অলস্পোর্ট ডেস্ক: আইএসএল ২০২৩-২৪-এর প্রথম অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে নেমেছিল মোহনবাগান সুপার জায়েন্ট, শনিবার রাতে ম্যাচটি চলাকালীন এ কথা বলে না দিলে বোঝার কোনও উপায়ই ছিল না। যে আত্মবিশ্বাস ও আধিপত্য নিয়ে চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে এ দিন রাজত্ব করে মোহনবাগান এসজি, তাতে একবারও মনে হয়নি এটি তাদের প্রতিপক্ষ চেন্নাইনের ঘরের মাঠ।
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাপুটে ফুটবল খেলে এ দিন দু’বারের আইএসএল চ্যাম্পিয়ন চেন্নাইন এফসি-কে ৩-১-এ হারাল গতবারের কাপ চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান এসজি। চলতি লিগে টানা তৃতীয় জয় পেল তারা। এ দিন ২২ মিনিটের মাথায় দিমিত্রিয়স পেট্রাটস প্রথম গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। প্রথমার্ধের বাড়তি সময়ের তৃতীয় মিনিটে ব্যবধান বাড়ান জেসন কামিংস। দ্বিতীয়ার্ধের দশ মিনিটের মাথায় ফ্রি কিক থেকে গোল করে ব্যবধান কমান রাফায়েল ক্রিভেলারো। কিন্তু পরবর্তী মিনিটেই গোল করে দলের জয় নিশ্চিত করেন মনবীর সিং।
দলের এই তিন গোলেই অ্যাসিস্ট করেন সহাল। এ দিন নিজের সেরা ফর্মে ছিলেন কেরালা থেকে আসা এই তারকা মিডফিল্ডার। টানা ৯০ মিনিট ধরে অসাধারণ খেলেন তিনি। প্রতিপক্ষের গোল এরিয়ায় তিনি রীতিমতো ত্রাস সৃষ্টি করেন। তিন গোলদাতাকে কার্যত গোল সাজিয়ে দেন তিনি।
টানা তৃতীয় জয়ের ফলে ন’পয়েন্ট নিয়ে লিগতালিকার শীর্ষেই রয়ে গেল মোহনবাগান এসজি। কিন্তু টানা তৃতীয় চেন্নাইন এফসি লিগ তালিকার সর্বশেষ স্থানে নেমে গেল। তিন ম্যাচে এই নিয়ে আট গোল খেল তারা। এই দিনই প্রথম লিগে গোলের খাতা খুললেও তাদের গোল-পার্থক্য সবচেয়ে খারাপ (-৭)।
লিগের প্রথম অ্যাওয়ে ম্যাচ হলেও এ দিন তিন ব্যাকেই খেলা শুরু করে মোহনবাগান এসজি। ৩-৪-১-২ ছকে সামনে কামিংস ও পেট্রাটস এবং পিছনে শুভাশিস, হ্যামিল ও আনোয়ারকে দিয়ে শুরু করান কোচ হুয়ান ফেরান্দো। মাঝমাঠে নেতৃত্বে ছিলেন অনিরুদ্ধ থাপা। বুমৌস একটু এগিয়ে ছিলেন। দুই উইংয়ে কোলাসো ও মনবীর এবং মাঝখানে থাপার সঙ্গে সহাল। অন্য দিকে, রহিম আলিকে একেবারে সামনে রেখে যে দল সাজায় চেন্নাইন, তাতে রক্ষণে চার প্রহরী ছিলেন।
শুরু থেকেই এ দিন আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে কলকাতার দল। তবে প্রথম ১৫ মিনিটে কোনও শট গোলের লক্ষ্যে রাখতে পারেনি তারা। তাদের রক্ষণে তিন ফুটবলার থাকায় চেন্নাইনের দুই উইঙ্গার নিমথোই মিতেই ও ফারুখ চৌধুরি সামনে অনেকটা জায়গা ফাঁকা পেয়ে যান এবং একাধিকবার দুই দিক দিয়ে হানা দেওয়ার চেষ্টা করেন। মাঝমাঠ থেকে তাদের সাহায্যের জন্য বারবার উঠে আসেন ক্রিশ্চিয়ান বাত্তোচিও ও কোনর শিল্ডস। কিন্তু প্রতিবারই তাদের আটকে দেন আনোয়ার, হ্যামিলরা।
অন্য দিকে, চেন্নাইনের গোল এরিয়ায় বুমৌস, পেট্রাটস ও কামিংসের ত্রয়ী এ দিন বরাবরের মতোই বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন। দু’দিক দিয়ে কোলাসো ও মনবীর এবং পিছন থেকে সহালও বারবার হানা দিচ্ছিলেন বিপক্ষের বক্সে। বেশ কয়েকবার সুযোগ হাতছাড়া করার পর ২২ মিনিটের মাথায় ছবির মতো সাজানো গোলে দলকে এগিয়ে দেন পেট্রাটস। তবে গোলটির বেশিরভাগ কৃতিত্বই সহালের। বক্সের ডান দিক থেকে তিনি যে মাঝারি উচ্চতার মাপা ক্রসটি করেন পেট্রাটসের উদ্দেশ্যে, তাতেই মাথা ছুঁইয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন অস্ট্রেলীয় তারকা (১-০)।
অ্যাটাকিং থার্ডে এ দিন অসাধারণ খেলেন সহাল। প্রথমার্ধে একবার তিনি গোলের প্রায় সামনে থেকে বারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দেন এবং আর একবার তাঁর গোলমুখী শট গোলকিপার শমীক মিত্রর গায়ে লেগে গোলে ঢোকার ঠিক আগে তা ক্লিয়ার করেন আকাশ সাঙ্গওয়ান। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ফের তিনি বক্সের ডানদিক থেকে মাটি ঘেঁষা ক্রস দেন বক্সের মাঝখানে থাকা পেট্রাটসকে। কিন্তু এ বার লক্ষ্যভ্রষ্ট হন তিনি। সহালকে সামলাতে এ দিন হিমশিম খেয়ে যান চেন্নাইনের ডিফেন্ডাররা। ২০২১-এর জানুয়ারির (কেরালা ব্লাস্টার্স) পর এ দিনই প্রথম টানা ৯০ মিনিট খেলেন সহাল এবং পুরো সময়েই তিনি ছিলেন অনবদ্য।
ম্যাচের শেষে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিয়ে সহাল বলেন, “কোচই আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছেন আক্রমণে এতটা আগ্রাসী হয়ে ওঠার জন্য। মাঝমাঠে নেমে বল নিয়ন্ত্রণে রাখারও চেষ্টা করেছি। স্বাধীন ভাবে খেলার সুযোগ পাচ্ছি এই দলে। সে জন্যই ক্রমশ উন্নতি করতে পারছি। প্রতি ম্যাচে আমাদের দলের প্রত্যেকের আত্মবিশ্বাস বাড়ছে এবং তা ম্যাচেও প্রতিফলিত হচ্ছে। আমি নিজের খেলায় খুশি। নতুন দলের সতীর্থদের সঙ্গে খেলা খুবই উপভোগ করছি আমি”।
শুরুর দিকে চেন্নাইনের খেলায় প্রতি আক্রমণে ওঠার প্রবণতা দেখা গেলেও ক্রমশ খেলার নিয়ন্ত্রণ প্রায় নিজেদের হাতেই নিয়ে চলে আসে সবুজ-মেরুন বাহিনী। প্রথমার্ধে তাদের বল পজেশন ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ! যা আইএসএলের আসরে বিরল। প্রথম ৪৫ মিনিটে মোহনবাগান যেখানে পাঁচটি শট গোলে রাখে, সেখানে চেন্নাইনের মোট দু’টি শটের মধ্যে একটিও লক্ষ্যে ছিল না (নীচে পরিসংখ্যান দেখুন)। অতিথিদের দাপটে তারা যেন হতভম্ব হয়ে যায়।
প্রথমার্ধের বাড়তি সময়ে দলের দ্বিতীয় গোলটিও কামিংসকে কার্যত সাজিয়ে দেন সহাল। এ বার বাঁ দিক দিয়ে উঠে প্রতিপক্ষের একাধিক ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে কামিংসের কাছে যে গোলের পাস বাড়ান সহাল, তা থেকে গোল না করতে পারাই কঠিন। হাল্কা টোকায় গোলে বলল ঠেলে দেন অজি বিশ্বকাপার (২-০)। এই গোলের আগে পর্যন্ত তাঁকে বেশ বিবর্ণই লাগছিল। কিন্তু তাঁকে ছন্দে ফেরান সেই সহালই।
তাঁর দল কোণঠাসা হয়ে পড়ায় বিরতির পরই অভিজ্ঞ অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার রাফায়েল ক্রিভেলারোকে মাঠে নামান চেন্নাইনের কোচ আওয়েন কোইল। রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে জীতেশ্বর সিং এবং অঙ্কিত মুখার্জিও নামেন তাঁর সঙ্গে। ক্রিভেলারো আসায় দলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণে কিছুটা উন্নতি আসে। কিন্তু সবুজ-মেরুন রক্ষণ ছিল খুবই সজাগ। তা সত্ত্বেও রহিম আলি দু’বার গোলের সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করেন।
কিন্তু ৫৪ মিনিটের মাথায় মোহনবাগান বক্সের সামনে যে ফ্রি কিক পায় চেন্নাইন, তা থেকে সোজা জালে জড়াতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি ক্রিভেলারো। তাঁর ফ্রি কিক ওয়ালে দাঁড়ানো শুভাশিসের গায়ে লেগে গতিপথ পরিবর্তন করে গোলের বাঁদিকের ওপরের কোণ দিয়ে ঢুকে যায় (২-১)। গোলকিপার বিশাল কয়েথ ঝাঁপিয়ে পড়েও তার নাগাল পাননি।
ক্রিভেলারো ব্যবধান কমানোর পরের মিনিটেই ফের ব্যবধান বাড়িয়ে নেয় মোহনবাগান। এ বারও গোলের অর্ধেক কৃতিত্ব সেই সহালের। এ বারও তাঁর মাপা পাস থেকে গোলে বল ঢোকাতে একটুও অসুবিধা হয়নি মনবীরের। চেন্নাইনের বক্সের সামনে একাধিক ডিফেন্ডারকে ডজ ও ড্রিবল করে বক্সের ডানদিকে থাকা মনবীরকে যখন কোণাকুনি পাস বাড়ান সহাল, তখন পুরো অরক্ষিত ছিলেন মনবীর। প্রথম পোস্টের ভিতর দিয়েই জালে বল জড়ান মনবীর (৩-১)। গোলকিপার শমীক এগিয়ে এসেও তাঁকে আটকাতে পারেননি।
শুরুর মিনিট দশেক চেন্নাইন কিছুটা নিয়ন্ত্রণ পেলেও আবার তা ফিরে আসে মোহনবাগানের কাছে। ৬২ মিনিটের মাথায় একসঙ্গে তিন পরিবর্ত খেলোয়াড় নামায় মোহনবাগান। ডিফেন্ডার হেক্টর ইউস্তে ও স্ট্রাইকার আরমান্দো সাদিকু নামেন যথাক্রমে বুমৌস ও কামিংসের জায়গায়। এর পর থেকেই চার ব্যাকে খেলা শুরু করে মোহনবাগান।
তবে সবুজ-মেরুন বাহিনীর আক্রমণের তীব্রতা এতটুকুও কমেনি। ৬৯ মিনিটে সহালের দুরন্ত থ্রু থেকে বল পেয়ে সাদিকুর উদ্দেশ্যে লো ক্রস দেন মনবীর। কিন্তু তার নাগাল পাননি সাদিকু। এর পাঁচ মিনিট পরে পেট্রাটস ও সাদিকু নিজেদের মধ্যে বল আদান-প্রদান করে গোলের সুযোগ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত জীতেশ্বর তা ব্লক করে দেন। ৭৬ মিনিটে কর্নার থেকে মনবীরের ফ্লিক গোলে না ঢুকে তার সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শমীকের হাতে লেগে তা বিপদমুক্ত হয়।
ম্যাচের শেষ দিকে কোলাসো ও শুভাশিসও মাঠ ছাড়েন। তাদের জায়গায় নামেন দীপক টাঙরি ও আশিস রাই। ততক্ষণে অবশ্য ম্যাচ তাদের পকেটে চলে আসে।
মোহনবাগান এসজি দল: বিশাল কয়েথ (গোল), শুভাশিস বোস (আশিস রাই), ব্রেন্ডান হ্যামিল, আনোয়ার আলি (গ্ল্যান মার্টিন্স), অনিরুদ্ধ থাপা, লিস্টন কোলাসো (দীপক টাঙরি), মনবীর সিং, হুগো বুমৌস (হেক্টর ইউস্তে), সহাল আব্দুল সামাদ, জেসন কামিংস (আরমান্দো সাদিকু), দিমিত্রিয়স পেট্রাটস।
