Cart Total Items (0)

Cart

All Sports
প্রণতি নায়েক

সুচরিতা সেন চৌধুরী, ভুবনেশ্বর: সময় বদলেছে, বদলেছে পরিস্থিতিও। বাংলা ছেড়ে অনেক অ্যাথলিটই পাড়ি জমিয়েছেন দেশের অন্যান্য রাজ্যে। সেই তালিকায় রয়েছেন বাংলার অন্যতম মহিলা জিমন্যাস্ট প্রণতি নায়েক । ভুবনেশ্বরে কলিঙ্গ সুপার কাপ কভার করতে গিয়ে দেখা হয়ে গেল বাংলার এই মেয়ের সঙ্গে। ভিন রাজ্যে এক সময় বাংলার প্রতিনিধিত্ব করা প্রণতি জমিয়ে অনুশীলন করছেন ইজিপশিয়া‌ন কোচের কাছে। সামনে অলিম্পিক। সেখানে যোগ্যতা অর্জন করা ছাড়া আর কিছুই ভাবছেন না তিনি।

 টোকিও ২০২০-তে দীপা কর্মকারের পরে অলিম্পিকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা দ্বিতীয় মহিলা ভারতীয় জিমন্যাস্ট প্রণতি নায়েক. তার পর থেকে যেন খিদেটা আরও বেড়ে গিয়েছে। ধরে রাখতে হবে অলিম্পিকের ধারা। বলছিলেন, ‘‘ব্যাক-টু-ব্যাক অলিম্পিকে যোগ্যতা অর্জনকারী প্রথম ভারতীয় জিমন্যাস্ট হওয়াটা স্বপ্নের মতো এবং সেই আশাই আমাকে আমার সেরাটা দিতে এগিয়ে দেবে।’’

কলিঙ্গ স্টেডিয়ামের ভিতরে বাস করে একটা আস্ত খেলার বিশ্ব। সেখানেই এই বিপুল আয়োজন। জিমন্যাস্টিক্সের বিশ্বমানের পরিকাঠামো যা ভারতের আর কোথাও নেই। মাস আটেক আগেই বাংলা ছেড়ে পাকাপাকিভাবে ওড়িশায় নিজের বেস নিয়ে গিয়েছে‌ন প্রণতি। দুপুর সাড়ে তিনটে থেকে অনুশীলন শুরু হয় তাঁর, চলে ঘণ্টা দু’য়েক। কখনও কখনও আরও বেশি সময়। যতক্ষণ না ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সেখানে পৌঁছে দেখা গেল অনুশীলনে মগ্ন প্রণতি। বাংলার সাংবাদিক দেখে যেন তাঁরও কিছুটা ভাললাগার প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল। যেন তাঁর বাড়িতেই আমি অতিথি। অনুশীলন করতে করতেই একগাল হেসে বললেন, ‘‘বোসো না, দাঁড়িয়ে আছো কেন?’’

একটা সাক্ষাৎকার চাই। শুনে যেন একটু হতাশ হলেন তিনি।  জানেন এখানে কতটা কড়াকড়ি এই সব বিষয়ে। তবে কোচের সঙ্গে কথা বলে নিজেই পুরো বিষয়টা সামলে নিলেন। অনুমতি মিলল প্রায় দেড়ঘণ্টা পর। ততক্ষণ পুরো জিমন্যা‌স্টিক্স এরিনা জুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে ছোট থেকে বড় জিমন্যাস্টদের কসরত। তার মাঝেই পাখির চোখ প্রণতি। এই পুরো এরিনায় একমাত্র বাঙালি অনুশীলন করে চলেছেন ২০২৪ অলিম্পিকের লক্ষ্যে।

