সুচরিতা সেন চৌধুরী: লজ্জার ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ লেখা থাকবে বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে। একটা আন্তর্জাতিক ইভেন্টের পরিনতি কী হতে পারে তা এদিন না দেখলে বোঝা যেত না। মেসি আসার আগে পর্যন্তের ভালো মুহূর্ত কীভাবে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল তা কলকাতার কাছে নাইটমেয়ার হয়ে থাকবে। অনিকের গান দিয়ে শুরু হয়ে গেল মেসি বন্দনা। যদিও এই কয়েকঘণ্টার প্রস্তুতি চলছিল গত কয়েকদিন ধরেই। অন্দরের প্রস্তুতি গত কয়েক বছরের। কলকাতা শহরে মেসির এই ১২ ঘণ্টা জুড়ে ছিল সাজ সাজ রব। যুবভারতী ও তার আশপাশের দখল একদিন আগে থেকেই চলে গিয়েছিল পুলিশ আর র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের অধিনে। ঘন ঘন মিটিং আর সবাইকে কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল জোড় কদমে। তার মধ্যেই শনিবার ভোর থেকেই কলকাতার সব রাস্তা গিয়ে মিশেছিল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। যে লাইন কলকাতার সংবাদ মাধ্যম বার বার লিখেছে ডার্বিকে ঘিরে, তবে এখন সে গুড়ে বালি। আর সেই ভারতীয় ফুটবলের হতাশার মধ্যেই মেসির আগমনে যেন সাময়িক হলেও প্রান ফিরে পেল বাংলার ফুটবলপ্রেমীরা। মেসি বন্দনায় গা ভাসাল ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান সমর্থকরা। এমন ভরা গ্যালারি আজকাল ডার্বিতেও দেখা যায় না।
১৩ ডিসেম্বর হিসেবে ঠান্ডাটা কমই। কমলালেবু খেতে খেতে খেলা দেখা এখন ইতিহাস। কারণ কোনও মাঠেই আজকাল আর কিছু নিয়ে ঢোকা যায় না। তাই খালি হাতেই শীতের সকালে মেসিময় হয়ে উঠল কলকাতা শহর। এই সময় কলকাতা অনেকটাই মেতে থাকে ম্যারাথনে। তার মাঝেই যেন একটু ফুটবলকে ছুঁয়ে যাওয়া বা বলা যেতে পারে ভারতীয় ফুটবলকে জাগিয়ে তোলা। কলকাতা, হায়দরাবাদ, মুম্বই, দিল্লি ঘুরে মেসি ফিরবেন তাঁর জায়গায়। তার পরও কিছুদিন রেশ লেগে থাকবে এই দেশের গায়ে। যে দেশটা ফুটবল ভালোবাসে কিন্তু ফুটবল বাঁচাতে জানে না। যে কারণে বার বার প্রশ্ন উঠছে, এর পর কী? মেসির আগমনে কি ভারতীয় ফুটবলের কোনও উন্নতি হবে?
না , তা হবে না। তবে ফুটবলপ্রেমী মানুষ একটু অক্সিজেন পাবে বলেই ধরে নেওয়া হয়েছি কিন্তু হল উল্টোটাই। সকাল ৮.৩০টা থেকেই খুলে গিয়েছিল যুবভারতীর দরজা। আর স্টেডিয়ামের স্ক্রিনে পর পর মেসির গোলের দৃশ্য। তাতেই ফেটে পড়তে দেখা গেল গ্যালারিকে। অনিকের গান শেষে, নাচের অনুষ্ঠান আর অভিনেত্রী শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়ের আগমনে তা অন্যমাত্রা পেল। তার পরই শুরু হয়ে গেল একঝাঁক প্রাক্তনকে নিয়ে মোহনবাগান বনাম ডায়মন্ড হারবার ম্যাচ। একটা সময় তাঁদেরই নিয়েই তো উত্তাল হতো কলকাতার ফুটবল। কে নেই সেই তালিকায় মেহতাব হোসেন, দীপঙ্কর রায়, রহিম নবি। তাঁদের ম্যাচ শুরুও হল কিন্তু শেষ হল না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কী লিখলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়— https://x.com/MamataOfficial/status/1999748228070408420
কিন্তু শেষটা যে মোটেও ভালো হল না। চূড়ান্ত অব্যবস্থার মধ্যে বিরক্ত হয়ে মাত্র ২২ মিনিট মাঠে থেকে বেরিয়ে গেলেন লিওনেল মেসি। আর তার পরই উত্তাল হয়ে উঠল যুবভারতীর প্রায় ৫০ হাজারের গ্যালারি। ন্যুনতম টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ৫ হাজার টাক। আর সর্বোচ্চ লাখের গন্ডি পেরিয়ে গিয়েছিল। আর সেই টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও মেসি দর্শন হল না কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের। তার পর যা হওয়ার তাই হল। বহুদিন পর জন বিস্ফোরণ ঘটল যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে। জলের বোতল ছোড়া দিয়ে শুরু। তার পর হাতের কাছে যা ছিল তাই গ্যালারি থেকে উড়ে এল মাঠের মধ্যে। ভেঙে ফেলা হল একের পর এক চেয়ার। ছিঁড়ে ফেলা হল ব্যানার। এখানেই শেষ নয় ফেন্সিং ভেঙে মাঠে ঢুকে পড়ল শয়ে শয়ে মানুষ। আর হবে নাই বা কেন? মেসির গাড়ি মাঠে ঢোকার শুরু থেকেই সেই গাড়িকে যারা ঘিরে ধরল তারা কারা? এটাই এখন সব থেকে বড় প্রশ্ন। এবং পুরো সময়টাই তারা ঘিরে থাকল মেসি, সুয়ারেজদের। আয়োজক শতদ্রু দত্তেরমাইকে চিৎকার করতে করতে গলা ভেঙে গেল যে ‘‘মাঠ থেকে বেরিয়ে যান, সবাইকে দেখতে দিন।’’ কিন্তু কেউ কানেও তুলল না। সব সময় এই কলকাতায় যা হয় তাই হল, কিছু অযাচিত দাদা ধরা মানুষ মাঠের মধ্যে মেসিকে ঘিরে থাকল।
যুবভারতীর সাধের মাঠেরও ১২টা বেজে গেল সমর্থকদের তান্ডবে। পুলিশ পুরো অসহায়ভাবে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। অনেককেই দেখা গেল আবার নিজের কাজ ছেড়ে সেলফি তুলতে। এ দৃশ্য এই শহরে নতুন নয়। যেখানে পুলিশ গ্যালারির দিকে তাকিয়ে থাকার বদলে মাঠের দিকে তাকিয়ে খেলা দেখে। তাতে যা হয় তাই হল। অতীতে ডার্বির যুবভারতী এমন দৃশ্য একাধিকবার দেখেছে কিন্তু এমন একটা আন্তর্জাতিক ইভেন্টে এই পরিস্থিতি কল্পনাতীত। এর দায় কার?
খেলা খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
