অলস্পোর্ট ডেস্ক: টানটান উত্তেজনায় ঠাসা ১২০ মিনিটের ফুটবল-যুদ্ধ পেরিয়ে পেনাল্টি শুট আউটে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৩-এর সেমিফাইনাল জিতে নিল গতবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত। শনিবার বেঙ্গালুরুর কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে ভারতের গোলকিপার ও বহু যুদ্ধের সেরা সৈনিক গুরপ্রীত সিং সান্ধু যেমন ফের একবার নায়ক হয়ে ওঠেন, তেমনই লেবাননের ফুটবলার খলিল বদের পেনাল্টি শুট আউটের শেষ শটটি ক্রসবারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে খলনায়ক বনে যান।
ভারতের এই কঠিন লড়াইয়ের পরে অর্জিত জয়ের পরে সারা স্টেডিয়াম ‘বন্দেমাতরম’-এর সুরে গমগম করে ওঠে। মঙ্গলবার সাফ ফাইনালে ভারতের সামনে কুয়েত। সে দিনও ম্যাচের পর স্টেডিয়ামের চেহারা এ রকমই থাকবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
শনিবার হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় দুই দলের মধ্যে, যারা গত ১৬ দিনের মধ্যে এই নিয়ে তিনবার মুখোমুখি হল। গত দু’বারের মুখোমুখিতে একবার গোলশূন্য, একবার ভারত জেতার পরে তৃতীয় ম্যাচেও ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময়ের ওপেন প্লে-তে কোনও দলই একে অপরের জালে বল জড়াতে পারেনি। সদ্য ফিফা ক্রমতালিকায় লেবাননকে টপকে সেরা একশোয় ঢুকে পড়া ভারত শেষ পর্যন্ত বাজিমাত করল পেনাল্টি শুট আউটে।
সুনীল ছেত্রী, আনোয়ার আলি, নাওরেম মহেশ সিং ও উদান্ত সিং প্রত্যেকেই গোল পান। কিন্তু লেবাননের অধিনায়ক হাসান মাতুকের প্রথম শটই আটকে দিয়ে ভারতকে শুরুতেই এগিয়ে দেন গুরপ্রীত। এর পরে ওয়ালিদ শোর ও সাদেক সফল হলেও খলিল বদেরের শট বারের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ায় আর পঞ্চম শট নিতেই হয়নি কোনও দলকে। ৪-২-এ ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠে পড়ল ভারত। এই নিয়ে১৪ বারের মধ্যে ১৩ বারই ফাইনালে উঠল ভারত। এর আগে একমাত্র ২০০৩ ছাড়া প্রতিবারেই ফাইনালে উঠেছে তারা। চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আটবার। মঙ্গলবার নবমবার খেতাব জয়ের বিরুদ্ধে কুয়েতের বিরুদ্ধে ফাইনালে নামবে সুনীল ছেত্রীর দল।
এ দিনই বিকেলে প্রথম সেমিফাইনালে বাংলাদেশকে ১-০-য় হারিয়ে ফাইনালে ওঠে কুয়েত। নির্ধারিত ৯০ মিনিট পর্যন্ত গোলশূন্য থাকার পরে অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধের বাড়তি সময়ে আবদুল্লাহ আলবৌশির গোলে ম্যাচ জিতে নেয় কুয়েত। বাংলাদেশ এ দিন সারা ম্যাচে দুর্দান্ত লড়াই করে। বিশেষ করে তাদের গোলকিপার আনিসুর রহমান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেনি।
দলকে ফাইনালে তোলার পর ভারতীয় গোলকিপার গুরপ্রীত বলেন, “গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচুর প্রস্তুতি নিয়েছি আমরা। দলের ছেলেরা প্রচুর খেটেছে। তারই ফল পাচ্ছি আমরা। ১২০ মিনিট ক্লিন শিট রাখার পর পেনাল্টি শুট আউটে গিয়ে একটাও সুযোগ হাতছাড়া না হওয়ার কৃতিত্ব সম্পুর্ণ ভাবে দলের”।
দলনেতা সুনীল ছেত্রী বলেন, “কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। এখন ফাইনাল নিয়ে চিন্তা নয়। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। ওরা মোটেই সহজ প্রতিপক্ষ নয়। আমরা অবশ্য একাধিক সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করেছি। তবে ছেলেরা যে ফোকাস ঠিক রেখে টাইব্রেকারে দুর্দান্ত শট নিয়েছে, এটাই ওদের কৃতিত্ব। এখনই ফাইনাল নিয়ে ভাবছি না। আমরা হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে ফের তরতাজা হব, তার পরে নিজেদের ভুলভ্রান্তি শুধরে ফাইনালের প্রস্তুতি নেব”। এ দিন সুনীল একাই একাধিক গোলের সুযোগ হাতছাড়া না করলেও ম্যাচ পেনাল্টি শুট আউট পর্যন্ত যেতই না। এমনকী, ছ’গজের বক্সের সামনে থেকেও বারের ওপর দিয়ে বল উড়িয়ে দেন তিনি।
কার্ড সমস্যার জন্য এ দিন সন্দেশ ঝিঙ্গন খেলতে না পারায় রক্ষণ বিভাগে একাধিক পরিবর্তন করে দল নামায় ভারত। শুভাশিস বোস ও প্রীতম কোটালকে আনা হয় প্রথম এগারোয়। আনোয়ার আলি ও মেহতাব সিং ছিলেন স্টপারের ভূমিকায়। তবে এ দিন নাওরেম মহেশ সিংকে প্রথম এগারোয় রাখা হয়নি। তাঁর জায়গায় সহাল আব্দুল সামাদকে শুরু থেকে খেলায় ভারত। মহেশ নামেন পরে। ৩-৫-২-এ এদিন খেলা শুরু করে ভারত। হয়তো চেনা প্রতিপক্ষকে চমকে দিতেই এই কৌশল।
শুরু থেকেই এ দিন আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিল দুই দলই। প্রথম মিনিটেই নাদের মাতারের শট বারের ওপর দিয়ে চলে যায়। আট মিনিটের মাথায় ডানদিক দিয়ে ভারতের বক্সে ঢুকে গোলে শট নেন জেন ফারান। অভিজ্ঞ গোলকিপার গুরপ্রীত সিং সান্ধু হাঁটু দিয়ে সেভ না করলে তখনই পিছিয়ে পড়তেন সুনীল ছেত্রীরা।
মিনিট দশেক পর থেকে জেগে ওঠেন ভারতের অ্যাটাকাররা। ১১ মিনিটের মাথায় লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতেডান দিক দিয়ে উঠে ফাইনাল থার্ডে পৌঁছে ক্রস দিলেও তা লেবাননের গোলকিপার মেহদি খলিল দখলে নিয়ে নেন। এর পাঁচ মিনিট পরেই সুনীল ডানদিকে জিকসনকে পাস দেন, যিনি কিছুটা এগিয়ে সহালকে গোলের পাস দেন। কিন্তু আলি ধানিনি শেষ মুহূর্তে সহালকে আটকে দিয়ে ভারতের অবধারিত গোল বাঁচান।
প্রীতম কোটাল ভারতকে এগিয়ে দেওয়ার অনবদ্য সুযোগটি নষ্ট করেন ২০ মিনিটের মাথায়। অনিরুদ্ধ থাপার মাপা ক্রসে ঠিকমতো হেড করতে পারলেই গোল পেতেন তিনি। কিন্তু তাঁর হেড সাইড নেটে গিয়ে লাগে। ২৪ মিনিটের মাথায় থাপার ফ্রি কিকে গোলের উদ্দেশ্যে হেড করেন শুভাশিস। এবারও তা গোলের বাইরে চলে যায়। ২৯ মিনিটের মাথায় আনোয়ারের দূরপাল্লার শট সোজা গোলকিপার খলিলের হাতে চলে যায়। এর চার মিনিট পরে ছাঙতের দূরপাল্লার শট লক্ষভ্রষ্ট হয়।
ভারতের সঙ্গে সঙ্গে লেবাননও সমানে গোলের চেষ্টা চালিয়ে যায়। ৩১ মিনিটের মাথায় মাতুকের মাপা ফ্রি কিক গোলে ঢোকার আগে ফিস্ট করে বের করে দেন গুরপ্রীত। এর তিন মিনিট পরে মাতুকের আরও একটি ফ্রি কিক সোজা তালুবন্দী করেন ভারতের গোলকিপার। ৪২ মিনিটের মাথায় ফের মাতুকের দুর্দান্ত কার্লিং ফ্রি কিক গুরপ্রীতঅসাধারণ দক্ষতায় না বাঁচালে বিপদে পড়ত ভারত। দুই দলই এ দিন দ্রুত ওঠা-নামা করায় প্রথমার্ধে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গতি বজায় ছিল। কেউই কাউকে এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে রাজি ছিল না।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর দশ মিনিট একে অপরকে মেপে নেওয়ার পর আক্রমণ শুরু করে দুই পক্ষ। ৫৯ মিনিটের মাথায় ছাঙতের শট যেমন সেভ করেন খলিল, তেমনই তার দু’মিনিটপরেই লেবাননের পরিবর্ত করিম দারউইচের গোলমুখী হেড দুর্দান্ত সেভ করেন গুরপ্রীত।
ভারতের দুই উইং এ দিন সুকৌশলে বন্ধ করে দেয় লেবানন। যার ফলে সহাল ও ছাঙতেরা বল পেলেই তাঁদের ঘিরে ধরেন লাল জার্সিধারীরা। অন্তত একটা দিক যাতে সচল রাখা যায়, সে জন্য ৭৫ মিনিটের মাথায় নাওরেম মহেশ সিংকে নামায় ভারত। তাতেও যে খুব একটা লাভ হয়েছে, তা নয়। ৩-৫-২-এ শুরু করলেও দ্বিতীয়ার্ধের শেষ দিকে ভারত ৪-৪-২-এ চলে যায়।