প্রণতি জানেন সহজ হবে না এই রাস্তা। সামনেই রয়েছে ওয়ার্ল্ড কাপ। বলছিলেন, ‘‘১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ মার্চের মধ্যে হতে চলা চার দেশে চারটি বিশ্বকাপ সিরিজ এবং মে মাসে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের মাধ্যমে আমি অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারি।’’ বিশ্বকাপগুলো হবে মিশর, জার্মানি, আজারবাইজান ও কাতারে।

চারটির মধ্যে সেরা তিনটি পারফরম্যান্সের পয়েন্ট বিবেচনা করা হবে এবং লিঙ্গ প্রতি দুই জন সর্বোচ্চ র‍্যাঙ্কিং জিমন্যাস্ট এর মাধ্যমে প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিক কোটা পাবেন, যদি তাঁরা আগেই যোগ্যতা অর্জন না করে থাকে‌ন। যদি তা কার্যকর না হয়, প্রণতি নায়েকের প্যারিস অলিম্পিকের জন্য কোটা পাওয়ার চূড়ান্ত সুযোগ মে মাসে ২০২৪ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে থাকবে, যেখানে সব ইভেন্টে সর্বোচ্চ র‍্যাঙ্কিং অ্যাথলিট জায়গা পাবেন।

ভল্ট ইভেন্টে ২০১৯ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ পদক জিতেই প্রণতি টোকিও অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। দু’বার এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ব্রোঞ্জ পদক জয়ী, যিনি এই মাসের শুরুতে আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিক্স ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৪-এ মহিলাদের ভল্টে সোনা জিতেএন। এটাই প্রমান তিনি নিজের ছন্দেই রয়েছেন। তাঁকে নিয়ে স্বপ্ন দেখাই যায়।

তিনি বলছিলেন, ‘‘আমি ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপ সিরিজে আমার জায়গা সুরক্ষিত করেছি এবং সেখানে ভল্ট ইভেন্টেই ফোকাস করব কারণ এটি আমাকে দু’টি অলিম্পিক কোটার একটি সুরক্ষিত করার প্রথম সুযোগ দেবে। কোটা বিশ্বকাপ সিরিজ বা এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, যার মাধ্যমেই আসুক না কেন, আমি আমার সেরা শট দিতে প্রস্তুত।’’

হ্যাংঝৌ এশিয়ান গেমসের একমাত্র ভারতীয় জিমন্যাস্ট ছিলেন তিনি। শেষ করেছিলেন অষ্টম স্থানে। তাতে স্বপ্নটা ভাঙেনি। নিজেকে আরও ভাল করে প্রস্তুত করার জন্য নিজের ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছেন ভিনরাজ্যে। বলছিলেন, ‘‘গত ছয়-সাত মাস ভাল গিয়েছে। আমি ভুবনেশ্বরের ওড়িশা এএম/এনএস ইন্ডিয়া হাই পারফরম্যান্স সেন্টারে প্রশিক্ষণ নিচ্ছি এবং এখানকার সুযোগ-সুবিধা এবং কোচিং স্টাফ দারুণ।’’ তিনি নিজেই মনে করছেন তাঁর অনেকটাই উন্নতি হয়েছে।

মাত্র ছয় বছর বয়সে জিমন্যাস্টিক্স শুরু করেন প্রণতি, সে সময় খেলাধুলো সম্পর্কে তেমন কোনও জ্ঞ্যান ছিল না। তিনি বলেন, ‘‘সেই সময় আমাদের কাছে এটি ছিল যোগাসন। তবুও, আমি প্রথম থেকেই এটি নিয়ে খুব বেশি উৎসাহী ছিলাম। আমি এতটাই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম যে একটি দিনও অনুশীলন বাদ দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন ছিল। কোনও কোনও দিন তো আমি পুরো দিন জিমে কাটাতাম, এমনকি অনুশীলন না করলেও, সেখানে পড়ে থাকতাম ওর মধ্যে থাকার জন্য।’’

