মোহনবাগান ৫(অনিরুদ্ধ, ম্যাকলারেন, লিস্টন-পেনাল্টি, সাহাল, কামিংস) ডায়মন্ড হারবার ১(লুকা)
মুনাল চট্টোপাধ্যায়: কেন মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট বড় দল, আইএসএল শিল্ড ও কাপ চ্যাম্পিয়ন আর ডায়মন্ড হারবার এখনও ছোট দল, সেটা প্রমাণ হযে গেল শনিবার যুবভারতীতে ডুরান্ড কাপে গ্রুপের শেষ ম্যাচে। জয়ের হ্যাটট্রিক করে, ডায়মন্ড হারবারের ওপর আক্রমণের সুনামি বইয়ে দিয়ে ৫-১ গোলে হারিয়ে মোহনবাগান এসজির মোলিনা ব্রিগেড ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ শীর্ষে থেকে হাসতে হাসতে ডুরান্ড কাপের কোয়ার্টারফাইনালে পৌঁছে গেল। উল্টোদিকে, চাপে পড়ে গেল ডায়মন্ড হারবার, ৬ পয়েন্টে গ্রুপের খেলা শেষ করে, ৫ গোল খাওয়ায় গোলপার্থক্যের অঙ্কের কচকচানিতে। এখন বাকি সব গ্রুপের ম্যাচের ফল মিলিয়ে ডায়মন্ডের দ্বিতীয় সেরা হয়ে শেষ আটে যাওয়াটা বেশ কঠিন হয়ে গেল।
মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের কোচ হোসে মোলিনা কেন যে এত সফল, সেটা এদিন বুঝিয়ে দিলেন ডায়মন্ড হারবারের বিরুদ্ধে তাঁর দল নামানো ও কৌশল প্রয়োগে। বাগান বাহিনীতে বিশেষ করে রক্ষণ ভাগে একাধিক চোট আঘাত ও কার্ড সমস্যা থাকলেও, মোলিনাকে ম্যাচের আগে তা নিয়ে বাড়তি ভাবতে দেখা যায়নি। বরং সমস্যা কীভাবে মেটাতে হয়, সেটা দেখালেন। স্টপারে টম আলড্রেডের সঙ্গে দীপক টাংরিকে জুড়ে দিয়ে, দুই সাইডব্যাকে আশিস ও অভিষেককে রেখে, সামনে ডিফেন্সিভ ব্লকারে আপুইয়াকে খেলিয়ে রক্ষণ জমাট করার কাজটা সেরে ফেলেন বাগানের হেডস্যার। দলের বাকি জায়গাগুলো নিয়ে তাঁর বিশেষ কিছু ভাবার ছিল না। একই দল গতবছর ধরে রাখার কারণে। তেলখাওয়া মেশিনের মতো আক্রমণের ঝড় তুলে ডায়মন্ড হারবারকে নাকানি চোবানি খাওয়াতে কোনও সমস্যা হয়নি মোহনবাগানের।
সেখানে আইলিগের মূল পর্বে তোলা ডায়মন্ড হারবার কোচ কিবু ভিকুনা নিশ্চয়ই বুঝলেন, তাঁর দল এখনও আইএসএলের দলের মোকাবিলায় তৈরি নয়। ডুরান্ডের গত ২ ম্যাচে প্রতিপক্ষ সেই মানের না হওয়ায়, ডায়মন্ডের আসল পরীক্ষাটাই হয়নি। বিশেষ করে রক্ষণে বোঝাপড়ার অভাবটা ছিল স্পষ্ট। বিদেশি ডিফেন্ডার কোরটাজার একেবারেই ফিট নন। ডুরান্ডে ডায়মন্ডের অভিযান শেষ কিনা, তার জন্য অন্য গ্রুপের ম্যাচের ফলের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে। কিন্তু সেটা যাই হোক, কিবুকে দল নিয়ে নতুন করে ভাবনা চিন্তা করতে হবে আইলিগ লড়াইয়ে নামার আগে।
১৫ মিনিটে বক্সের ভেতর সামনে শুধুমাত্র ডায়মন্ড গোলকিপার সুস্নাত মালিককে পেয়ে তাঁর পায়ের ফাঁক দিয়ে গোলে বল ঠেলার চেষ্টা করেছিলেন সবুজ মেরুনের গোলগেটার জেমি ম্যাকলারেন। কিন্তু সুস্নাত পা জড়ো করে সেই বল রুখে হাতে ধরে ফেলেন। তবে গোলের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি বাগান ব্রিগেডকে। ডায়মন্ডের রক্ষণে নড়বড়ে ভাবের সুযোগে ১৯ মিনিটে গোল করে সবুজ মেরুনকে এগিয়ে দেন অনিরুদ্ধ থাপা। বক্সের ঠিক বাইরে লিস্টনের থেকে বল পেয়ে সাহাল তা সামনে আলতো করে থাপাকে বাড়ান। থাপা বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে উঁচু শট নিয়ে, তা পোস্টের কোন দিয়ে গোলকিপার সুস্নাতের হাতে নাগাল এড়িয়ে জালের ভেতর পাঠান।
