অলস্পোর্ট ডেস্ক: ভারতীয় জুনিয়র পুরুষ হকি দলের সঙ্গে নিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা জানানোর পর, পিআর শ্রীজেশ প্রকাশ্যে ‘হকি ইন্ডিয়া’-র বিদেশি কোচের ওপর অব্যাহত নির্ভরতার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গত ১৩ মে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত এক কড়া বিবৃতিতে এই ভারতীয় হকি কিংবদন্তি দাবি করেন যে, ধারাবাহিকভাবে সাফল্য এনে দেওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে; পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন যে, ফেডারেশন জুনিয়র দলের জন্য একজন বিদেশি কোচ নিয়োগকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।
খেলোয়াড়ি জীবন থেকে অবসরের পর যাঁকে ভারতীয় হকি কোচিংয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনাময় মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছিল, সেই শ্রীজেশ মাত্র দেড় বছরের দায়িত্ব পালন শেষে যেভাবে তাঁর মেয়াদ শেষ হল, তা নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। ‘‘মনে হচ্ছে মাত্র দেড় বছরের মাথায় আমার কোচিং ক্যারিয়ারের ইতি ঘটল। এই সময়ের মধ্যে আমরা পাঁচটি টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলাম এবং প্রতিটিতেই পদক জয়ের কৃতিত্ব দেখিয়েছি—যার মধ্যে জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে জেতা একটি ব্রোঞ্জ পদকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে,’’ শ্রীজেশ লিখেছেন।
ভারতের এই প্রাক্তন গোলরক্ষক এরপর এক বিস্ফোরক দাবি করেন। তিনি বলেন, মূলত একজন বিদেশি কোচের জন্য জায়গা করে দিতেই তাঁকে কার্যত সরিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তিনি আগে কখনও হননি। ‘‘আমি শুনেছি, বাজে পারফরম্যান্সের কারণে কোচদের বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু এই প্রথম আমি এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম, যেখানে একজন বিদেশি কোচের জন্য জায়গা করে দিতে আমাকে সরিয়ে দেওয়া হলো,’’ তিনি যোগ করেন।
শ্রীজেশ আরও দাবি করেন যে, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যের কারণটি বর্তমান সিনিয়র পুরুষ হকি দলের কোচিং কাঠামোর পছন্দের সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘‘হকি ইন্ডিয়ার সভাপতি আমাকে জানিয়েছেন যে, সিনিয়র পুরুষ দলের প্রধান কোচ জুনিয়র দলের জন্যও একজন বিদেশি প্রধান কোচ নিয়োগের পক্ষপাতী। তাঁর বিশ্বাস, এর মাধ্যমে জুনিয়র স্তর থেকে শুরু করে সিনিয়র স্তর পর্যন্ত—পুরো ভারতীয় হকি ব্যবস্থারই সামগ্রিক বিকাশ ঘটবে,’’ শ্রীজেশ বলেন।
শ্রীজেশের এই বিবৃতিটি দ্রুতই ভারতীয় হকি মহলে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে এই কারণে যে, শ্রীজেশ কেবল ভারতের অন্যতম সফল ও কৃতী হকি খেলোয়াড়ই নন, বরং অনেকেরই বিশ্বাস ছিল যে ভবিষ্যতে তিনিই হয়ে উঠবেন ভারতীয় হকি কোচিংয়ের অন্যতম প্রধান মুখ। জুনিয়র দলের সঙ্গে নিজের সংক্ষিপ্ত মেয়াদে শ্রীজেশ ভারতকে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিয়েছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে পুরুষদের জুনিয়র এশিয়া কাপে সোনা, সুলতান অফ জোহর কাপে ব্রোঞ্জ পদক এবং এফআইএইচ জুনিয়র হকি বিশ্বকাপে আরেকটি ব্রোঞ্জ পদক জয়।
তিনি প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন—দেশের নিজস্ব কাঠামোর মধ্যেই এতজন কৃতী প্রাক্তন খেলোয়াড় থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় হকি কেন বিদেশি কোচদের ওপর এতটা নির্ভরশীল হয়ে আছে? ‘‘ভারতীয় কোচরা কি ভারতীয় হকিকে গড়ে তুলতে পারেন না?’’ নিজের বিবৃতিতে সরাসরি এই প্রশ্ন রাখেন শ্রীজেশ।
শ্রীজেশ আরও জানান যে, এই বছরের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী মনসুখ মান্ডভিয়া ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে উৎসাহিত করেছিলেন কোচিংয়ের ক্ষেত্রে আরও বড় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার জন্য—বিশেষ করে যখন ভারত ২০৩৬ সালের অলিম্পিকের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ‘‘০৭-০৩-২০২৬ তারিখে, মাননীয় ক্রীড়ামন্ত্রী শ্রী মনসুখ মান্ডভিয়ার সঙ্গে এক বৈঠকে আমাকে বলা হয়েছিল, ‘শ্রীজেশ, ২০৩৬ সালের প্রস্তুতির এই সময়ে আমাদের দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তোমার মতো কোচদেরই এগিয়ে আসা প্রয়োজন,’’’ তিনি লিখেছেন।
‘‘অথচ, হকি ইন্ডিয়া তাদের চারটি দলের ক্ষেত্রেই ভারতীয় কোচদের চেয়ে বিদেশি কোচদের ওপরই বেশি আস্থা রেখে চলেছে,’’ শ্রীজেশ যোগ করেন।
এই মন্তব্যগুলো এখন ভারতীয় হকির অন্দরে একটি পুরনো বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে—বিতর্কটি হল, বিদেশি কোচ নিয়োগের তুলনায় ভারতীয় হকির প্রাক্তন কিংবদন্তিদের কোচিংয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট আস্থা ও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না। যে সমস্যা এখানে আগেও ছিল। ভারতীয় জুনিয়র পুরুষ হকি দলের প্রধান কোচ হিসেবে মাত্র দেড় বছরের মেয়াদে, শ্রীজেশ দলকে তাদের খেলা পাঁচটি টুর্নামেন্টের প্রতিটিতেই পদক জিততে সহায়তা করার পরও তাঁকে সরিয়ে দেওয়া নতুন করে এই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
শুধুমাত্র পদক জয়ের বাইরেও, ভারতীয় হকির অনেকেই শ্রীজেশের তরুণ খেলোয়াড়দের সঙ্গে মিশে যাওয়ার এবং তাদের অনুপ্রাণিত করার দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন—বিশেষ করে এই কারণে যে, তিনি নিজেও খুব সম্প্রতি আন্তর্জাতিক হকির সর্বোচ্চ স্তরে খেলে এসেছেন। ভারতীয় হকি ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলরক্ষক হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত শ্রীজেশ, গত এক দশকে ভারতের হকির পুনরুত্থানের পেছনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন—যার মধ্যে রয়েছে একাধিক অলিম্পিক পদকজয়ী অভিযান এবং বেশ কিছু স্মরণীয় আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স।
খেলোয়াড়ি জীবন থেকে অবসরের পর, কোচিং জগতে তাঁর পদার্পণকে ভারতীয় হকির ভবিষ্যৎ কাঠামোর জন্য এক বিশাল ইতিবাচক সংযোজন হিসেবেই গণ্য করা হচ্ছিল। তার পরই ছন্দপতন।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
