মুনাল চট্টোপাধ্যায়: গত দু’মরশুম ধরেই মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের কর্ণধার সঞ্জীব গোয়েঙ্কা ও টিম ম্যানেজমেন্টের মুখে বারবার কথাটা উঠে এসেছে। সেটা হল শুধু ঘরোয়া ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে ট্রফি জিতে সন্তুষ্ট থাকতে চান না তাঁরা। লক্ষ্যটা আরও বড়। ঘরের আঙিনা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের বেশি করে মেলে ধরা। সাফল্য পাওয়া। মোহনবাগানকে বিশ্ব ফুটবল দরবারে পরিচিত করা।
গত মরশুমে নিরাপত্তাজনিত কারণে এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টায়ার টু-র একটা ম্যাচ খেলেই টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিল মোহনবাগান এসজি। তাই এবার নতুন উদ্যমে এসিএল টু-তে ভাল কিছু করার লক্ষ্য নিয়ে ঝাঁপিয়েছিল সবুজ মেরুন। কিন্তু যুবভারতীতে ঘরের মাঠে প্রথম ম্যাচে যেভাবে তুর্কমেনিস্তানের দল আহাল এফকের বিরুদ্ধে ০-১ গোলে মুখ থুবড়ে পড়েছে বাগান ব্রিগেড, তাতে টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচে নিজেদের খেলায় আমূল উন্নতি ঘটাতে হবে, নকআউট পর্যায়ে ওঠার আশা জিইয়ে রাখতে হলে। বিশেষ করে বাগানের হেড স্যার হোসে মোলিনাকে নিজের দলগঠন ও কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। আহাল এফকের বিরুদ্ধে খেলা অতি সাদামাটা ফুটবলের জোরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশিদূর এগোন যাবে না।
মোহনবাগান সদস্য-সমর্থকরা প্রতি ম্যাচে দলের জয় চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। তাঁদের স্মৃতিতে অতীত সাফল্য ক্ষণস্থায়ী। আর তাই গত মরশুমে মোলিনা যতই আইএসএল শিল্ড ও কাপ জেতান না কেন, ডুরান্ড কাপের কোয়ার্টাফাইনালে ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলের কাছে হার সমর্থকরা কেউ মেনে নিতে পারেননি। এই হারটা তাঁরা কোনওদিনই হজম করতে পারেন না। তাঁদের ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছে আহালের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণের হারে। ধৈর্য হারিয়ে একদল সমর্থকের মুখে ম্যাচের পর উঠে এসেছে ‘ মোলিনা গো ব্যাক’ ধ্বনি।
বাগান টিম ম্যানেজমেন্ট অবশ্য ডুরান্ড ব্যর্থতায় সমর্থকদের মতো অতটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েননি। দল হারলে তো খারাপ লাগেই। বরং তাঁরা চেয়েছিলেন মোলিনা ও দলের ফুটবলারদের এবার মূল ফোকাস হোক, এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টায়ার টু-র ম্যাচ। বিশেষ করে যখন ভারতের ঘরোয়া ফুটবল নিয়ে ডামাডোলের কারণে আইএসএল বা সুপার কাপ কবে হবে, তা সুনিশ্চিত ভাবে জানা যায়নি। আর সেকারণে এসিএল টু-র প্রস্তুতিতে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, ফিফা উইন্ডোতে টুর্নামেন্ট নয় বলে কাফা নেশনস কাপের ভারতীয় শিবির ও ম্যাচ খেলার জন্য কোনও ফুটবলারকে ছাড়েনি টিম ম্যানেজমেন্ট। এই ভাবনায় বিন্দুমাত্র ভুল ছিল না। কিন্তু এতকিছু করেও নিট ফল শূণ্য। কারণ উদ্দেশ্যটা তো মাঠে মারা গেল, আহালের কাছে প্রথম ম্যাচেই হারায়।
মোহনবাগান টিম ম্যানেজমেন্ট তো সমর্থকদের মতো প্রকাশ্যে ‘ মোলিনা গো ব্যাক ’ বলে চিৎকার করবেন না, বা মুখে কিছু বলবেন না, বা বলছেনও না, কিন্তু তাঁরা যে ভেতরে ভেতরে আহালের কাছে এই হারে অখুশি, এটা বলাই বাহুল্য। ৫০ কোটির ওপর খরচ করে দল তৈরি করে ফিফা ক্রমতালিকায় ১৪০ নম্বরে থাকা দেশ তুর্কমেনিস্তানের দল আহালের কাছে হারলে, তাঁরা যে বিরক্ত হবেন কোচ মোলিনা ও দলের ফুটবলারদের ওপর, এটা ঢাক পিটিয়ে না বললেও বুঝতে অসুবিধা নেই।
সাম্প্রতিক অতীতে সাফল্য দেওয়ার পর, ধারবাহিকতা না দেখাতে পারার কারণে সরতে হয়েছিল কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসকে। তাঁর জায়গা নিয়েছিলেন জুয়ান ফেরান্দো। কিন্তু তিনিও সাময়িক সাফল্য দেওয়ার পর ব্যর্থতার ধাক্কায় জেরবার হয়ে পড়েন। টিম ম্যানেজমেন্ট ফের হাবাসকে ফেরায় ফেরান্দোর জায়গায়। হাবাস সাফল্যের রাস্তায় দলকে ফেরালেন। কিন্তু নানা কারণে গত মরশুম শুরুর আগে তাঁকে কোচের দায়িত্ব রাখা হল না। কোচের দায়িত্বে এলেন একদা মোহনবাগান টিম ম্যানেজমেন্টের ঘণিষ্ঠ ও এটিকে কোচ হিসেবে সাফল্য পাওয়া হোসে মোলিনা। প্রথম মরশুমেই তাঁর হাত ধরে মোহনবাগান পেল চমকপ্রদ সাফল্য। একসঙ্গে আইএসএল শিল্ড ও কাপ জয়। এত প্রত্যাশার পারদটা আকাশ ছুঁয়েছিল। এসিএল টু-তেও মোলিনা শুরু থেকে সাড়াজাগানো পারফরমেন্স উপহার দেবেন, এমন একটা ধারনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রত্যাশার ফানুসটা মাটি ছেড়ে আকাশে ওঠার আগেই চুপসে গেছে আহালের কাছে হারে।
আর তাই এটা সহজেই অনুমানযোগ্য, এসিএল টু-র বাকি ম্যাচে, বিশেষ করে প্রথম পর্যায়ে আর দুই প্রতিপক্ষ ইরানের সেপহান এসসি ও জর্ডনের আল হুসেনের বিরুদ্ধে মোহনবাগান ভাল কিছু করতে না পারলে, মোলিনার ওপর চাপ বাড়বে। আর সেটা সমর্থকদের থেকেও বেশি আসবে টিম ম্যানেজমেন্ট থেকেই। এসিএলের মাঝে সুপার কাপের খেলা পড়বে ফেডারেশন যেমন বলেছে, সেটা ঠিকঠাক থাকলে। সুপার কাপ জিতে সমর্থকদের পুনরায় মন জয় করাটা মোলিনার পক্ষে কঠিন নয়, কিন্তু এসিএল টু-তে বিশ্রি ফলে টিম ম্যানেজমেন্টে মনের চিড়ে ভিজবে না, সুপার কাপে সফল হলেও। অতএব মোলিনাকে নতুন করে ভাবনা চিন্তা করতে হবে, কী করলে এসিএল টু-র বাকি ম্যাচে সাফল্য পাওয়া সম্ভব।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ৬ সপ্তাহ রূদ্ধদ্বার অনুশীলন করে কী লাভ হল? কাফা নেশনস কাপের জন্য ভারতীয় দলে ফুটবলার না ছেড়েই বা কী লাভ হয়েছে? এই সিদ্ধান্তগুলো ভুল ছিল এমন তো বলা যাবে না। এতো বিশ্বের সর্বত্রই হয়ে থাকে। কিন্তু আসল গলদ তো অন্য জায়গায়। একাধিক কারণ নজরে আসছে। এক, ফুটবলারদের মধ্যে আত্মতুষ্টির ভাবটা যাচ্ছে না। তাঁরা আইএসএল শিল্ড ও কাপ জয়ের ঘোর এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। নিজেদের অপরাজেয় ভাবতে শুরু করেছিলেন। এটাই বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারের মুখে ঠেলে দিচ্ছে বারবার। যত তাড়াতাড়ি আত্মতুষ্টির হ্যাংওভার কাটিয়ে বেরুতে পারবেন, তত মঙ্গল।
দু’নম্বর কারণ, দলের সব ফুটবলারের ফিটনেস লেভেল এক নয়। ফলে গত মরশুমের দলটাকে মূলত ধরে রাখলেও, বিভিন্ন কারণে ফিটনেস লেভেল সমান না থাকায় তার প্রভাব পারফরমেন্সে পড়েছে। আহালের বিরুদ্ধে ম্যাচে শেষ ২০ মিনিটের খেলায় মোহনবাগান ফুটবলারদের নড়াচড়া তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। যতই মোলিনা বলুন না কেন, তিন ফুটবলারদের ফিটনসে সন্তুষ্ট। পারফরমেন্সে খুশি। সুযোগ কাজে না লাগাতে পারাতেই হার। তাঁর দলের ফুটবলারদের ম্যাচ প্র্যাকটিসের অভাবটা বেশি করে চোখে পড়েছে। ভুললে চলবে না আহালের দলে কাফা নেশনস কাপে খেলা তুর্কমেনিস্তান সিনিয়র ফুটবলার ও অনূর্ধ্ব ২৩ এশিয়ান কাপ কোয়ালিফায়ারে সদ্য অংশ নেওয়া ফুটবলার ভরতি ছিল।
মোলিনা যদি ফুটবলারদের পারফরমেন্সে খুশি হয়ে থাকেন, তাহলে বলতে হয়, তাঁর ম্যাচের দল গঠন ও কৌশল ছিল ভুল। খানিকটা তো বটেই। আহাল কোচ যখন ধৈর্য ধরে দলের শেপ ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে, গোলের জন্য শেষপর্যন্ত অপেক্ষা করে গেছেন, তখন মোলিনা ম্যাচের শেষদিকে এসে জেতার লক্ষ্যে ঝাঁপাতে গিয়ে নিজেই খেই হারিয়ে ফেলেন। ডিফেন্সিভ স্ক্রীণে যতক্ষণ দীপক টাংরি ছিলেন, ততক্ষণ রক্ষণকে নড়বড়ে লাগেনি। যেই টাংরিকে তুলে অতি আক্রমণাত্মক ছকে চলে গেলেন, তখনই বিপদ ঘটল। রক্ষণে বাঁধন ভেঙে গেল। আক্রমণভাগের সঙ্গে ভারসাম্যটাও মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে। অথচ গত মরশুমে মোলিনা অসংখ্য ম্যাচ জিতেছেন শেষমুহূর্তের গোলে। তাই এই হাঁকপাক করার কী দরকার ছিল গোলের জন্য দলের শেপ ও শৃঙ্খলা নষ্ট করে? এটা যত তাড়াতাড়ি মোলিনা বুঝবেন তত ভাল, নইলে তাঁকেও হাবাস, ফেরান্দোর মতো সাফল্য দিয়েও বিদায় নিতে হবে টিম ম্যানেজমেন্টের কোপে পড়ে।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
