অলস্পোর্ট ডেস্ক: লিগ টেবলের শীর্ষে থাকা ওড়িশা এফসি-কে তাদের মাঠে গিয়ে হারাতে পারবে ইস্টবেঙ্গল এফসি? বাস্তব পরিস্থিতি বলছে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু প্রায় কথাটা লিখতে হচ্ছে ফুটবলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনিশ্চয়তার কথা মাথায় রেখে। না হলে কেউ ভাবতে পেরেছিল নর্থইস্ট ইউনাইটেডের কাছে হেরে যাবে এফসি গোয়া?
লিগের প্রথম মুখোমুখিতে এই ওড়িশাকেই তো গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। গত সপ্তাহে মোহনবাগানের বিরুদ্ধেও জিততে পারেনি তারা। আরও স্পষ্ট করে বললে, চলতি লিগে কলকাতার দুই দলকে এখন পর্যন্ত একবারও হারাতে পারেনি শীর্ষে থাকা সের্খিও লোবেরার দল। তাই বৃহস্পতিবার ঘরের মাঠে জয় পাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই ঝাঁপিয়ে পড়বে তারা। সবচেয়ে বড় কথা গত দুই ম্যাচেই জয় পায়নি কলিঙ্গবাহিনী। এই ম্যাচে জয়ে না ফিরলে তাদের এক নম্বর জায়গাটাই নড়বড়ে হয়ে যাবে। ফলে এই ম্যাচে জিততেই হবে রয় কৃষ্ণাদের।
ইস্টবেঙ্গলের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতিটা অনেকটা সে রকমই। এই ম্যাচে জিততে পারলে তারা জামশেদপুরকে টপকে সেরা ছয়ে ঢুকে পড়বে। কারণ, ছ’নম্বরে থাকা জামশেদপুরের সঙ্গে তাদের দূরত্ব মাত্র দু’পয়েন্টের। কলিঙ্গ স্টেডিয়াম থেকে তিন পয়েন্ট তুলে আনতে পারলে সেরা ছয়ের দরজা খুলে ফেলতে পারবেন ক্লেটন সিলভারা। আর যদি গতবারের মতো ম্যাচ ড্র-ও রাখতে পারে তারা, তা হলে ভাল গোলপার্থক্যের সুবাদে নর্থইস্ট-কে টপকে সাত নম্বরে উঠে আসতে পারবে তারা। মোট কথা বৃহস্পতিবার দুই দলেরই জয় চাই। সে জন্যই এই ম্যাচ আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
কঠিন পরীক্ষা
কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের পক্ষে কাজটা মোটেই সোজা হবে না। একেই তাদের পারফরম্যান্স খুব একটা ভাল জায়গায় নেই। তার ওপর এই ম্যাচে তারা পাবে না তাদের জর্ডনের স্টপার হিজাজি মাহেরকেও। সাইড লাইনে থাকবেন না কোচ কার্লস কুয়াদ্রাতও। দু’জনেরই কার্ড সমস্যা।
চোটের জন্য হোসে পার্দো এমনিতেই দলের বাইরে। সারা মরশুমের জন্যই ছিটকে গিয়েছেন পার্দো। তবে ভাল খবর, এই ম্যাচে মাঠে ফিরতে পারেন সল ক্রেসপো। তাই লাল-হলুদ শিবিরে পাঁচজন বিদেশী খেলার মতো অবস্থায় আছেন। সদ্য দলে যোগ দেওয়া মিডফিল্ডার ভিক্টর ভাজকেজ, ফরোয়ার্ড ফেলিসিও ব্রাউন, ক্রেসপো, পার্দোর জায়গায় সদ্য শিবিরে যোগ দেওয়া সার্বিয়ান সেন্টার ব্যাক আলেকজান্দার প্যানটিচ ও স্ট্রাইকার ক্লেটন সিলভা। ক্লেটন ও মাহের ছাড়া তিন নতুন বিদেশীকে পুরোপুরি তৈরি মনে হচ্ছে না। এটাই কার্লস কুয়াদ্রাতের দলের সবচেয়ে বড় সমস্যা। ভারতের মাটিতে পা রাখার চার-পাঁচ দিনের মধ্যেই যদি তাঁদের মাঠে নেমে পড়তে হয়, তা হলে যে সমস্যা হবেই, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই এবং সেটাই ঘটছে ইস্টবেঙ্গল দলে।
জানুয়ারির দলবদলে হাভিয়ে সিভেরিও ও বোরহা হেরেরাকে ছেড়ে দেওয়াটা যে খুব একটা ঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি, তা এখন ভাল মতোই টের পাচ্ছেন কোচ, কর্তারা। যে দুই বিদেশী ভাল খেলছেন, সেই ক্লেটন ও মাহেরের ওপর আবার বেশি নির্ভর হয়ে পড়ছেন তাঁদের সতীর্থরা। দলের মোট ১৭টি গোলের মধ্যে সাতটিই করেছেন ক্লেটন।
দুই উইঙ্গার নাওরেম মহেশ সিং ও নন্দকুমার শেখরও অবশ্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করছেন। নন্দকুমার পাঁচটি গোল করেছেন ও তিনটি অ্যাসিস্ট করেছেন। দলের গোলে অবদানের ক্ষেত্রে তিনি পিছনে ফেলে দিয়েছেন মহেশকে, যিনি দু’টি গোল করেছেন ও দু’টি করিয়েছেন। শুরুর দিকে মহেশ বেশি তৎপর ছিলেন, কিন্তু নন্দকুমার ছিলেন কিছুটা বিবর্ণ। এখন হচ্ছে উল্টোটা। গত দুই ম্যাাচেই গোল পেয়েছেন নন্দকুমার। নর্থইস্টের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেন তিনি। তাদের বিরুদ্ধে ফিরতি ম্যাচেও গোল পান এই তামিল উইঙ্গার।
দুই উইঙ্গার সমান তৎপর ও ফলদায়ক হলে দলের গোলের সংখ্যা বাড়তে পারে। মাঝমাঠে শৌভিক চক্রবর্তী ছাড়া দলের কোনও ভারতীয় ফুটবলারই ধারাবাহিক ভাবে ভাল খেলতে পারছেন না। গোলের সামনে দুই তরুণ ফরোয়ার্ড পিভি বিষ্ণু ও সায়ন ব্যানার্জি কার্যকরী হলেও গোল করার ক্ষেত্রে তারা এখনও পিছিয়ে। প্রতিপক্ষের গোলের সামনে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিদ্যে তাদের এখনও শিখতে হবে কুয়াদ্রাতের কাছে।
ফিরছেন জাহু
দুর্দান্ত ফর্মে আছেন ফিজিয়ান তারকা স্ট্রাইকার রয় কৃষ্ণা। ১৬টি ম্যাচ খেলে ১১টি গোল করেছেন তিনি। লিগের শুরুর দিকে টানা গোল পাওয়া ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড দিয়েগো মরিসিও ছ’টি গোল করেছেন। মরিসিও ক্রমশ কিছুটা ফিকে হয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় রয় কৃষ্ণার রাজত্ব। প্রথম ছ’টি ম্যাচে মাত্র একটি গোল পাওয়ার পরে ফর্মে ফেরেন তিনি এবং ওড়িশার গত দশটি ম্যাচের মধ্যে সাতটিতেই গোল পেয়েছেন মোহনবাগানের এই প্রাক্তনী। ব্লাস্টার্স, জামশেদপুর ও হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে জোড়া গোলও করেন।
