেরিও, ক্লেটন সবার পরে আসে। ওদের আরও তৈরি হতে হবে। সে জন্য ওদের আরও ম্যাচটাইম দিতে হবে। অনুশীলনও করতে হবে। দেখা যাক ওরা আইএসএলের আগে তৈরি হয়ে যেতে পারে কি না”।
তবে আইএসএল শুরুর কয়েকদিন আগেই বিদেশি ডিফেন্ডার জর্ডন এলসির গুরুত্র আঘাত পেয়ে যাওয়ার খবরে চিন্তিত ইস্টবেঙ্গলের কোচ। তিনি বলেন, “এলসির মতো একজন ডিফেন্ডারের না থাকাটা বড় ক্ষতি। তবে আমাদের ভাল খেলতে হলে সেই ক্ষতি পূরণ করতেই হবে। জর্ডন এলসির বিকল্প খোঁজার কাজ শুরু করেছি আমরা। এই অবস্থায় নতুন কোনও খেলোয়াড়কে এনে তাকে তৈরি করে নেওয়া সহজ হবে না। তবে আমরা পেশাদার ক্লাব। দেখা যাক এই ব্যাপারে কী করা যায়”।
এ বারের আইএসএলের মাঝে একাধিক বিরতি থাকবে আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারের জন্য। এই বিরতিগুলিতে দলের ছন্দ নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে অনেকে মনে করলেও কোচ কুয়াদ্রাত কিন্তু সেই নিয়ে অতটা চিন্তিত নন। বলেন, “ হ্যাঁ জানি, একাধিক বিরতি রয়েছে এ বার আইএসএলের সময়। তবে যত বিরতি পাব, তত অনুশীলনের জন্যও বেশি সময় পাব আমরা। পরিকল্পনাও করারও সুযোগ পাব। তা ছাড়া কলকাতার সেরা উৎসব দূর্গা পূজোতেও আমরা আনন্দ করতে চাই”।
দলের খেলোয়াড়রাও এই মরশুমে ভাল ফলের ব্যাপারে আশাবাদী। গত মরশুমে দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ক্লেটন সিলভা যেমন বলেন, “গত বছরের চেয়ে এ বার আমরা অনেক উন্নতি করেছি। দলের অনেক খেলোয়াড়ই অনেক উন্নত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। দলও ভাল হয়েছে। এ বার আমাদের ভাল অনুশীলনও হচ্ছে। আশা করি, এ বার গতবারের চেয়ে ভাল ফলই হবে”।
গতবার দলের আক্রমণবিভাগে তিনিই ছিলেন প্রধান ভরসা। কিন্তু এ বার আর তিনি একা নন। রয়েছেন আরও এক ঝাঁক বিদেশি ফুটবলার। এই প্রসঙ্গে আশাবাদী ক্লেটন বলেন, “এবার আমি ছাড়াও আরও অ্যাটাকার রয়েছে আমাদের দলে। এতে আমাদের দলের ভাল হবে। এ বার আমাদের গতবারের চেয়ে বেশি গোল করতে হবে। তবে গতবারে আমি অনেক সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও সেগুলো হাতছাড়া করেছি। এ বার সব দিক দিয়েই আমাদের মান অনেক বেড়েছে। ফলে আশা করি, ভাল খেলব আমরা এবং ভাল ফলও হবে”।
মরশুমের প্রথম ডার্বিতে গোল করে যিনি ইস্টবেঙ্গল জনতার নয়নের মণি হয়ে উঠেছেন, সেই উইঙ্গার নন্দকুমার শেখর এখন আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটছেন। এ দিন সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ডার্বির গোলের পর তাঁর জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। বলেন, “জীবনের প্রথম ডার্বিতে শুরুর দিকে একটু নার্ভাস ছিলাম। আগে তো এই ম্যাচ টিভিতে দেখতাম। এখন আমি নিজে খেলছি, তাও আবার ৬০ হাজার দর্শকের মধ্যে। এটা অদ্ভূত এক অনুভূতি। কলকাতার ফুটবল সমর্থকদের আবেগ প্রচণ্ড। ওদের মতো সমর্থক সারা দেশে কম আছে। এখানে আসতে পেরে আমি খুব খুশি। এই ঐতিহ্যের অঙ্গ হতে পেরে আমি অভিভূত”।
ডার্বিতে গোলের পর জীবনে কী কী পরিবর্তন এসেছে, জানতে চাইলে তামিলনাড়ু থেকে উঠে আসা এই নতুন তারকা বলেন, “আমার পরিবার, বন্ধুরা খুব খুশি ডার্বির গোলের পর। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর মেসেজ পেয়েছি, রাস্তাঘাটে সবার প্রশংসা পাচ্ছি। সবাইকে এর জন্য ধন্যবাদ। সাড়ে চার বছর পরে ডার্বি জেতানোর পিছনে আমার অবদান ছিল, এটা ভাবতেই ভাল লাগছে। এটা আমার কাছে সন্মানের। আমি খুবই খুশি”।
নন্দশেখরও এ মরশুমে ভাল ফলের ব্যাপারে আশাবাদী। ডুরান্ড কাপেই তা বুঝতে পেরেছেন বলে জানালেন। বলেন, “ডুরান্ড কাপের আগে আমাদের হাতে প্রস্তুতির জন্য বেশি সময় ছিল না। তা সত্ত্বেও যথেষ্ট ভাল ফল করেছি। এই টুর্নামেন্ট আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। ওখানে যে সব ভুল হয়েছে, সেগুলো শোধরাতে আমরা সবাই যথেষেট অনুশীলন করছি। আশা করি, আসন্ন আইএসএলে আরও উন্নতি করব”।
একদিকে যেমন জর্ডন এলসি নেই, তেমনই এশিয়ান গেমসে ভারতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য চলে যেতে পারেন লালচুঙনুঙ্গাও। তাই আইএসএলের শুরুতে লাল-হলুদ দূর্গ সামলানোর ভূমিকায় নামতে হতে পারে পাঞ্জাবের তরুণ ডিফেন্ডার গুরসিমরাত সিং গিল-কে। কুয়াদ্রাতের দলের এক নম্বর গোলকিপার প্রভসুখনের ভাই গুরসিমরাত জানিয়ে দেন, যে কোনও পরিস্থিতিতে মাঠে নামতে প্রস্তুত তিনি। বলেন, “আইএসএলের শুরুর দিকে আমি আমাকে প্রথম এগারোয় রাখা হবে কি না, সে তো আমার হাতে নয়। তবে আমাদের প্রত্যেককেই সব সময় তৈরি থাকতে হয়। দলে কেউ থাকুক বা না থাকুক, সেটা বড় কথা নয়। আমিও তৈরি। কোচ যখনই বলবেন, মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত আমি”। লাল-হলুদ ফুটবলারদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়, ডুরান্ড ফাইনালে খেলার পর কতটা আত্মবিশ্বাসী তাদের ড্রেসিং রুম।
(লেখা আইএসএল ওয়েবসাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