প্রণতির হাতেক্ষরী কলকাতা সাইয়ে কোচ মিনারা বেগমের কাছেই। ছোট একটা মেয়ে গুটি গুটি পায়ে জিমন্যাস্টিক করার চেষ্টা করছে সেই সময়ও দেখেছি। তাঁকে নিয়ে তখন থেকেই স্বপ্ন দেখার কথা বলেছিলেন মিনারা বেগম। তিনি ঠিক ছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি, পরিবেশ অনেক কিছু বদলে দেয়। সব সময় সব কিছু অনুকূলে থাকে না। ঠিক যেভাবে এই গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক আজ অনেক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে। তবে প্রণতি এই সব নিয়ে কথা বলতে চান না, মনে রাখতে চান ভালটাই।

বলছিলেন, ‘‘আমি মিনারা বেগমের অধীনে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ বছর কলকাতায় প্রশিক্ষণ নিয়েছি এবং ২০১৯ সালে তিনি অবসর নেওয়ার পর থেকে আমি রীতিমতো সমস্যায় পড়ে যাই। কখনও একাধিক কোচের অধীনে প্রশিক্ষণের জন্য দিল্লিতে যেতে হয়েছিল এবং তারপরে কখনও কখনও সাই কেন্দ্রে শিবির স্থানান্তর করতে হয়েছিল। বিভিন্ন কোচের অধীনে বিভিন্ন টুর্নামেন্টের জন্য আমার ফিটনেস ট্রেনিংকে মানিয়ে নেওয়া চ্যালেঞ্জিং ছিল এবং এখন আমি মনে করি আমার অধ্যবসায় অবশেষে পুরস্কৃত হয়েছে।’’

তবে প্রণতি নায়েক আজ যেখানে পৌঁছেছে সেটা তাঁর বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল। তিনি বলেন, ‘‘আমার জিমন্যাস্টিক্স শুরু আমার বাবা-মায়ের জন্যই, তারা আমাদের তিন বোনের মধ্যে অন্তত একজনকে জিমন্যাস্টিক্স কেরিয়ার দিতে চেয়েছিলেন।’’

পশ্চিমবঙ্গের মেদিনপুরের একটি ছোট গ্রাম থেকে উঠে আসা একটি মেয়ে যেখানে প্রশিক্ষণের সুবিধা ছিল না। যে কারণে কলকাতায় চলে আসতে হয় তাঁকে। সেই থেকেই মিনারা বেগমের অধীনে প্রশিক্ষণ। কিন্তু তাঁর জিমন্যাস্ট হওয়ার স্বপ্নকে উসকে দেন দীপা কর্মকার। বলছিলেন, ‘‘২০১৪ সালে কমনওয়েলথ গেমসে দীপা কর্মকারের ভল্ট পদক জেতার সাক্ষী ছিলাম। সেই মুহূর্তে উপস্থিত থাকা আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল এবং আমাকে এত বড় পর্যায়ে সাফল্যের লক্ষ্যে উৎসাহিত করেছিল। ফলস্বরূপ, আমি ভল্ট ইভেন্টে আরও ফোকাস করতে শুরু করি।’’ বেশ কয়েকবার প্রদুনোভা করতেও দেখা গেল তাঁকে। এতটাই দীপার প্রভাব রয়েছে তাঁর উপর।

আড্ডা দিতে দিতেই উঠে এল অনেক কথা। সরাসরি সাক্ষাৎকারের অনুমতি মাঝ পথেই বন্ধ করে দেওয়া হল। আমাদের থেকেও বেশি যেন হতাশ হলেন প্রণতি। ভিনরাজ্যে চেনা বাংলার সাংবাদিক পেয়ে যেন বাড়তি মোটিভেশন পেলেন তিনি। আবার আসার আহ্বানও জানালেন। ‘‘তবে, সাক্ষাৎকারের নিশ্চয়তা নেই’’, বিদায় জানিয়ে আবার শুরু করলেন ভল্ট, লক্ষ্য যে এখন অনেক দূর।

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *