সুচরিতা সেন চৌধুরী, ভুবনেশ্বর: এ যেন একটুকরো কলকাতা ওড়িশার বুকে। ইস্টবেঙ্গল ফাইনালে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই আবহটা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। রাতারাতি শেষ হয়ে গিয়েছিল সব ট্রেনের টিকিট আর একদিন আগে থেকে শিয়ালদহ, হাওড়া হোক বা ধর্মতাল বাসস্ট্যান্ড, শুধুই ভুবনেশ্বরগামী ইস্টবেঙ্গল সমর্থকের আনাগানো। আর ম্যাচের দিন সকাল থেকে ভুবনেশ্বরের রাস্তায় ঘুরতে ফিরতে দেখা হয়ে গেল লাল-হলুদ জার্সি পরা সমর্থকের। সকালেই পৌঁছে সারাদিন এদিক, ওদিক ঘুরে রাতে ম্যাচ দেখেই আবার ফেরার পথ ধরা। এবারের মতো শেষ হবে কলিঙ্গ সুপার কাপ যাত্রা। মনে একরাশ স্বপ্ন নিয়েই কলকাতা থেকে বার বার ভুবনেশ্বরে পৌঁছে গিয়েছেন সমর্থকরা। দলও সমর্থকদের এই আবেগকে উসকে দিয়েছে সব ম্যাচ জিতে ফাইনালে পৌঁছে। টুর্নামেন্টের দুই সেরা দল হিসেবেই ফাইনালে পৌঁছেছে ইস্টবেঙ্গল ও ওড়িশা এফসি।
ট্রেন থেকেই শুনছিলাম, ”জয় ইস্টবেঙ্গল”এর ধ্বনি। রাজ্য বদলে গেলেও এই দিনটিতে সেই শব্দ ব্রহ্ম বদলালো না। শুধু কি তাই? একাধিক বাস বোঝাই হয়ে এলেন সমর্থকরা। ইস্টবেঙ্গল আলট্রাসেরই একাধির বাস কলকাতা শহর থেকে পৌঁছল ভুবনেশ্বরে। ভিন রাজ্যেও কলিঙ্গ স্টেডিয়ামের গ্যালারি যেন দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেল। ঢাক, ঢোল, কাসর, ঘণ্টা নিয়ে গ্যালারি কাঁপালেন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা। হকিপ্রেমী রাজ্য হলেও সরকারের কল্যানে এখন ক্রমশ ক্রীড়াপ্রেমী রাাজ্যে পরিণত হচ্ছে ওড়িশা। আর সে কারণেই হয়তো গ্যালারির অনেকটাই ভরে থাকল ওড়িশা এফসির সমর্থকে। সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি ছিল স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। ছিল বিশেষ ছাত্রছাত্রীরাও।

তবে সব কিছুকে ছাঁপিয়ে গেলেন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা। বনগাঁ থেকে সোনারপুর, বাটানগর থেকে হালতু, বরাহনগর থেকে নৈহাটি, যেন এক টুকরো কলকাতা উঠে এল ভুবনেশ্বরের বুকে। বনগাঁ ইস্টবেঙ্গল ফ্যানস ক্লাব, সোনাপুর সাপোর্টার্স, বাটানগর লাল হলুদ পরিবার, হালতু ইস্টবেঙ্গলিয়ান্স, কালাকারপাড়া, লালহলুদ বাহিনী, নৈহাটি বাঙাল, এই নাম লিখতে শুরু করলে শেষ করা যাবে না। গ্যালারির একাংশ ভরে থাকল এতেই। জমজমাট হয়ে উঠেছিল কলিঙ্গ সুপার কাপের গ্যালারি। ফুটবলকে এভাবেই দেশের বিভিন্ন কোণায় ছড়িয়ে দিতে পারে বাংলার সর্থকরাই। এই পাগলামোটা হয়তো ভারতের আর কোথাও নেই।

ম্যাচ শুরুর কয়েকঘণ্টা আগে থেকেই কলিঙ্গ স্টেডিয়ামের তিন নম্বর গেটের বাইরে ভিড় জমিয়েছিলেন সমর্থকরা। এক কথায় আস্তানা গেড়েছিলেন সেখানেই। গত কয়েকটি ম্যাচে এই দৃশ্যই দেখা গিয়েছে বার বার। অফিস কামাই করে, হাতখরচার টাকা জমিয়ে, কোনও রকমে ছুটে আসা নিজের দলকে সমর্থন করতে। তাই হোটেল খরচ বাঁচাতে এই ব্যবস্থা। স্টেডিয়াামের বাইরের একফালি সবুজ গালিচায় কেউ কেউ তো সপরিবারে, স্ত্রী থেকে ছোট্ট বাচ্চাকে নিয়ে হাজির ।প্যাকেট করে আনা দুপুরের খাওয়া সারলেন সেখানেই। কেউ আবার দলের জার্সি, পতাকা নিয়ে স্টেডিয়ামের বাইরে দোকানও খুলে ফেললেন।
মরসুমের দ্বিতীয় ফাইনাল। ডুরান্ড কাপ শেষ মুহূর্তে হাতছাড়া হয়েছিল। এই ট্রফি যেমন হাতছাড়া করতে চান না কোচ কার্লেস কুয়াদ্রাত-সহ পুরো দল তেমনই সমর্থকরা। তাই সব সমস্যাকে পিছনে ফেলে দলকে সমর্থন করতে ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়া আর দলের জন্য গলা ফাটানো। এদিন ম্যাচের আগে দুই দলের প্লেয়ারদের সঙ্গে পরিচিত হলেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী নবীন পটনায়ক। তার পরই শুরু হয়ে গেল লড়াই। ফাইনালের লড়াই। শেষ হাসি কে হাসবে তা সময়ই বলবে। ঘরের মাঠে কঠিন প্রতিপক্ষ ওড়িশা, অন্যদিকে বাংলার দলের চিরকালীন গাঁটও বটে। তবে ইস্টবেঙ্গল মরিয়া সব মিথ ভেঙে প্রথম ট্রফি ঘরে তুলতে।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
