Cart Total Items (0)

Cart

All Sports India

অলস্পোর্ট ডেস্ক: গত চার মাস ধরে, রায়ান উইলিয়ামসের মনে কেবল একটিই তারিখ ঘুরপাক খাচ্ছিল, ৩১ মার্চ। আর সেই দিন এসেই গেল তাঁর জীবনে। আর মাত্র মাঝে দুটো দিন। তার পরই ভারতীয় দলের জার্সিতে খেলতে নেমে পড়বেন তিনি। ফিফা থেকে খেলার ছাড়পত্র পাওয়ার পর যে দীর্ঘ অপেক্ষার পালা শুরু হয়েছিল, সেই সময়ের কথা স্মরণ করতে গিয়ে তিনি স্বীকার করেন, “ছাড়পত্রটা হাতে পাওয়ার পর থেকে আমার মনে শুধুই ৩১ মার্চ তারিখটিই ছিল।”

ফিফার ‘প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস চেম্বার’ থেকে ছাড়পত্রটি এসেছিল ঠিক কয়েক ঘণ্টা দেরিতে—যার ফলে ১৮ নভেম্বর, ২০২৫-এ বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতের সর্বশেষ ম্যাচে তিনি দলে জায়গা করে নিতে পারেননি। তিনি দলের সঙ্গে অনুশীলন করেছিলেন, দলের পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন এবং এমনকি ঢাকা পর্যন্ত গিয়েছিলেন—যা ছিল তাঁর নতুন ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে করা প্রথম বিদেশ সফর—কিন্তু বাংলাদেশের রাজধানীর ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় পা রাখার সুযোগ তাঁর হয়নি।

তবুও, সেই হতাশার মুহূর্তেও উইলিয়ামস নিরাশ না হয়ে বরং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকেই বেছে নিয়েছিলেন। “আপনি সবসময়ই চেষ্টা করেন পরিস্থিতির ইতিবাচক দিকটি খুঁজে বের করতে। যদিও আমি সেই ম্যাচটির অংশ হতে পারিনি, তবে অন্তত এখন আমি ‘নীল জার্সি’ গায়ে জড়িয়ে—এবং আমাদেরই সমর্থকদের সামনে—আমার আন্তর্জাতিক অভিষেকের সুযোগ পেতে পারি।”

“এমন নয় যে কমলা রঙের জার্সিটি ভালো নয়। তবে নীল রঙের জার্সিটির তাৎপর্য অনেক গভীর… আর ভারতের ফুটবলের অন্যতম পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত কেরালায় দাঁড়িয়ে সেই অভিষেক ঘটানোটা তো আরও বেশি বিশেষ কিছু।” এএফসি এশিয়ান কাপ ২০২৭ বাছাইপর্বের চূড়ান্ত পর্বের শেষ ম্যাচ-দিনে, আগামী মঙ্গলবার (৩১ মার্চ), কোচির জওহরলাল নেহরু আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে ‘ব্লু টাইগার্স’ মুখোমুখি হবে হংকংয়ের।

“সেই অনুভূতিটা ঠিক কেমন হবে, তা আমি এখনও জানি না,” তিনি বলেন। “আমি বিষয়টি নিয়ে ভেবেছি বটে, তবে শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে,” বলেন ৩২ বছর বয়সী এই ফুটবলার, যার জন্ম অস্ট্রেলিয়ার পার্থ শহরে।

ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে তিনি বলেন, একদমই সংক্ষিপ্ত বা সহজ কোনও বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত ছিল বিভিন্ন বিধিগত যাচাই-বাছাই, নথিপত্র সংক্রান্ত কাজ, পাসপোর্ট পাওয়ার এক কঠোর ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং সবশেষে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ফিফার ‘প্লেয়ার্স স্ট্যাটাস চেম্বার’-এর অনুমোদন লাভ—যে সিদ্ধান্তটি ‘ফুটবল অস্ট্রেলিয়া’ থেকে ‘সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন’-এ নিজের অধিভুক্তি পরিবর্তনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর খেলার যোগ্যতা নিশ্চিত করেছিল।

“এক গভীর স্বস্তির অনুভূতি, অবশেষে সব বাধা পেরিয়ে লক্ষ্য অর্জন করতে পারা এবং এখানে উপস্থিত থাকতে পারাটা সত্যিই ভীষণ বিশেষ কিছু বলে মনে হচ্ছে,’’ স্মৃতিচারণ করে বলেন উইলিয়ামস।

এমন কিছু মুহূর্তও এসেছিল, যখন এই পুরো যাত্রাপথটিকেই অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল। “অনেকেই আমাকে বলেছিলেন যে, এটা সম্ভব নয়,” তিনি জানান। “তবে আমি স্বভাবতই কিছুটা একগুঁয়ে প্রকৃতির হওয়ায়, তাদের সেই কথায় খুব একটা কান দিইনি।” সেই জেদই শেষমেশ তাঁকে তাঁর স্বপ্নের কাছে নিয়ে যায়। কারণ, চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণ না আসা পর্যন্ত—এবং ভারতীয় পাসপোর্টটি হাতে না পাওয়া পর্যন্ত—এমনকি সে নিজেও স্বীকার করেন যে, পুরো বিষয়টি তাঁর কাছেও পুরোপুরি বাস্তব বলে মনে হয়নি।

