রাউন্ড অফ ১৬-তে নরওয়ের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে ব্রাজিলের ফিফা বিশ্বকাপ অভিযানের হৃদয়বিদারক সমাপ্তির পরপরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর ঘোষণা করেছেন নেইমার। ৩৪ বছর বয়সী এই তারকা ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর বর্ণাঢ্য ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন এবং জানান যে ‘সেলেসাও’দের (ব্রাজিল দল) সঙ্গে তাঁর যাত্রার সমাপ্তি ঘটল।
নিউ জার্সিতে এক আবেগঘন রাতের পর এই ঘোষণাটি আসে; সেখানে নেইমার স্টপেজ টাইমে পেনাল্টি থেকে গোল করলেও আর্লিং হালান্ডের শেষ মুহূর্তের জোড়া গোলে ব্রাজিলকে বিদায় নিতে হয়। হারের পর আবেগাপ্লুত নেইমার স্বীকার করেন যে, শেষ একটি বিশ্বকাপের জন্য ফিরে আসতে তিনি সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর অধ্যায় শেষ হয়েছে—এটি তিনি মেনে নিয়েছেন। নেইমার বলেন, ‘‘আমি অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু এখন সব শেষ।’’
এই পরাজয় এমন একটি টুর্নামেন্টের বেদনাদায়ক সমাপ্তি ঘটাল যা শারীরিক দিক থেকেও নেইমারকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল। চোট নিয়ে বিশ্বকাপে আসায় তিনি ব্রাজিলের শুরুর দিকের ম্যাচগুলো খেলতে পারেননি; তবে ধীরে ধীরে কার্লো আনচেলত্তির পরিকল্পনায় ফিরে আসেন। পুরোপুরি ফিট হয়ে ওঠার পরেও এই ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টারকে মূলত বেঞ্চ থেকেই খেলতে দেখা গিয়েছে—স্কটল্যান্ড ও নরওয়ের বিপক্ষে তিনি বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন।
ব্রাজিলের জার্সিতে তাঁর শেষ গোলটি আসে নরওয়ের বিপক্ষে স্টপেজ টাইমের একেবারে শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে। তবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ায় সেই গোলটি কেবল সান্ত্বনা হিসেবেই থেকে গেল। ২০১০ সালে সিনিয়র দলে অভিষেকের পর ১২৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৮০টি গোল করে ব্রাজিলের পুরুষ দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেই তিনি বিদায় নিচ্ছেন।
চারটি ফিফা বিশ্বকাপ জুড়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের প্রধান মুখ; ফুটবলের সবচেয়ে বড় শিরোপাটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া একটি জাতির প্রত্যাশার ভার তিনি বহন করেছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয় অধরাই থেকে গিয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক মঞ্চে নেইমার অনেক স্মরণীয় মুহূর্তের সাক্ষী রয়েছেন। তিনি ২০১৩ সালে ফিফা কনফেডারেশনস কাপ জিতেছেন এবং এর আগে ২০১২ লন্ডন গেমসে রৌপ্যপদক জয়ের পর ২০১৬ রিও অলিম্পিকে ঘরের মাঠে ব্রাজিলকে নেতৃত্ব দিয়ে স্বর্ণপদক এনে দিয়েছেন।
চোটের কারণে বারবার বড় টুর্নামেন্টে বিঘ্ন ঘটেছে, আর ব্রাজিল যেখানেই খেলেছে, সেখানেই তাঁকে প্রত্যাশার বিশাল চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এতকিছুর মধ্যেও নেইমার জাতীয় দলের কেন্দ্রবিন্দু হয়েই ছিলেন; তিনি উপহার দিয়েছেন এমন সব দুর্দান্ত মুহূর্ত যা দেশের সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের তালিকায় তাঁর অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছে।
চোট কাটিয়ে বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নিতে নেইমারকে কঠোর লড়াই করতে হয়েছিল; ফিটনেস ফিরে পেতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাঠে ফিরেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে দেখতে হল নকআউট পর্বের প্রথম ধাপেই ব্রাজিলের বিদায়। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর নেইমার কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, আর তারপরই আবেগের জোয়ারে ভেসে গেলেন তিনি। কথা হারিয়ে গেল চোখের জলে; সতীর্থরা সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এলেন সেই মানুষটিকে, যিনি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিলের প্রত্যাশার ভার নিজের কাঁধে বয়ে বেড়িয়েছেন।
এই ফলাফল কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের অভিযানেরও সমাপ্তি ঘটাল। আনচেলত্তির বাস্তববাদী কৌশল ‘সেলেসাও’দের নকআউট পর্বে পৌঁছে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নরওয়ে টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় অঘটনটি ঘটিয়ে তাদের বিদায় নিশ্চিত করে। তবে নেইমারের কাছে এই পরাজয়ের তাৎপর্য ছিল আরও গভীর। ব্রাজিল জার্সিতে তাঁর শেষ স্পর্শটি ছিল শান্তভাবে নেওয়া একটি সফল পেনাল্টি। আর তাঁর শেষ উপস্থিতিটি শেষ হল চোখের জলে।
ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে চোট বাধা হয়ে না দাঁড়ালে কী হতে পারত—তা নিয়ে হয়তো প্রশ্ন থেকেই যাবে; তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বিদায় নেওয়ার সময় নেইমার নিজের নামের পাশে যুক্ত করেছেন ব্রাজিলের হয়ে গোল করার নতুন সব রেকর্ড এবং অনুপ্রাণিত করেছেন এক প্রজন্মের ফুটবলারকে।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
