কার্লস কুয়াদ্রাত
অলস্পোর্ট ডেস্ক: সোমবার ঘরের মাঠে যাদের বিরুদ্ধে আইএসএল অভিযান শুরু করছে ইস্টবেঙ্গল এফসি, সেই জামশেদপুর এফসি সম্পর্কে যে খুব বেশি কিছু জানেন না তাঁরা, তা এক প্রকার স্বীকারই করে নিলেন তাদের কোচ কার্লস কুয়াদ্রাত । কিন্তু তা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত নন তিনি। কুয়াদ্রাত মনে করেন, তাঁদের দল যদি নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স দিতে পারে, তা হলে প্রতিপক্ষ সম্পর্কে বেশি কিছু না জানাটা কোনও সমস্যা হয়ে উঠবে না।
রবিবার দুপুরে সাংবাদিক বৈঠকে লাল-হলুদ বাহিনীর কোচ বলেন, “জামশেদপুর সম্পর্কে আমরা বেশি কিছু জানি না। তবে এটা কোনও অজুহাত নয়। আমাদের পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ভাল খেলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। মরশুমের প্রথম ম্যাচ জিততে হবে। এটা কোনও বড় ব্যাপার নয়। আমরা আমাদের মতো খেলব”।
লিগের প্রথম ম্যাচ জেতা যে খুবই জরুরি, তা জানিয়ে কুয়াদ্রাত বলেন, সোমবার তারা জয় দিয়ে শুরু করতে চান শুধু নিজেদের আত্মবিশ্বাসের জন্য নয়, সমর্থকদের জন্যও। বলেন, “প্রথম ম্যাচ জেতা খুবই জরুরি। সমর্থকদের জন্য তো বটেই, আমাদের জন্যও। সমর্থকেরা বরাবর আমাদের পাশে রয়েছেন। তাদের কথা ভেবে আমাদের সাফল্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। দলের মানসিকতা, গতিশীলতা বদলেছে। ঘরের মাঠে ছ’টা ম্যাচ খেলে ফেলেছি আমরা। তাতে সমর্থকেরা আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। এ বার তাদের কিছু ফিরিয়ে দেওয়ার পালা”।
ডুরান্ড কাপ ফাইনালের পরে আইএসএল শুরু পর্যন্ত যে এক মাসেরও বেশি সময় পেয়েছেন তাঁরা, সেই সময়কে ভরপুর কাজে লাগিয়েছেন বলে জানিয়ে দিলেন আইএসএল জয়ী কোচ। জানালেন, ডুরান্ডে খেলা ইস্টবেঙ্গলের চেয়ে এই ইস্টবেঙ্গল এখন আরও অনেক উন্নত। বলেন, “আমরা এক মাস সময় পেয়েছি বিভিন্ন বিষয়ে অনুশীলনের জন্য। যেমন বিভিন্ন সিস্টেম নিয়ে অনেক চর্চা হয়েছে। যখন ডুরান্ড খেলেছিলাম, তখন আমাদের জেতার লক্ষ্যে মাঠে নামতে হত এবং ট্রেনিংয়েও সেই লক্ষ্যই থাকত। কিন্তু গত এক মাসে আমরা বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করেছি। যদিও মাঝখানে মহেশ (সিং), চুঙনুঙ্গা, (প্রভসুখন) গিল, জর্ডন (এলসি)-দের পাইনি। তাতে অসুবিধা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের প্রস্তুতির পর আমি খুশি। একাধিক ফ্রেন্ডলি ম্যাচে আমরা বিভিন্ন কৌশলে খেলার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, দলের ছেলেরা সবাই এগুলো ভালই বুঝতে পেরেছে এবং তার প্রতিফলন মাঠে পড়বে”।
দলের অস্ট্রেলীয় ডিফেন্ডার জর্ডন এলসি চোট পেয়ে ছিটকে গিয়েছেন। আর এক নির্ভরযোগ্য তরুণ ডিফেন্ডার লাল চুঙনুঙ্গা জাতীয় কর্তব্য পালনের জন্য এশিয়ান গেমসে খেলছেন। রক্ষণে এই দুই নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়কে ছাড়াই ইস্টবেঙ্গলকে আইএসএল অভিযান শুরু করতে হলেও এই নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তা করতে রাজি নন কুয়াদ্রাত। বলেন, “এটা ঠিকই যে প্রথম ছ’টা ম্যাচ আমরা এক রকম পরিকল্পনা নিয়ে খেলেছিলাম। কিন্তু এখন তাতে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। কিন্তু ফুটবলে এমন হয়েই থাকে। এটা অজুহাত হতে পারে না। কেউ খেলতে না পারলে তার জায়গায় অন্য ফুটবলারকে তৈরি রাখতে হয় এবং ভাল খেলতেও হয়। তাদের নিয়েই জেতার চেষ্টা করতে হয়। আমাদের জর্ডন, চুঙনুঙ্গার অনুপস্থিতির সমস্যা সামলাতে হবে। জর্ডনের জায়গায় খেলোয়াড় আনার চেষ্টা চলছে। তবে এখন নতুন খেলোয়াড় এনে তাকে দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সোজা হবে না। তবু ক্লাব চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে”।
ডুরান্ডে ইস্টবেঙ্গল ভাল ফল করার পর অনেকেরই প্রশ্ন ছিল কোচ কার্লস কুয়াদ্রাতের জাদুকাঠিতে এমন কী রয়েছে, যার জন্য গোটা দলের চেহারাই পাল্টে গিয়েছে। সে প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিয়েছেন স্প্যানিশ কোচ, “ফুটবলে দলের গতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইস্টবেঙ্গলকে সেরকমই গতিশীল হতে হবে। মরশুমের প্রথম ম্যাচে যখন আমরা একেবারে শেষে দুগোল খেয়ে পয়েন্ট খোয়াই, তখন দলের ছেলেদের বলেছিলাম, দেখো, আমরা এখানে শুধু খেলতে আসিনি, দলের গতিশীলতায় পরিবর্তন আনতেও এসেছি। সেটা করতে হবে আমাদের। গত মরশুমেও এ ভাবে একাধিক জেতা ম্যাচ হাতছাড়া হয়েছে আমাদের। এখনও আমাদের সেই ভুলই হয়ে চলেছে। গতিশীলতায় পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের। আমি খুশি যে, ছেলেরা সেটা বুঝতে পেরে, আমার কথা মতো সেই লক্ষ্যেই নিজেদের শোধরানো শুরু করে। পরের ম্যাচেই আমরা মোহনবাগানকে হারাই। এই মরশুমে মোহনবাগান যে ন’টা ম্যাচ খেলেছে, তার মধ্যে মাত্র একটা ম্যাচে হেরেছে এবং সেটা আমাদের বিরুদ্ধেই। এটা বড় ব্যাপার। ডুরান্ডে আমরা চ্যাম্পিয়নশিপের কাছাকাছি ছিলাম। আমাদের প্রকল্প সুফল দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। এ বার দেখা যাক লিগে কী হয়”।
প্রথম এগারো রাউন্ডের মধ্যে হাফ ডজন ম্যাচ ঘরের মাঠে খেলতে হবে তাদের। এই ছ’টি ম্যাচে তাদের লক্ষ্য কী জিজ্ঞাসা করায় লাল-হলুদ কোচ বলেন, “আমরা প্রথম ম্যাচ থেকেই কঠিন প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে চাই। প্রতিটা পয়েন্ট আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের দলের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত খেলেও দু’পয়েন্ট হারানোয় তাই আমি রেগে গিয়েছিলাম। আইএসএলে প্রতিটি পয়েন্ট গুরুত্বপূর্ণ। যতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারি, ততটাই শক্তিশালী হতে চাই আমরা। চোট-আঘাত হোক, জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় ছাড়তে হোক, আমাদের শক্তি বজায় রাখতে হবে। আর ঘরের মাঠের সুবিধা কাজে লাগাতে হবে। ঘরের মাঠে প্রতিটি ম্যাচ জিততে হবে আমাদের। সব পয়েন্ট পেতে হবে”।
শনিবারই তারকা উইঙ্গার নাওরেম মহেশ সিংয়ের চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৭ পর্যন্ত করার ঘোষণা করেছে ইস্টবেঙ্গল। এই খবরে খুবই খুশি কোচ। বলেন, “মহেশের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর খবরটা খুবই ভাল। ক্লাব যে ভবিষ্যতের কথা ভেবে ভাল কিছু করতে চাইছে, এটা তারই প্রথম পদক্ষেপ। পরের তিন মরশুমে মহেশ আমাদের সঙ্গে থাকছে। এটা ক্লাবের ভবিষ্যতের সাফল্যের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে। আশা করি, সেটাই হবে”।
এ দিন সাংবাদিক বৈঠকে কোচের সঙ্গে ছিলেন অধিনায়ক হরমনজ্যোৎ সিং খাবরা। ৩৫ বছর বয়সী খাবরা ইস্টবেঙ্গলে ফিরছেন সাত বছর পরে। লাল-হলুদ বাহিনীর হয়ে ৭৮টি ম্যাচ খেলেছেন। চারটি গোলও আছে তাঁর। ২০১৬-র জুলাইয়ে ইস্টবেঙ্গল ছেড়ে তিনি চেন্নাইন এফসি-তে যোগ দেন।
সাত বছর বলে যখন লাল-হলুদ শিবিরে ফিরলেন, তখন এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাব এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গত তিন মরশুমে ব্যর্থতার পরে ইস্টবেঙ্গলের সামনে আসা এই ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ নিয়ে খাবরা বলেন, “পেশাদারদের সবসময়ই কড়া চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়। এটা আমি সারা জীবন দিয়ে শিখেছি। বেঙ্গালুরুতে যখন খেলতাম, তখনও অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। কেউ মনে করত না, আমি একজন বল প্লেয়ার। কেরালা ব্লাস্টার্সে খেলার সময় একেবারে নীচ থেকে উঠে এসে আমরা ফাইনালে পৌঁছই। এই চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা সারা জীবনই করেছি। কোচ আমাকে যে বড় দায়িত্ব দিয়েছেন, তা পালন করাটাই আমার কাছে বড় কাজ”।
এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “অনুশীলনে আমরা যা করি, তার একশো শতাংশ যদি ম্যাচে দিতে পারি তা হলে সফল হব। এটা টিম গেম। কোনও একজনের ভাল বা খারাপ খেলায় গোটা দলের কিছু এসে যায় না। পুরো দলকে ভাল খেলে যেতে হবে। এটা নক আউট নয় যে একটা ম্যাচে ভুল করলেই সব শেষ। নিজেদের শোধরানোর সময় ও সুযোগ পাওয়া যাবে। আমাদের একশো শতাংশেরও বেশি দিতে হবে। ইস্টবেঙ্গলকে জেতাতে হবে। সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটাতে হবে”।
সাত বছর পরে কলকাতার দলে ফেরা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ইস্টবেঙ্গলে ফিরতে পেরে আমি খুবই খুশি। আমি সৌভাগ্যবান। কোচের এই প্রকল্পে থাকতে পারাটা আমার কাছে বড় ব্যাপার। ২০১৬-য় যখন ইস্টবেঙ্গলে ছেড়ে যাই, তখন সমর্থকদের মধ্যে যে উন্মাদনা দেখেছিলাম, এখনও একই আছে। গত কয়েক বছরে আমি এর অভাব টের পেয়েছি। এ বার সমর্থকদের জন্য ভাল কিছু করতে চাই”।
(লেখা আইএসএল ওয়েবসাইট)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