উইলিয়ামসের আগমন দলে কেবল আরেকটি নতুন সংযোজন মাত্র নয়; এটি ভারতীয় ফুটবলের বিবর্তনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মুহূর্তের সূচনা করেছে। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের ফুটবল কাঠামোর ফসল উইলিয়ামস; পোর্টসমাউথ, ফুলহ্যাম, অক্সফোর্ড ইউনাইটেড, বার্নসলি, রদারহ্যাম ইউনাইটেড এবং পার্থ গ্লোরির মতো ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই খেলোয়াড় বিদেশে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছিলেন। ২০১৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে তিনি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। এছাড়া তিনি অস্ট্রেলিয়ার অনূর্ধ্ব-২৩ ও অনূর্ধ্ব-২০ দলেও খেলেছেন। এরপর ২০২৩ সালে ইন্ডিয়ান সুপার লিগের দল বেঙ্গালুরু এফসি-র হয়ে খেলার উদ্দেশ্যে তিনি ভারতে আসেন।

তিন বছর আগে যখন তিনি ভারতে এসেছিলেন, তখন তিনি ছিলেন কেবলই দলে যোগ দেওয়া আরেকজন বিদেশি খেলোয়াড়। কিন্তু গত কয়েক মাসে যা কিছু ঘটেছে, তা তাঁর গল্পটিকে অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করে তুলেছে। ভারতীয় নাগরিক হিসেবে তার এই আনুষ্ঠানিক রূপান্তরের ফলে উইলিয়ামস এখন এক অন্যরকম দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন, কার্যত তিনিই প্রথম এমন প্রাক্তন বিদেশি খেলোয়াড়, যিনি ভারতের ঘরোয়া ফুটবল লিগ ব্যবস্থায় খেলার পর এখন ভারতের জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন।

যদিও তাঁর পেশাদার ফুটবল জীবনের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডে, তবুও ভারতের সঙ্গে উইলিয়ামসের সম্পর্কটি মোটেও সাম্প্রতিক নয়, বরং তা বংশপরম্পরায় চলে আসা এক গভীর বন্ধন। তাঁর মায়ের জন্ম মুম্বইতে; আর তারও অনেক আগে, তাঁর দাদু লিংকন গ্রোস্টেট ‘সন্তোষ ট্রফি’-তে বম্বে দলের হয়ে খেলে ভারতীয় ফুটবলে নিজের ছাপ রেখে গিয়েছিলেন। উইলিয়ামসের যমজ ভাই আরিন উইলিয়ামসও ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ‘আই-লিগ’-এর দল নেরোকা এফসি-র হয়ে খেলেছেন। পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সেই ঐতিহ্যের গুরুত্ব উইলিয়ামসের কাছে বিন্দুমাত্র কম নয়।

“এটি আমার কাছে যেন একটি পূর্ণাঙ্গ বৃত্ত রচনার মুহূর্ত, আমার দাদু একসময় সন্তোষ ট্রফিতে খেলেছিলেন, আর এখন তার নাতি হিসেবে আমি ফিরে এসে ভারতীয় জাতীয় দলের অংশ হতে পেরেছি—এটি সত্যিই অত্যন্ত বিশেষ একটি অনুভূতি। আমার পরিবারের কাছেও এটি অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়,’’ বলেন তিনি।

তবে কোনও দেশের জাতীয় দলে নতুন করে জায়গা করে নেওয়া বা মানিয়ে নেওয়া কখনওই খুব একটা সহজ কাজ নয়। ভারতীয় জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর অনুভূতি এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গুরুদায়িত্বের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। “দলে যোগ দেওয়ার সময় আমি বেশ কিছুটা স্নায়ুচাপে ভুগছিলাম, কারণ আপনি আগে থেকে জানেন না যে, দলের বাকি সদস্যরা আপনাকে কীভাবে গ্রহণ করবেন বা আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন,” উইলিয়ামস স্বীকার করেন।

ক্যাম্পে প্রতিটি দিন কাটানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি বুঝতে পেরেছেন সাবাই তাঁকে সাদরে গ্রহন করেছেন। এই আপন করে নেওয়ার অনুভূতি ক্রমশ দৃঢ় হয়েছে। “এটা আমার দ্বিতীয় ক্যাম্প, এবং আমি স্বীকার করছি যে আগেরবারের চেয়ে এবার আমি অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে এসেছি, কারণ আমি আরও বেশি পরিচিত হয়ে গিয়েছি। ক্যাম্পের সবাই খুব বিনয়ী, খুব ভালো। আমরা সবসময় আনন্দে থাকি এবং হাসিখুশি থাকি,” তিনি বলেন।

(তথ্য এআইএফএফ ওয়েবসাইট থেকে)

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *