Cart Total Items (0)

Cart

All Sports

অলস্পোর্ট ডেস্ক: সেই দুই দল, কেরালা ব্লাস্টার্স ও মোহনবাগানের দ্বৈরথ। ফের সাত গোলের ফোয়ারা দেখল কোচির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে, যেমন দেখেছিল গত আইএসএল মরশুমে। সে বার ৫-২-এ ম্যাচ জিতে কলকাতায় ফিরেছিল সবুজ-মেরুন ব্রিগেড, এ বারও জয়ের হাসি মুখে নিয়েই মাঠ ছাড়ল তারা। স্কোরলাইনটা অবশ্য একটু বদলে গেল। বুধবার ৪-৩-এ জিতে লিগ টেবলের দুই নম্বরে রয়ে গেল তারা। গোল পার্থক্যের বিচারে মুম্বই সিটি এফসি-ই এক নম্বরে থাকল।

তিন দিন আগেই ডার্বি খেলার ক্লান্তি নিয়ে এ দিন মুখর জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে নেমেছিল সবুজ-মেরুন বাহিনী। আইএসএলে এই স্টেডিয়ামের মাঠে নামা মানে যে শুধু কেরালা ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে নামা, তা নয়, তাদের অত্যুৎসাহী সমর্থকদের বিরুদ্ধেও নামা। তার ওপর ৭৭ শতাংশ আর্দ্রতা। কোনও কিছুই এদিন তাদের অনুকুলে ছিল না। কিন্তু ম্যাচের আগের দিন যে কথা বলেছিলেন তাদের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস, সেই কথাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন তাঁর দলের সৈনিকরা। প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের শব্দব্রহ্ম থেকেই নিজেদের উজ্জীবিত করে তুললেন তাঁরা।

ম্যাচের শুরুতে চতুর্থ মিনিটেই গোল করে দলকে এগিয়ে দেন আলবানিয়ার ফরোয়ার্ড আরমান্দো সাদিকু। সেই গোলেই এগিয়ে থেকে বিরতিতে যান তাঁরা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে যা হল, তাকে সাইক্লোন বললেও বোধহয় কম বলা হবে। ওঠে গোলের ঝড়। বিরতির পর ১৪ মিনিটের মধ্যে পরপর চারটি গোলে ম্যাচের ছবিটা পুরো বদলে যায়।

উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা স্টেডিয়ামে প্রথমে ৫৪ মিনিটে মোহননের গোলে সমতা আনে ব্লাস্টার্স। ৬০ মিনিটে দ্বিতীয় গোল করে ফের ব্যবধান তৈরি করেন সাদিকু। ৬৩ মিনিটে ফের সমতা আনেন ব্লাস্টার্সের গ্রিক ফরোয়ার্ড দিমিত্রিয়স দিয়ামান্তাকস। তার পাঁচ মিনিট পরেই কর্নার থেকে হেডের গোলে মোহনবাগানকে ফের এগিয়ে দেন দীপক টাঙরি। ম্যাচের শেষে স্টপেজ টাইমের শেষ মুহূর্তে ফের গোল করে ব্যবধান বাড়ান বাগান বেঞ্চ থেকে নামা জেসন কামিংস। তারও পরে শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান কমান দিয়ামান্তাকস।

এই জয়ের ফলে ১৮ ম্যাচে ৩৯ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবলে দু’নম্বরে থেকে গেল মোহনবাগান এসজি। গোল পার্থক্যে এগিয়ে থাকার সুবাদে একটি বেশি ম্যাচ খেলে সমান পয়েন্ট নিয়ে এক নম্বরে মুম্বই সিটি এফসি।

এ দিন দীপক টাঙরি, আশিস রাই ও আরমান্দো সাদিকু প্রখম এগারোয় ফিরে আসেন এবং অভিষেক সূর্যবংশী, লিস্টন কোলাসো ও জেসন কামিংসকে রাখা হয় বেঞ্চে। অন্যদিকে দুই বঙ্গতারকা প্রীতম কোটাল ও প্রবীর দাসকে প্রথম এগারোয় ফিরিয়ে আনে ব্লাস্টার্স। প্রবীর যুবভারতীতে শেষ ম্যাচ খেলেছিলেন এই মোহনবাগানেরই বিরুদ্ধে। অর্থাৎ, এর আগের পাঁচটি ম্যাচে মাঠে নামেননি তিনি।

গ্যালারির তুমুল চিৎকারের মধ্যেই শুরু থেকে গিয়ার তুলে দেয় মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট এবং প্রথম মিনিটেই প্রতিপক্ষের গোলকিপার করণজিৎ সিংয়ের পরীক্ষা নেন সাদিকু। বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর গোলমুখী শট আটকান করণজিৎ। সেই আক্রমণেই যে অশনি সঙ্কেত পেয়েছিল ব্লাস্টার্সের রক্ষণ, তাতে সম্ভবত খুব একটা আমল দেয়নি তারা। তাই চতুর্থ মিনিটেই ফের আক্রমণে উঠে সফল হন আলবানিয়ান স্ট্রাইকার।

মাঝমাঠ থেকে আনোয়ার আলির বাড়ানো বল নিয়ে মাঝখান দিয়ে আক্রমণে ওঠেন সাদিকু। প্রথমে প্রীতম কোটাল ও পরে মিলোস দ্রিনচিচকে ধোঁকা দিয়ে বক্সে ঢুকে গোলকিপারের ডানদিক দিয়ে ডান পায়ের শটে বল গোলে পাঠিয়ে দেন তিনি (১-০)। গোটা স্টেডিয়াম যখন ব্লাস্টার্সের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছিল, সেই সময় এই গোল তাদের কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামিয়ে দেয়।

ঘরের মাঠে ম্যাচের বয়স পাঁচ মিনিট হওয়ার আগেই গোল খেয়ে যাওয়ায় রীতিমতো ফুঁসে ওঠে ব্লাস্টার্সের খেলোয়াড়রা এবং সেই আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য মোহনবাগান রক্ষণ নিজেদের এলাকায় কার্যত দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে দেয়। ওই সময়ে দুই উইং দিয়ে টানা আক্রমণ তৈরি করে যান সন্দীপ সিং, প্রবীর দাস, কেপি রাহুল, ফেডর সেনরিচরা। আশিস রাই, আনোয়ার আলি, হেক্টর ইউস্তে, শুভাশিস বোসরা নাগাড়ে তাদের আটকে রাখার কাজটা করে যান দারুন ভাবে। বিশালও ছিলেন সেরা ফর্ম, যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী।

১৪ মিনিটের মাথায় ব্লাস্টার্সের জাপানি ফরোয়ার্ড দাইসুকে সাকাইয়ের শট দুর্দান্ত সেভ করেন বিশাল কয়েথ। এর পরেই ভিবিন মোহননের ক্রস থেকে দিমিত্রিয়স দিয়ামান্তাকসের গোলমুখী হেড ফের আটকে দেন বিশাল। ড্রিঙ্কস বিরতির পর প্রতিপক্ষের গোল এরিয়ায় সে ভাবে প্রবেশ করার সুযোগ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন হলুদ জার্সিধারীরা।

প্রথমার্ধে দুই দলই দুটি করে শট গোলে রাখে। এবং তাদের একটি করে শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কিন্তু মোহনবাগান উইঙ্গাররা যেখানে সারা অর্ধে মাত্র দুটি ক্রস দেন, সেখানে ব্লাস্টার্সের ক্রসের সংখ্যা ছিল ১৫। তিনটি কর্নারও পায় ব্লাস্টার্স। কিন্তু কোনও কর্নার আদায় করতে পারেনি মোহনবাগান। সারা অর্ধে ব্লাস্টার্সের বক্সে মাত্র দুবার বলে টাচ করতে পারে তারা।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে রক্ষণের খোলস ছেড়ে আক্রমণে ওঠা শুরু করে মোহনবাগান এসজি। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই একবার সাদিকুর আক্রমণ অফসাইড দিয়ে বাতিল করে দেন রেফারি এবং বক্সের বাইরে থেকে জনি কাউকোর দূরপাল্লার জোরালো শট আটকে দেন করণজিৎ।

কিন্তু ৫৫ মিনিটের মাথায় প্রথম ইতিবাচক কাউন্টার অ্যটাকেই গোল শোধ করে দেয় ব্লাস্টার্স। বক্সের বাইরে গোটা চারেক পাসের পর বক্সের মাথা থেকে মাঝারি শক্তির মাপা টোকায় বল গোলে পাঠিয়ে দেন ২১ বছর বয়সী মিডফিল্ডার ভিবিন মোহনন। মোহনবাগানের চার-পাঁচজন ডিফেন্ডার তাঁকে ঘিরে থাকলেও সামান্য যে জায়গাটুকু সামনে পান, সেখান দিয়েই গোলের দিকে বল ঠেলে দেন ভিবিন (১-১)।

কিন্তু তাদের সমতা আনার স্বস্তি বেশিক্ষণ থাকতে দেয়নি মোহনবাগান। পাঁচ মিনিট পরেই ফের ব্যবধান বাড়িয়ে নেন সেই সাদিকু। অসাধারণ সেটপিস থেকে দ্বিতীয় গোল পান তিনি। সহালকে ফাউল করেন জিকসন সিং। ডান উইং থেকে পেট্রাটসের ফ্রি কিক বক্সে ল্যান্ড করার সময় তা হেড করে বক্সের মাথায় থাকা সাদিকুকে দেন। সাদিকু বুক দিয়ে বল নামিয়ে সোজা গোলে হাফ ভলি মারেন, যা আটকাতে পারেননি করণজিৎ (২-১)।

মোহনবাগানকেও স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি তাদের প্রতিপক্ষ। ৬৩ মিনিটের মাথাতেই ফের সমতা এনে ফেলেন দিয়ামন্তাকস। ফেদরের দেওয়া লম্বা পাসে বল পেয়ে যখন দ্রুত বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি, তখন তাঁকে বাধা দেওয়ার জন্য সেখানে আনোয়ার ছাড়া কেউই ছিলেন না। কিন্তু আনোয়ারের বাধা কাটিয়ে গোলে বল ঠেলে দেন গ্রিক ফরোয়ার্ড (২-২), যা আটকানো সম্ভব ছিল না এগিয়ে আসা বিশালের পক্ষে।

নাটকের এখানেই যবনিকা নেমে আসেনি। লিগশিল্ড জিততে গেলে যে জিততেই হবে সবুজ-মেরুন বাহিনীকে, তা তাদের মরিয়া ভাব দেখেই বোঝা যায়। নাগাড়ে এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে খেলা হতে শুরু করে এবং ৬৮ মিনিটের মাথায় ফের ব্যবধান বাড়িয়ে নেয় কলকাতার দল। এ বার মনবীরের কর্নার থেকে হেড ফ্লিক করে জালে বল জড়িয়ে দেন দীপক টাঙরি (৩-২)। দিয়ামন্তাকস তাঁকে মার্কিংয়ে রাখলেও টাঙরিকে আটকাতে পারেননি তিনিও।

ব্যবধান বাড়িয়ে নিলেও আর আগের মতো ভুল করতে রাজি ছিল না মোহনবাগান। এ বার তারা রক্ষণে গুটিয়ে না থেকে পাল্টা চাপ বজায় রাখে। ৭৪ মিনিটের মাথায় বক্সের মধ্যেই সাদিকুকে গোলের বল সাজিয়ে দেন মনবীর, গোল লাইের সামনে যা ছোঁয়ার আগেই তাঁকে বাধা দেন সন্দীপ সিং। ৭৮ মিনিটে ফের সুযোগ আসে মোহনবাগানের। বক্সের ভিতর থেকে পিছনে পেট্রাটসকে বল ঠেলেন সাদিকু। পেট্রাটসের শট অল্পের জন্য গোলের বাইরে চলে যায়। ৮৬ মিনিটের মাথায় বাঁ দিক দিয়ে উঠে বক্সে ঢুকে পড়েন মনবীর। কিন্তু তাঁকে বাধা দিয়ে তাঁর পা থেকে বল কেড়ে নেন করণজিৎ।

আট মিনিটের বাড়তি সময় দেওয়া হয় ম্যাচের শেষে। এই আট মিনিটে পরপর নাটকীয় মুহূর্ত দেখা যায় কোচির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে। এই সময়ে পেট্রাটসের পরিবর্তে নামেন ডার্বির অন্যতম স্কোরার লিস্টন কোলাসো। তিনি মাঠে নেমেই গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যান।

অভিষেকের কাছ থেকে যখন মাঝমাঠে বল পান কোলাসো, তখন তাঁর সঙ্গে পরিবর্ত ডিফেন্ডার লেসকোভিচ ছাড়া আর কেউই ছিলেন না। তাঁকেও গতিতে পরাস্ত করে এগিয় যান কোলাসো। কিন্তু তাঁর শট আটকে যায় গোলকিপারের শরীরে। সেখান থেকে ছিটকে এসে বাগানের পরিবর্ত ফরোয়ার্ড জেসন কামিংসের পায়ে আসে বল। তখন গোলকিপার আরও এগিয়ে এসেছেন। কামিংসের গোলমুখী শট ব্লক করে দেন সেই লেসকোভিচ।

কামিংস এই সুযোগ হাতছাড়া করলেও ম্যাচের সর্বশেষ মুহূর্তে যে সুযোগ পান তিনি, তা আর হাতছাড়া করেননি অস্ট্রেলীয় ফরোয়ার্ড। বাঁ দিক দিয়ে উঠে বক্সে ঢুকে কোলাসো ডান দিকে ক্রস দেন মনবীরকে। কিন্তু তাঁকে বাধা দেন লেসকোভিচ। দুই ফুটবলারের সঙ্ঘর্ষের ফলে বল ছিটকে আসে বক্সের ডানদিকে কামিংসের কাছে, যা সোজা জালে জড়িয়ে দেন তিনি (৪-২)।

এই গোল তিনি না পেলে যে মোহনবাগানকে এক পয়েন্ট নিয়েই কলকাতা ফিরতে হত, তা পরমুহূর্তেই বোঝা যায়, যখন ব্লাস্টার্সকে তৃতীয় গোল এনে দেন দিয়ামান্তাকস। বুধবারের ফুটবল থ্রিলার তখনও শেষ হয়নি। অপেক্ষা করছিল ব্লাস্টার্সের তৃতীয় গোলের। যা আসে শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগেই। এ বার ডানদিক থেকে পরিবর্ত নাইজেরীয় ফরোয়ার্ড জাস্টিন এমানুয়েলের ক্রেস হেড করে জালে বল জড়িয়ে দেন গ্রিক ফরোয়ার্ড (৪-৩)। আনোয়ার ও আশিস তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করেও পারেননি।

মোহনবাগান এসজি দল (৩-২-৪-১): বিশাল কয়েথ (গোল), আনোয়ার আলি, হেক্টর ইউস্তে, শুভাশিস বোস, দীপক টাঙরি (অনিরুদ্ধ থাপা-৮১), জনি কাউকো, আশিস রাই, সহাল আব্দুল সামাদ (অভিষেক সূর্যবংশী-৬০) দিমিত্রিয়স পেট্রাটস (লিস্টন কোলাসো-৯৩), মনবীর সিং, আরমান্দো সাদিকু (জেসন কামিংস-৮১)।

(লেখা আইএসএল ওয়েব সাইট থেকে)

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *