সুচরিতা সেন চৌধুরী, ভুবনেশ্বর: ওড়িশা মানেই খেলা। ওড়িশা মানেই খেলাধুলোর জন্য বিশ্বমানের পরিকাঠামো। যার ফলে ভারতীয় খেলার ক্ষেত্রে প্রায় সব ইভেন্টই এখন বেছে নেয় ওড়িশাকে। সে আন্তর্জাতিক হকি, ফুটবল হোক বা জাতীয় স্তরের খেলা। পরিকাঠামোর দিক দিয়ে এই মুহূর্তে এক নম্বরে রয়েছে ভুবনেশ্বর তথা ওড়িশা। একটা কলিঙ্গ স্টেডিয়ামের মধ্যেই যেন গোটা দেশের খেলাকে এক ছাতার তলায় নিয়ে এসেছে রাজ্য সরকার। শুধু কি পরিকাঠামো? শুধু ফুটবল বা হকি নয় এই একটিই রাজ্য যারা গুরুত্ব দিচ্ছে সব ধরনের খেলাকে, ছেলে-মেযে নির্বিশেষে। তার সব থেকে বড় প্রমাণ এই মরসুমের ইন্ডিয়ান মহিলা লিগ।
এই মরসুমে ওড়িশা থেকে আইডব্লুএল-এ খেলছে দুটো দল। একি ওড়িশা এফসি আর অন্যটি স্পোর্টস ওড়িশা। এছাড়া এই লিগে খেলছে কেরালা থেকে গোকুলাম কেরালা, দিল্লি থেকে হোপস, কর্নাটক থেকে কিক স্টার্ট, তামিলনাড়ু থেকে সেথু এফসি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে একমাত্র দল ইস্টবেঙ্গল। যে রাজ্যকে একসময় ফুটবলের মক্কা বলা হত, সেই রাজ্য থেকে একটার বেশি মহিলা দল তৈরি হয়নি। এক সময় মোহনবাগান, মহমেডানেরও মহিলা দল দাঁপিয়ে খেলত বিভিন্ন লিগে কিন্তু এবার তারা কেউ দল বানায়নি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে একমাত্র ওড়িশা থেকেই দুটো দল খেলছে। আর ওড়িশা এফসি দলের দায়িত্বে এক বাংলার ফুটবলার। যাঁর হাত ধরে নিয়মিত সাফল্য পাচ্ছে ওড়িশার মহিলা ফুটবল।
ওড়িশা এফসির এই মহিলা দল তৈরি হয় ২০২২-এ। শুরুতেই এই দলের হেড কোচ করে নিয়ে আসা হয় এক সময় বাংলা বিভিন্ন দলের হয়ে খেলা ক্রিসপিন ছেত্রীকে। সকাল সকাল কলিঙ্গ স্টেডিয়ামের প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডে গিয়ে দেখা গেল দল নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন হেড কোচ। তার হাত ধরে প্রথম বছরই আইডব্লুএল-এর কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল ওড়িশা এফসি মহিলা দল। বর্তমান দলের একমাত্র বিদেশি মায়ানমারের উইন থেঙ্গি তুন। মায়ানমার জাতয় দলের এই প্লেয়ারের দেশ জার্সিতে অনেক গোল রয়েছে। তবে ক্রিসপিনকে ভরসা দিচ্ছেন বাকি একঝাঁক ভারতীয় মুখ।
চলতি মহিলা লিগের শুরু থেকেই যে এই দল দাপট দেখাচ্ছে তা তাদের ফল দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। এখনও পর্যন্ত তিনটি ম্যাচ খেলে তিনটি জিতেই ন’পয়েন্টে রয়েছে। একটিও গোল হজম না করে লিগ টেবলের শীর্ষে রয়েছে ক্রিসপিনের দল। গত মরসুমের ওড়িশা মহিলা লিগ চ্যাম্পিয়নও এই দল। কিন্তু বাংলার ফুটবল ছেড়ে ওড়িশার ফুটবলে কোচ হিসেবে ভাগ্য পরীক্ষা করে কেন পাড়ি দিলেন দার্জিলিংযের ক্রিসপিন?
প্রশ্নের সহজ জবাব রয়েছে ক্রিসপিন ছেত্রীর কাছে। তিনি বলছিলেন, “আসল কারণ পরিকাঠামো আর স্বাধীনতাই আমাকে এখানে টেনে এনেছে। আমি খেলেছি বাংলায়, কোচিংও শুরু করেছিলাম কলকাতায়, জানি কাজ করার কতটা পার্থক্য হয়ে যায় দুই জায়গায়। এখানে একজনকে দায়িত্ব দেওয়ার পর কেউ সারাক্ষণ তার কাজে নাক গলায় না। যেটা কলকাতার সব থেকে বড় সমস্যা। বড্ড বেশি ম্যানেজমেন্ট, কতার্রা সব বিষয়ে নাক গলিয়ে ফেলে তাতে কাজটা ভাল মতো করা সম্ভব হয় না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “যে পরিকল্পনা নিয়ে, শিখে কোচিংয়ে এসেছিলাম সেটা এখানে পুরোপুরি করতে পারছি। আমার কোচিংয়ের সব ধরণের পরীক্ষা-নিরিক্ষা করতে পারছি। কেউ কোনও প্রশ্ন করছে না। তার উপর অসাধারণ পরিকাঠামো। এখানে ছেলেদের দল যা পায়, মেয়েদের দলও সেই পরিকাঠামো পায়। আমাদের নিজেদের আলাদা অনুশীলন মাঠ রয়েছে, গার্লস হস্টেল রয়েছে, অভিজ্ঞ কোচিং স্টাফ রয়েছে।”
এর মধ্যেই বাংলার দলে বাংলার প্লেয়ারের না থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিলেন ক্রিসপিন। বলছিলেন, খারাপ লাগে এখন কলকাতার দলগুলোতে বাঙালি প্লেয়ারের না থাকা দেখে। বলছিলেন, “কলকাতার দলগুলোতে স্থানীয় প্লেয়ারের না থাকাটা বড় ভূমিকা নিচ্ছে বাংলার ফুটবলকে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য। তবে এই বছর কলকাতা কিন্তু অনেকটাই বদলেছে বলে মনে হল। মাঠে লোক হচ্ছে কারণ কলকাতা লিগের দলগুলোতে স্থানীয় প্লেয়ার অনেকবেশি রয়েছে। তবে ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানে কোথায়?” প্রসঙ্গ উঠে এল, ডুরান্ড ফাইনালের ডার্বিরও। বলছিলেন, “শেষ ডার্বিতে মাত্র একজন বাঙালি ফুটবলার (শুভাশিস বোস) খেলেছিল। আবেগটাই তো হারিয়ে গিয়েছে। ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানের আবেগটা বোঝার প্লেয়ার কোথায়? যারা এর মধ্যে বড় হয়েছে তারাই বুঝবে।”
তার মুখে ফিরে এল ইউনাইটেড স্পোর্টস ক্লাবের নামও। তার মতে, একমাত্র বাঙালি ফুটবলার সাপ্লাই করছে ইউনাইটেড। সেই ক্লাবগুলোকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিত নাকি শুধু বড় ক্লাবকে। তাঁর কথায় উঠে এল দার্জিলিংয়ের ফুটবলের কথাও। তাঁর পর দার্জিলিং থেকে তেমনভাবে আর কেউ বাংলার ফুটবলে জায়গা করে নিতে পারেননি। কিন্তু ক্রিসপিন বলছেন, “দার্জিলিং থেকেও ফুটবলার উঠছে কিন্তু তাঁরা সবাই বাংলার বাইরের ক্লাবে চলে যাচ্ছে বা স্থানীয় খেপ খেলে হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ বেঁচে থাকতে গেলে টাকাটাও দরকার।”
পাহাড়ের ফুটবলকে বাঁচাতে স্থানীয় প্রাক্তনদের নিয়েই এখন জোট বেধেছেন ক্রিসপিন। কার্শিয়াংয়ে তৈরি করেছেন অ্যাসোসিয়েশন। তৈরি হয়েছে রেসিডেন্সিয়াল অ্যাকাডেমি। গ্রাসরুট পর্যায়ে ও মহিলা ফুটবলে জোড় দিচ্ছেন তিনি ও তাঁর দল। তবে ওড়িশা মহিলা ফুটবল দলের কোচিং করাতে গিয়ে নিজেও প্রতিমুহূর্তে শিখছেন। বলছিলেন, “মহিলাদের নিয়ে শুরুতে কাজ করতে অনেক কিছুর খেয়ালর রাখতে হয়েছে। বায়োলজিক্যালি তারা একদম আলাদা। ছেলেদের ফুটবল আর মেয়েদের ফুটবলের ইনটনসিটি একদম আলাদা। ছেলেদের সঙ্গে যেভাবে কাজ করা যায় মেয়েদের সঙ্গে সেভাবে করা যায় না। তবে ভাল দিক হল মেয়েদের ধৈর্য অনেকবেশি, যেটা তাদের জন্মগত,, মিথ্যে কথা বলে না , সেদিক থেকে সুবিধে হয় কাজ করতে আবার বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে।”
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