মোহনবাগানের বিরুদ্ধে কার্ড সমস্যার জন্য খেলতে পারেননি আহমেদ জাহু। এই ম্যাচে তিনি খেলবেন। যা ইস্টবেঙ্গল শিবিরের পক্ষে মোটেই ভাল নয়। চলতি লিগে ওড়িশা দলের ফুটবলারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাস (১১২৪) খেলেছেন এই বিদেশী মিডফিল্ডারই। প্রতিপক্ষের অর্ধে ৫০০ পাস খেলেছেন, ৫৬টি ক্রস দিয়েছেন। ১৬টি ম্যাচে যে ১২৪টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছে তারা, তার মধ্যে ২৩টি রয় কৃষ্ণার ও ২২টি জাহুর। গত ম্যাচে এই জাহুর না থাকাটা ওডিশার আক্রমণকে বিবর্ণ করে দেয়। এই ম্যাচে কিন্তু অনেক সুযোগ তৈরি করবেন তিনি। সেই সুযোগগুলি কাজে লাগাতে মরিয়া হয়ে উঠবেন রয়, মরিসিওরা।
দুই দলের গত ম্যাচে আহমেদ জাহুকে যে ভাবে কড়া পাহাড়ায় রেখেছিলেন শৌভিক চক্রবর্তী, তাও ছিল প্রশংসার করার মতো। বেশ কয়েকবার শৌভিকের ওপর মেজাজও হারিয়ে ফেলেন জাহু, যা লাল-হলুদ কোচ কুয়াদ্রাতের কৌশল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাঁকে বারবার বিব্রত করে জাহুর মনসংযোগ নষ্ট করাই ছিল শৌভিকের অন্যতম উদ্দেশ্য। জাহুকে সে দিন একটির বেশি শটই নিতে দেয়নি ইস্টবেঙ্গল। ফাইনাল থার্ডে তিনি ১৬ বারের বেশি প্রবেশ করতে পারেননি। ফাইনাল থার্ডে ১৭টির বেশি পাস খেলতে পারেননি তিনি। এই ম্যাচেও কুয়াদ্রাত নিশ্চয়ই শৌভিককে সেই দায়িত্ব দিয়েই নামাবেন। কোন কৌশলে শৌভিকের চোখে ধুলো দিতে পারেন জাহু, সেটি এই ম্যাচের আকর্ষণীয় একটি বিষয়।
রক্ষণেও দুই দলই শক্তিশালী। এ পর্যন্ত যেখানে ১৬ ম্যাচে ১৪ গোল খেয়েছে ওডিশা, সেখানে ইস্টবেঙ্গল ১৬ ম্যাচে ১৬ গোল খেয়েছে। ফলে শেষ ছয় দলের মধ্যে একমাত্র ইতিবাচক গোলপার্থক্য রয়েছে তাদেরই। কলিঙ্গবাহিনী যেখানে আটটি ম্যাচে ক্লিন শিট বজায় রাখতে পেরেছে, সেখানে লাল-হলুদ ব্রিগেডের খাতায় সাতটি ক্লিন শিট রয়েছে। সে দিক থেকে দেখতে গেলে কার্লোস দেলগাদো, অময় রানাওডে, জেরি লালরিনজুয়ালা, নরেন্দর গেহলট, মুর্তাদা ফলদের রক্ষণের চেয়ে লালচুঙনুঙ্গা, মহম্মদ রকিপ, মন্দার রাও দেশাই, নিশু কুমারদের রক্ষণ খুব একটা পিছিয়ে নেই। কিন্তু হিজাজি মাহেরের অভাব তারা কী করে মেটাবে, সেটাই দেখার।
পরিসংখ্যান বলছে
গত চারটি অ্যাওয়ে ম্যাচেই গোল পেয়েছে ইস্টবেঙ্গল এফসি। এর আগে আইএসএলে কখনও এই ধারাবাহিকতা ছিল না লাল-হলুদ বাহিনীর। গত ম্যাচে চেন্নাইনের বিরুদ্ধে জয় পেয়েছে তারা। এই ম্যাচেও জিততে পারলে আইএসএলে এই প্রথম পরপর দুটি ম্যাচে জিতবে তারা। কার্লস কুয়াদ্রাত ও সের্খিও লোবেরার দ্বৈরথে এ পর্যন্ত চারবার জয়ের হাসি হেসেছেন প্রথমজন। অন্য দিকে, কুয়াদ্রাতের দলের বিরুদ্ধে যে ক’টি ম্যাচে দল নামিয়েছেন লোবেরা, প্রতি ম্যাচে গড়ে দু’পয়েন্ট করে এনে দিয়েছেন তিনি। এই সাফল্য আর কোনও কোচের বিরুদ্ধে নেই লোবেরার।
ওডিশা এফসি গত দুই ম্যাচেই ড্র করেছে। মোহনবাগানের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ও এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে ১-১ ড্র করে তারা। অর্থাৎ, এই ম্যাচে তাদের সামনে জয়ে ফেরার সুযোগ। লিগ টেবলে এক নম্বর জায়গাটা ধরে রাখতে গেলে যা জরুরি। ২০১৯-এর নভেম্বরে তারা টানা তিনটি ম্যাচ ড্র করেছিল। বৃহস্পতিবারও ড্র করলে নিজেদের সেই রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলবে কলিঙ্গবাহিনী। চলতি লিগে ২৮টি গোলের মধ্যে ৬৮ শতাংশই ওডিশা করেছে প্রথমার্ধে, যা চলতি লিগে সর্বোচ্চ। আর কোনও দল প্রথমার্ধে এত গোল করতে পারেনি। বিশেষ করে ৩১ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যে তারা এক ডজন গোল করেছে, এটিও সর্বোচ্চ। বৃহস্পতিবার শুরু থেকে খেললে মুর্তাদা ফল হবেন আইএসএলের তৃতীয় বিদেশী, যিনি একশো বা তার বেশি ম্যাচে প্রথম এগারোয় থেকেছেন। আহমেদ জাহু (১২৪) ও তিরির (১১৯) পরেই।
দ্বৈরথের ইতিহাস
আইএসএলে ইস্টবেঙ্গল এফসি ও ওডিশা এফসি-র মধ্যে যে সাতবার দেখা হয়েছে, তার মধ্যে তিনবার ফুটবলপ্রেমীরা দেখেছেন গোলের ফোয়ারা। এই ছ’বারের মুখোমুখিতে মোট ৩৮টি গোল হয়েছে। ইস্টবেঙ্গল ১৬ ও ওডিশা ২২ গোল করেছে। ওডিশা জিতেছে পাঁচবার, ইস্টবেঙ্গল একবার, আর চলতি মরশুমের প্রথম মুখোমুখিতে একমাত্র ড্র হয় গোলশূন্য অবস্থায়। ২০২০-২১ মরশুমে প্রথম মুখোমুখিতে জয় ছাড়া আর কোনও বার সাফল্য পায়নি লাল-হলুদ বাহিনী। সে বার ৩-১-এ জেতে তারা। সে বার দ্বিতীয় লেগে ওডিশা এফসি ৬-৫-এ জেতে। ২০২১-২২ মরশুমের প্রথম ম্যাচেই ওডিশা জেতে ৬-৪-এ। ফিরতি লিগে ওডিশা ফের জেতে ২-১-এ। গত মরশুমের প্রথম মুখোমুখিতে ইস্টবেঙ্গল ঘরের মাঠে দু’গোলে এগিয়ে থেকেও শেষে ২-৪-এ হারে এবং ফিরতি লেগে ৩-১-এ জেতে ওডিশা।
ম্যাচ- ওডিশা এফসি বনাম ইস্টবেঙ্গল এফসি
ভেনু- কলিঙ্গ স্টেডিয়াম, ভুবনেশ্বর
কিক অফ- ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, সন্ধ্যা ৭.৩০
সরাসরি সম্প্রচার ও স্ট্রিমিং
টিভি চ্যানেল: ডিডি বাংলা ও কালার্স বাংলা সিনেমা- বাংলা, স্পোর্টস ১৮ খেল- হিন্দি, স্পোর্টস ১৮ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ, ভিএইচ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ
অ্যাপ: জিও সিনেমা ও ওয়ানফুটবল
(লেখা আইএসএল ওয়েব সাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
