অলস্পোর্ট ডেস্ক: রাত পোহালেই আইএসএল ২০২৩-২৪-এ ইস্টবেঙ্গল বনাম জামশেদপুর। গত মরশুমে দুই দলই ছিল লিগ তালিকার একেবারে নীচের দিকে। ইস্টবেঙ্গল যেখানে ন’নম্বরে থেকে লিগ শেষ করে, জামশেদপুর শেষ করে দশ নম্বরে। এ বারের আইএসএলে তাই দুই পক্ষেরই সামনে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। সেই আত্মবিশ্বাস আইএসএলের মতো কঠিন মঞ্চে কতটা কাজে লাগবে, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাবে সোমবারের ম্যাচেই। ভাল দল তৈরি করেছে তারা। ভাল কোচও এনেছে। এই সিদ্ধান্তগুলির সুপ্রভাব যদিও মাঠে পড়তে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু আইএসএল যে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের লড়াই, তা সব কোচই স্বীকার করেন। এখানে সফল হতে গেলে শুধু ভাল খেললে চলে না, খুবই ভাল খেলতে হয় এবং ধারাবাহিক ভাবে ভাল খেলে যেতে হয়।
জামশেদপুরের সাম্প্রতিক অতীতটা আরও করুণ। ২০২১-২২ মরশুমে তারা লিগ শিল্ড চ্যাম্পিয়ন হয় কোচ আওয়েন কোইলের প্রশিক্ষণে থেকে। কিন্তু গত মরশুমে কোচ হিসেবে তিনি ছিলেন না। এডি বুথরয়েডকে কোচ হিসেবে আনে তারা। দলে একাধিক খেলোয়াড়ও পরিবর্তন করা হয়। কিন্তু তাতে খুব একটা সুফল আসেনি। আগের বারের লিগ, শিল্ডজয়ীরা গত মরশুমে দশ নম্বরে থেকে লিগ শেষ করে, যা লিগের ইতিহাসে তাদের সবচেয়ে খারাপ ফল। এমনকী এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করার জন্য প্লে অফ ম্যাচেও মুম্বই সিটি এফসি-র কাছে হেরে গিয়ে তাদের মহাদেশের সেরা ক্লাব লিগে খেলার স্বপ্নও চুরমার হয়ে যায়। এ বার সেই দুঃস্বপ্নময় সময় থেকে নিজেদের বের করে নিয়ে আসার পালা ইস্পাতনগরীর দলের। সে জন্য তাদের শুরুটা ভাল হওয়া দরকার। সোমবারের ম্যাচেই বোঝা যাবে নিজেদের চেনা ছন্দে ফেরানোর জন্য সত্যিই কতটা প্রস্তুত তারা।
দুই শিবিরের খবর
ইস্টবেঙ্গল এফসি: লাল-হলুদ বাহিনী এ বার ঢেলে সাজিয়েছে দলকে। কোচ হিসেবে এনেছে অতীতে আইএসএলে সাফল্য পাওয়া স্প্যানিশ কার্লস কুয়াদ্রাতকে, যিনি ২০১৮-১৯ মরশুমে প্রধান কোচের দায়িত্ব নিয়ে বেঙ্গালুরু এফসি-কে চ্যাম্পিয়নের খেতাব এনে দিয়েছিলেন। একই মরশুমে তারা লিগ ও নক আউট দুইই জেতে। অভিজ্ঞ ও সফল এই কোচ দলে যোগ দিয়ে বেশ কয়েকজন তারকা ফুটবলারকে দলে নিয়ে আসেন, যাঁদের আইএসএলে অভিজ্ঞতা ও সাফল্য দুইই আছে। স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড হাভিয়ে সিভেরিও ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার সল ক্রেসপোর সঙ্গে হায়দরাবাদ এফসি থেকে আসা স্প্যানিশ মিডফিল্ডার বোরহা হেরেরা গঞ্জালেসকেও দেখা যাবে মাঠে। যোগ দেন আর এক স্প্যানিশ ডিফেন্ডার হোসে পার্দো। এ ছাড়া গত মরশুমের দলে থাকা বিদেশি স্ট্রাইকার ক্লেটন সিলভা তো এ বারেও আছেন।
এঁদের সঙ্গে কয়েকজন তরুণ ও অভিজ্ঞ ভারতীয় ফুটবলারকেও নেয় ইস্টবেঙ্গল, যাঁরা যে কোনও দলকে ভরসা জোগাতে পারেন। যেমন নির্ভরযোগ্য উইঙ্গার নাওরেম মহেশ সিং, সিনিয়র ডিফেন্ডার হরমনজ্যোৎ সিং খাবরা, মান্দার রাও দেশাই ও রাইট ব্যাক এডুইন ভন্সপল, ওডিশা এফসি থেকে আসা উইঙ্গার নন্দকুমার শেখর, কেরালা ব্লাস্টার্স থেকে আসা ডিফেন্ডার নিশু কুমার ও পাঞ্জাবের গোলকিপার প্রভসুখন গিল। একাধিক জুনিয়র ফুটবলারও তৈরি লাল-হলুদ শিবিরে। অনূর্ধ্ব ১৭ ভারতীয় দলের দুই সদস্য ভানলাপেকা গুইতে ও গুনরাজ সিং গ্রেওয়াল, প্রভসুখনের ভাই ডিফেন্ডার গুরসিমরাত গিল ও অজয় ছেত্রীও রয়েছেন দলে। নির্ভরযোগ্য উইঙ্গার মহেশ সিংকে এ বারও নিশ্চয়ই ক্লেটনের সঙ্গে জুটি বাঁধতে দেখা যাবে। মহেশের সঙ্গে ২০২৭ পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণা ইস্টবেঙ্গল করেছে শনিবারই। এই ঘোষণায় নিশ্চয়ই আরও উজ্জীবিত হবেন তিনি। এ রকমই মিশ্রণে কুয়াদ্রাত গড়ে তুলেছেন এমন এক দল যাঁরা তিন মরশুম পরে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবকে সাফল্যের মুখ দেখিয়েছেন ডুরান্ড কাপে রানার্স হয়ে।
জামশেদপুর এফসি: গতবার যে বিদেশিরা দলে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে শুধু নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার ড্যানিয়েল চিমা চুকুউকে এই মরশুমের দলে রেখে দেয় জামশেদপুর এফসি। আক্রমণ বিভাগকে ঢেলে সাজাতে এ বার চেন্নাইন এফসি থেকে আনা হয়েছে পেটার স্লিসকোভিচকে। চিমার সঙ্গে হয়তো তাঁকেই অ্যাটাকিং থার্ডে দেখা যাবে। এ ছাড়াও মিডফিল্ডার জেরেমি মানজোরো ও ফরোয়ার্ড অ্যালেন স্টেভানোভিচও আছেন দলের আক্রমণে। ব্রাজিলের মিডফিল্ডার এলসন হোসে ডায়াস জুনিয়র ও জাপানি মিডফিল্ডার রেই তাচিকাওয়া-কেও নিশ্চয়ই মাঠে নামাবেন কোচ স্কট কুপার।