মনে হয়েছিল মোহনবাগান বুঝি এরপর আরও বেশি করে চেপে ধরবে ডায়মন্ডকে। গোল বাড়িয়ে নেবে। হল উল্টোটা। ভুলে গিয়েছিল প্রতিপক্ষ দলে লুকা মাজসেনের মতো একজন অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার আছেন। অফসাইড ট্র্যাপ করতে গিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনল ২৪ মিনিটে। ডায়মন্ডের জবি সামনে থ্রু বাড়ালে অফসাইড ভেবে বাগানের গোটা রক্ষণটাই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে দীপক টাংরি লাইন্সম্যানের দিকে হাত তুলে অফসাইডের দাবি জানাচ্ছিলেন। কিন্তু রেফারি বা লাইনে দাঁড়ানো সহকারী রেফারি তাতে কর্ণপাত করেননি। ফলে পেছন থেকে বল তাড়া করে ধরে ফেলেন ডায়মন্ডের লুকা। সামনে অনেকটা ফাঁকা জমি। বক্সের সামনে বিধা বাধায় পৌঁছে ঠান্ডা মাথায় বাগান গোলকিপার বিশালের পাশ দিয়ে বল গোলে ঠেলে সমতা ফেরান লুকা।
কিন্তু ডায়মন্ড আবার ডুবল নিজেদের রক্ষণের ভুলে। বলা ভাল লালানসাঙ্গার ব্যক্তিগত ভুলের খেসারত দিয়ে দ্বিতীয় গোল হজম করল ৩৫ মিনিটে। ডায়মন্ডের মাঝমাঠে নিজের পায়ে থাকা বল লালানসাঙ্গা লুজ করেন সাহালের তাড়ায়। সাহাল সেই বল ধরে সামনে বাড়িয়ে দিতে দেরি করেননি। শিকারী চিতার মতো ওত পেতেই ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার ক্লাব ফুটবলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ম্যাকলারেন। বল ধরে গোলকিপার সুস্নাতকে হার মানাতে ভুল করেননি ম্যাকলারেন। মরশুমে প্রথমবার মাঠে নেমেই গোল করে বুঝিয়ে দিলেন ম্যাকলারেন ম্যাজিক শুরু।
বিরতির পর মোলিনা পরিকল্পনামতোই ম্যাকলারেনকে তুলে কামিংসকে নামান। তাতে আক্রমণের ঝাঁজ বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং চাপ অক্ষুন্ন রাখার কারণে বক্সের মাঝে বল পেয়ে ঢুকে পড়া লিস্টনকে পেছন থেকে টেনে ধরে ফেলে দেওয়ায় ডায়মন্ডের নরেশ সিংকে লাল কার্ড দেখানোর সঙ্গে পেনাল্টিও দেন রেফারি বাগানের অনুকূলে ৫১ মিনিটে। লিস্টন ৫২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ডুরান্ডে তাঁর ৫ নম্বর গোলটি করে ফেলেন(৩-১)। এই গোলের পর ডায়মন্ড রক্ষণের যাবতীয় আগল খসে পড়ে। ৪০ মিনিটের ওপর ১০ জনে খেলে এই চেগে থাকা মোহনবাগানকে রোখা সম্ভব ছিল না ডায়মন্ডের। তার ফলে ৬৫ মিনিটে সদ্য কলকাতায় পা রাখা কামিংসও বল ধরে প্রতিপক্ষ ফুটবলারদের কাটিয়ে গোলমুখে মাইনাল রাখলে, সাহাল তা গোলে ঠেলেন(৪-১)। ৮০ মিনিটে ডায়মন্ডের কফিনে শেষ পেরেকটা পুঁতে দিলেন কামিংস। আশিস রাইয়ের পাস থেকে গড়ানো শটে গোল করে(৫-১)।
কোয়ার্টারফাইনালে মোহনবাগান এসজির প্রতিপক্ষ কে হবে, সেটা জানে একমাত্র ডুরান্ড কমিটি। ১৭ আগস্ট যুবভারতীতে অনুষ্ঠেয় কোয়ার্টারফাইনালে যদি টুর্নামেন্ট জমিয়ে দিতে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে মোহনবাগানকে ডার্বিতে লড়িয়ে দেয়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ নির্দিষ্ট করে নকআউটের কোনও ফরম্যাট তো বলা নেই।
মোহনবাগান: বিশাল, আশিস(রোশন), টম, টাংরি, অভিষেক সিং, পাসাং(কাস্তানা, সাহাল, আপুইয়া(সূর্যবংশী), অনিরুদ্ধ, লিস্টন(করণ), ম্যাকলারেন(কামিংস)।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
