কলকাতা লিগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ইলিশ মাছ নিয়ে ইস্টবেঙ্গল ফুটবলাররা। —নিজস্ব চিত্র
সুচরিতা সেন চৌধুরী: তখন সবে খেলা শেষের বাঁশি বেজেছে। তার আগে থেকেই উৎসবে মেতেছে ইস্টবেঙ্গল গ্যালারি। ঢাক-ঢোল, আবির আর সুরে সুরে স্লোগানে কানপাতা দায়। আর খেলা শেষে গ্যালারি জুড়ে আতসবাজির রোশনাই। কখনও কখনও বুক কাঁপিয়ে সশব্দে ফাটা শব্দবাজিও নেহাতই কম ছিল না। তার মধ্যেই ফেন্সিং টপকে মাঠের মধ্যে ঢুকতে পড়েছে লাল-হলুদ সমর্থকরা। একটা সময় এমন হল যে প্লেয়ারদের আর আলাদা করে চেনাই যাচ্ছিল না। সবার গায়ে লাল-হলুদ জার্সি, মুখ ভর্তি লাল আবির। সমর্থকদের আবেগের জোয়ারে ভেসে গেল ইস্টবেঙ্গল ফুটবলাররা। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হল যার জন্য শেষ পর্যন্ত মাইক হাতে ঘোষণা করতে হল সমর্থকদের মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। বার বার অনুরোধ ভেসে এল, ‘সবে মাঠটা তৈরি হয়েছে আপনারা দয়া করে মাঠের বাইরে চলে যান। মাঠ খারাপ হয়ে যাবে।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। এই উত্তাল সমর্থকদের সামলানো যে পুলিশের পক্ষেও অসম্ভব। তবে একটা সময়ের পর পুরো ভিড়টা গিয়ে জমল ক্লাব তাঁবুর ভিতরে। সব মিলে অনেকদিন পর আনন্দে, উচ্ছ্বাসে, আবেগে ভেসে গেল কলকাতার এই ক্লাবের সমর্থকরা।
সমর্থকরা মাঠ ছাড়লে প্রায় অন্ধকার মাঠেই সাংবাদিক সম্মেলন সারলেন কোচ বিনো জর্জ। কলকাতার ক্লাবের দায়িত্ব নিয়ে পর পর দুই মরসুম ট্রফি জয়ের কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর দখলে। তাঁর কথাতেই তা স্পষ্ট। দলের সিনিয়র প্লেয়ারদের কলকাতা লিগে খেলার জন্য ছাড়ায় কোচ অস্কার ব্রুজোঁকেও ধন্যবাদ জানাতে ভুললেন না তিনি। বিনো বলেন, “পর পর কলকাতা লিগ জিতে আমি খুশি। সাফল্যের জন্য দলের সিনিয়র ফুটবলারদের খেলার ছাড়পত্র দিয়েছিল অস্কার, তার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ।” পাশাপাশি তিনি দলের গোলকিপার কোচকেও ধন্যবাদ জানাতে ভোলেননি। এদিন ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার গৌরব শ-এর হাতে একাধিকবার আটকে গিয়েছে ইউনাইটেড। তবে এই সাফল্যের জন্য দলের পুরো কলকাতা লিগের পারফর্মেন্সকেই তিনি এগিয়ে রাখছেন।
বিনো বলেন, “শুরুতে আমরা কিছু চোট, আঘাতের সমস্যায় ভুগেছি তবে ছেলেরা দারুণ খেলে নিজেদের সেরা ছয়ে পৌঁছে নিয়ে গিয়েছিল। আর শেষ পর্যন্ত সেই পারফর্মেন্সটা ধরে রাখতে পেরেছি। এই জয় আমি বিশেষভাবে দলের সমর্থকদের উৎসর্গ করতে চাই।”
দলের অন্যতম সফল প্লেয়ার পিভি বিষ্ণু স্বাভাবিকভাবেই খুশি দলের সাফল্যে। বলছিলেন তাঁর কাছে আইএসএল-এর থেকে অনেকবেশি কঠিন কলকাতা লিগ। কারণ জানতে চাইলে প্রাথমিকভাবে কিছুটা অস্বস্তিতেই পড়ে যান। বলেন, “আমি ঠিক জানি না। সেভাবে কারণ বলতে পারব না। তবে আমার উঠে আসা কলকাতা লিগ থেকেই। আইএসএল অনেক হাই প্রোফাইল টুর্নামেন্ট, কলকাতা লিগ তা নয়।” বিষ্ণুর কোনও রকমে বলতে পারা শব্দকে একত্রিত করলে যা দাঁড়ায় তার ফল, আইএসএল-এ তারকার ভিড়ে তারা কতটা নজরে আসেন না বরং কলকাতা লিগে অনেক বেশি ফোকাস থাকে তাদের উপর। তবে ঘরের মাঠে খেলা আর জেলির মাঠে খেলার মধ্যে যে একটা বড় পার্থক্য রয়েছে সেটা মেনে নিলেন। বলেন, “অনেক পার্থক্য। এখানে কত সমর্থক আসে চিয়ার করতে, সেটা ভালো লাগে।”
ইস্টবেঙ্গলের উইনিং গোলের কারিগরি শ্যামল বেসরা তাঁকে ঘিরে এতো সাংবাদিক দেখে রীতিমতো অস্বস্তিতে। সব প্রশ্নের উত্তর এল এক শব্দে। বাবা যখন চাষ করে তখন পাণ্ডুয়ার ছেলে শ্যামল ছোটে ফুটবল মাঠে। রহিম নবির অ্যাকাডেমি থেকে উঠে এসে ট্রায়াল দিয়ে সোজা ইস্টবেঙ্গলের ছেলে হয়ে যাওয়াটা সহজ ছিল না। তাই স্বপ্নটাও এখন বড়। বলছিলেন, “এই গোল আমি বাবা-মাকে উৎসর্গ করতে চাই। আর এখন একটাই লক্ষ্য সিনিয়র দলে জায়গা করে নেওয়া।” শ্যামলকে নিয়ে তাঁর কোচ বিনো জর্জকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এখনই আইএসএল-এ ঢুকে গেলে হারিয়ে যাবে। ওকে স্টেপ বাই স্টেপ এগোতে হবে। আইএসএল-এ খেলার আগে আই লিগ খেলতে হবে। ও খুব লড়াকু তবে ওকে তৈরি হওয়ার সময় দিতে হবে।”
এর পর অন্ধকার মাঠেই আবার ফিরে আসেন ফুটবলাররা। কোচের সঙ্গে চলে ইংলিশ মাছ নিয়ে চলে ফটোসেশন। কেউ একটূ নেচেও নেন। গতবারের ট্রফি এদিনই উঠেছে ক্লাবের হাতে, যা বাড়তি পাওনা তো বটেই।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