ভারতীয় ফুটবলারদের মধ্যে ইমরান খান ও এমিল বেনির ওপর মাঝমাঠ সামলানোর দায়িত্ব দিতে পারেন কোচ। বাংলার উইঙ্গার ঋত্বিক কুমার দাস গতবারও যেমন যথেষ্ট ভাল পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন, এ বারও আশা করা যায় ভাল ফর্মেই থাকবেন। গতবার ১৮ ম্যাচে ছ’গোল করে তিনি ভারতীয় দলে ডাক পেয়েছিলেন। এ বার আইএসএলে ভাল খেলা দেখাতে পারলে আগামী এএফসি এশিয়ান কাপের দলেও ডাক আসতে পারে তাঁর। এছাড়া প্রতীক চৌধুরি, প্রভাত লাকড়া, রিকি লাল্লমওমা, জারমানপ্রীত সিং, জীতেন্দ্র সিং, প্রণয় হালদার, কোমল থাটাল, নিখিল বারলা, নঙদম্বা নাওরেম, সেমিনলেন দুঙ্গেল ও থঙ্গোসিম হাওকিপের মতো প্রতিভাবান ভারতীয়রাও জামশেদপুর শিবিরে রয়েছেন।
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স
ইস্টবেঙ্গল এফসি: গত তিন মরশুম ধরে টানা একতরফা ব্যর্থতার পর এ বছর ডুরান্ড কাপের ফাইনালে উঠে ইস্টবেঙ্গলকে নতুন দিশা দেখিয়েছেন কুয়াদ্রাত ও তাঁর দলের ফুটবলাররা। অসাধারণ এক গোল করে দলকে বহু আকাঙ্খিত ডার্বি-জয় এনে দেন দলের নতুন ‘হিরো’ নন্দকুমার শেখর। যদিও সেই ডার্বির আগে ধারে ও ভারে এবং সাম্প্রতিক সাফল্যের বিচারে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছিলেন ফুটবল বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ইস্টবেঙ্গল সে দিন দেখিয়ে দেয়, ফুটবলে পরিকল্পনা ও পারফরম্যান্সই শেষ কথা বলে। শুধু এই জয় নয়, টানা চার ম্যাচে অপরাজিত থেকে ডুরান্ডের ফাইনালে ওঠে তারা। ফাইনালে ফের চিরপ্রতিদ্বন্দী মোহনবাগান এসজি-রই মুখোমুখি হয়। জিততে না পারলেও সারা মরশুমে যে প্রতিপক্ষদের সঙ্গে সমানে টক্কর দেবে তারা, তার ইঙ্গিত প্রথম টুর্নামেন্টেই দিয়ে রেখেছে ইস্টবেঙ্গল।
জামশেদপুর এফসি: গত মরশুমে দশ নম্বরে থেকে আইএসএল শেষ করার পরে এই মরশুমও যে খুব একটা ভাল ভাবে শুরু করতে পেরেছে ইস্পাতনগরীর দল, তা বলা যায় না। মরশুমের শুরুতেই তিন ম্যাচে এগারো গোল খেয়েছে তারা। ডুরান্ড কাপের প্রথম ম্যাচেই তারা মুম্বই সিটি এফসি-র কাছে পাঁচ গোল খায়। এর পরে তারা ভারতীয় নৌসেনার দলকে ১-০-য় হারালেও কলকাতার মহমেডান স্পোর্টিং তাদের ৬-০-য় হারায়। যদিও সেটা ছিল তাদের অ্যাকাডেমি দল। তাই সেই ফলকে একেবারেই গুরুত্ব দিতে রাজি নন কোচ স্কট কুপার। তাঁর মতে, আইএসএলে তাদের আসল দল খেলবে এবং তারা অনেক প্রতিপক্ষকেই চমকে দিতে পারে। কুপার বলছেন, তাঁর আসল দল এখন অনেক ভাল জায়গায় রয়েছে এবং আইএসএলে তারা প্রতিপক্ষদের কঠিন চ্যালেঞ্জ ছোঁড়ার জন্য তৈরি।
পরিসংখ্যানবিদরা কী বলছেন?
জামশেদপুরের বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গলের সাফল্যের শতকরা হার মাত্র ২০ শতাংশ। পাঁচবারের মুখোমুখিতে মাত্র একটিতে জয় পেয়েছে কলকাতার দল। বাকি দু’টিতে ড্র ও দু’টিতে হার। গত মরশুমে ইস্টবেঙ্গল তাদের দশটি হোমম্যাচের মধ্যে মাত্র দু’টিতে অর্থাৎ ২০ শতাংশে জিতেছিল। আইএসএলের এক মরশুমে হোম ম্যাচে এত কম জয় আর কোনও দলের নেই। জামশেদপুরের ঘরের মাঠে সাফল্যের হার ৩২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানে একমাত্র তারাই লাল-হলুদ শিবিরে কাছাকাছি রয়েছে। গত মরশুমে বক্সের বাইরে থেকে ইস্টবেঙ্গলের দেওয়া গোলের সংখ্যা মাত্র এক। ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্ডার হরমনজ্যোৎ সিং খাবরা সব মিলিয়ে আইএসএলে ৩৭ বার হলুদ কার্ড দেখেছেন, যা এই লিগে সর্বোচ্চ। এই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে তাঁকে।
গত আইএসএলে কলকাতায় এসে জামশেদপুর এফসি ২-১-এ হারিয়ে গিয়েছিল ইস্টবেঙ্গলকে। সোমবারও জিতলে তারাই প্রথম ইস্টবেঙ্গলকে কলকাতায় টানা দু’বার হারানোর কৃতিত্ব অর্জন করবে। গত আইএসএলে তারা টানা চারটি অ্যাওয়ে ম্যাচ জিতেছিল। একমাত্র মুম্বই সিটি এফসি (৮) ছাড়া এই কৃতিত্ব আইএসএলের আর কোনও ক্লাবের নেই। আইএসএলে গত চার ম্যাচে তারা অপরাজিত। টানা জয়ের নজির তাদের আগেও ছিল। ২০২২-এর ফেব্রুয়ারি-মার্চে টানা সাতটি ম্যাচে অপরাজিত ছিল তারা। গত মরশুমে বক্সের বাইরে থেকে সাতটি গোল খেয়েছিল ইস্পাতনগরীর দল। পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে মাত্র একটি গোল করেছিল তারা।
নজরে যাঁরা
হাভিয়ে সিভেরিও: গত মরশুম পর্যন্ত হায়দরাবাদ এফসি-তে খেলার পর এ বছর ইস্টবেঙ্গল এফসি-র সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন এই স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড। মরশুমের শুরুতেই তিনি লাল-হলুদ বাহিনীর আক্রমণ বিভাগকে যথেষ্ট শক্তিশালী করে তুলেছেন। ডুরান্ড কাপে দু’টি গোলও করেছেন। আইএসএলে ৪৫টি ম্যাচে ১২টি গোল রয়েছে তাঁর। গতবার ২০টি ম্যাচ খেলে পাঁচটি গোল করেন দেশের সেরা লিগে। হিরো সুপার কাপে তিনটি ম্যাচ খেলে তিনটি গোল করেন। মরশুমের শেষ টুর্নামেন্টে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেন তিনি। এ বার সেই ইস্টবেঙ্গলের জার্সি গায়েই মাঠে নামছেন।
জেরেমি মানজোরো: পোল্যান্ডের লিগ থেকে এসে এ বারই প্রথম আইএসএল গ্রহে প্রবেশ করা এই ফরাসি প্লে-মেকার যে কোনও দলের খেলায় বৈচিত্র এনে দিতে পারেন তিনি। সারা কেরিয়ারেই সাফল্যের সঙ্গে খেলে এসেছেন। বিশেষ করে কাজাখস্তানে। কাজাখ লিগে দু-দু’বার চ্যাম্পিয়নের পালক রয়েছে তাঁর মুকুটে। ২০২১-এ তোবোল কোস্তানায় ও ২০২২-এ এফসি আস্তানার সঙ্গে। ২০২১-এ কাজাখ কাপও জেতেন। আক্রমণে বিভিন্ন পজিশনে সমান ভাল খেলতে পারেন তিনি। ফলে নিজেকে যথেষ্ট কার্যকরী করে তুলেছেন। তাঁর এই সাফল্য ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারলে জামশেদপুর এফসি এ বার ভাল ফল করতেই পারে।
ম্যাচ- ইস্টবেঙ্গল এফসি বনাম জামশেদপুর এফসি
ভেনু- বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন, কলকাতা
সময়- ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, সোমবার, রাত ৮টা
সরাসরি সম্প্রচার ও স্ট্রিমিং
টিভি: ডিডি বাংলা ও কালার্স বাংলা সিনেমা- বাংলা, স্পোর্টস ১৮ খেল- হিন্দি, স্পোর্টস ১৮ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ, ভিএইচ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ, সূর্য মুভিজ- মালয়ালাম
স্ট্রিমিং: জিও সিনেমা ও ওয়ানফুটবল
(লেখা আইএসএল ওয়েবসাইট)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