৮৩ মিনিটের মাথায় মাতুক বাঁ দিক দিয়ে ভারতের বক্সে ঢুকে গোলে শট নিলেও তা বারের ওপর দিয়ে চলে যায়। প্রীতম কোটালকে তুলে নিয়ে নিখিল পূজারিকে নামানো হলেও তিনি ছন্দে আসতে অনেকটা সময় নিয়ে নেন। আক্রমণেবাড়তি গুরুত্ব দিতে গিয়ে ভারতের রক্ষণে প্রায়ই জায়গা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল, যার সুযোগ নিতে শুরু করে লেবানন। তবে তাদের ভুলই তাদের সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
নির্ধারিত সময়ের শেষ পাঁচ মিনিটের মধ্যে পরপর তিনটি কর্নার পায় ভারত। তিনটিই ক্লিয়ার করে দেন লেবাননের ডিফেন্ডাররা।পাঁচ মিনিটের বাড়তি সময়ে আশিক কুরুনিয়ানকে তুলে উদান্ত সিংকে নামানো হলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই, ৯৩ মিনিটে, সুনীল ছেত্রী মাপা দূরপাল্লার শট নেন গোলের উদ্দেশ্যে, যা অসাধারণ দক্ষতায় রুখে দেনগোলকিপার খলিল। কিন্তু জোরালো শট নিতে গিয়ে পায়ে কিছুটা চোট পান সুনীল। এর দু’মিনিট পরেই ডানদিক দিয়ে ওঠা উদান্ত সিংয়ের দুর্দান্ত ক্রসে ছ’গজের বক্সের সামনে থেকে বারের ওপর দিয়ে বল উড়িয়ে দেন ভারত অধিনায়ক। ৯৯ মিনিটের মাথায় বক্সের মধ্যে পরপর দু’টি সুযোগ হাতছাড়া করেন সুনীল ও ছাঙতে।
এই সময় সুনীল একেবারে ওপরে উঠে খেলায় ভারত আরও মরিয়া হয়ে ওঠে। ভারত বারবার প্রতিপক্ষের গোলের সামনে গিয়েও ব্যর্থ হয়। মহেশ, উদান্তরা ডানদিক দিয়ে বারবার আক্রমণ তৈরির চেষ্টা শুরু করেন। বাঁ দিক দিয়ে উঠছিলেন ছাঙতে। ভারতের হাইলাইন অ্যাটাক সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেয়ে যান লেবাননের ডিফেন্ডাররা। এই অর্ধের বাড়তি সময়ের শেষ মিনিটে নাদের মাতার যে দূরপাল্লার শট নেন, তা বারের সামান্য ওপর দিয়ে উড়ে যায়।
প্রথমার্ধে ভারত দাপট দেখালেও দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে লেবানন। প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যে মাতুক ও খালিল বাদের পরপর তিনবার আক্রমণ হানে ভারতের গোল এরিয়ায়, কিন্তু ব্যর্থ হন। ১১২ মিনিটের মাথায় একাই দুই ডিফেন্ডার জেন ও মেল্কিকে বল দখলের লড়াইয়ে হারিয়ে বক্সের মধ্যে অনেকটা ডুকে পড়েন। কিন্তু গোলকিপার এগিয়ে এসে বাধা দেওয়ার পরে আর বল ধরে রাখতে পারেননি। শেষ মিনিটে সুনীলের পাস নিয়ে বাঁ দিক দিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে পড়েন ছাঙতে। কিন্তু গোলকিপারের গায়ে বল মারেন।
অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকেই পেনাল্টি শুট আউটের প্রস্তুতি শুরু করে দেয় লেবানন। ১২০মিনিটের মাথায় তারা তাদের গোলকিপার খলিলকে তুলে পরিবর্ত ও তরতাজা গোলকিপার আলি সাবেহ-কে নামায়। ভারত অবশ্য গুরপ্রীতের ওপরই ভরসা রাখে। কারণ, তিনিই দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ গোলপ্রহরী এবং আরও একবারসেই আস্থার যথাযোগ্য জবাবও দেন তিনি।
ভারতীয় দল: গুরপ্রীত সিং সান্ধু (গোল),শুভাশিস বোস (আকাশ মিশ্র),আনোয়ার আলি, মেহতাব সিং, প্রীতম কোটাল (নিখিল পূজারি), অনিরুদ্ধ থাপা (রোহিত কুমার),সহাল আব্দুল সামাদ (নাওরেম মহেশ সিং), জিকসন সিং, লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে, আশিক কুরুনিয়ান (উদান্ত সিং), সুনীল ছেত্রী।
(লেখা ও ছবি আইএসএল ওয়েবসাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
