দীপ গায়েন। —নিজস্ব চিত্র
সুচরিতা সেন চৌধুরী: সালটা ২০০৪। তারিখ ৫ ডিসেম্বর। ভারতীয় ফুটবল ফ্যান থেকে ফুটবলার, কর্মকর্তা— সবার কাছে এই দিনটি আজও যন্ত্রণার। ফেডারেশন কাপের ফাইনাল ম্যাচ বেঙ্গালুরুর মাঠে। ছেলেটা পড়ল আর উঠল না। না ভুল বললাম, মাথাটা তুলে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছিল। সতীর্থরা পাগলের মতো তাঁকে জাগানোর চেষ্টা করছিল। কেউ বুকে পাম্প করছিলেন, কেউ মুখে মুখ লাগিয়ে অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত কোনও কিছুই কাজে লাগেনি। মাঠেই শেষ হয়ে গিয়েছিলেন ব্রাজিল থেকে এসে রাতারাতি তারকা হয়ে যাওয়া ক্রিস্টিয়ানো জুনিয়র। আগের বছরই ইস্টবেঙ্গলে যোগ দিয়েছিলেন। পরের বছর চলে যান ডেম্পোতে। আর সেখান থেকেই চির বিদায়। হাসপাতালে নিয়ে গেলেও শেষরক্ষা হয়নি। আজকে যত সহজে ঘটনাটা লিখে ফেলতে পারলাম সেদিন এতটা সহজ ছিল না। সব সাংবাদিকদের হাত কেঁপেছিল নিশ্চিত। প্রতিবছর এই দিনটিতে জুনিয়র ফিরে ফিরে আসেন সবার মনে। তবে আজ কেন আবার তাঁকে মনে করছি? আজও একটা জুনিয়র হতে হতে বেঁচে গেলেন বাংলার ফুটবলার দীপ গায়েন।
পরিস্থিতি সবটাই বড্ড মিলে যাচ্ছিল। মাঠটা আলাদা, টুর্নামেন্টটা আলাদা শুধু। বাকি সবটাই প্রায় এক। সেই গোল করেই মাঠে লুটিয়ে পড়া, গোলকিপারের সঙ্গে সংঘর্ষ, জ্ঞান না ফেরা অনেকটা সময়। মাঠে চরম উত্তেজনা, দুই দলের ফুটবলার, ডাগ আউটে সাপোর্ট স্টাফ থেকে গ্যালারি, টেনশনে তখন থরথর করে কাঁপছে। হুটার বাজিয়ে মাঠে ঢুকেই দীপকে নিয়ে বেরিয়ে গেল অ্যাম্বুলেন্স।
রবিবার বেঙ্গল সুপার লিগ ফাইনালে হাওড়া-হুগলি ওরিয়র্স বনাম মালদহ-মুর্শিদাবাদ রয়্যাল সিটির ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধের খেলা চলছিল। সময়টা ৬০ মিনিটের আশপাশে হবে। ম্যাচের ফল তখন ১-১। গোল করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন হাওড়া-হুগলির ১৮ বছরের দীপ। ওর লক্ষ্য ছিল শুধুই ওই তিনকাঠি। আর নিজের ঘর রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন প্রতিপক্ষের গোলকিপার। ততক্ষণে অবশ্য সুযোগ বুঝে গোলে বল ঠেলে দিয়েছেন দীপ। চুড়ান্ত গতিতে রয়েছেন দু’জনেই, সজোরে ধাক্কা লাগে দীপ আর গোলকিপারের। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে দীপ। সেই একই দৃশ্য দেখা যায় কল্যাণীর মাঠে। তাঁর সতীর্থরা পাগলের মতো অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে থাকে।
পরে জানা যায় অ্যাম্বুলেন্সে যেতে যেকেই জ্ঞান ফেরে দীপের। প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়েও দেওয়া হয়। দীপ মাঠে ফেরার আগেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে গিয়েছিল তাঁর। দলের সবাই যখন উচ্ছ্বাসে মেতে তখন কিছুটা দূরে মাঠের মাঝখানে বসে সেই আনন্দ উপভোগ করছিল ছেলেটা। কেমন আছে জানতে চাওয়ায় বললেন, ‘‘ভালো আছি।’’ তখনও ফুলে রয়েছে মুখ। নাকে জমে রয়েছে রক্ত। চোখের উপর, নাকের হার ফুলে রয়েছে। বলছিলেন, ‘‘কী যে হল কিছুই বুঝতে পারলাম না। তার পর জ্ঞান যখন ফিরল তখন আমি অ্যাম্বুলেন্সে। আমার শুধু মনে আছে আমি বলটায় হেড করেছিলাম।’’
চাকদহের দীপকে প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন এই ব্যারেটোই। রিলায়েন্স অ্যাকাডেমি থেকে হাওড়া-হুগলি দল, ব্যারেটোর হাতেই দীপ জ্বলছে। বয়স মাত্র ১৮। এর মধ্যেই পরিবারের সব দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছেন। জন্ম থেকেই বাবা চোখে ঝাঁপসা দেখেন, যে কারণে আর তেমনভাবে কাজ করতে পারেন না। মা একটা সময় লোকের বাড়িতে কাজ করেও সংসার চালিয়েছেন। এখন ছেলে একটু রোজগার করছে, তাই কিছুটা স্বস্তি। ছোটবোন রয়েছে। ১৮ বছরেই দীপের কাঁধে অনেক দায়িত্ব। তার মধ্যেই স্বপ্ন দেখেন ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান খেলার। জিজ্ঞেস করলে নিদ্বির্ধায় তা স্বীকারও করেন। বলছিলেন, ‘‘বাংলার সব ফুটবলারই চায় ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগানে খেলতে। আমিও তাই চাই।’’ কলকাতার মাটিতে এই প্রথম খেলা, আশা কেউ হয়তো ডাকবে এবার। তবে এক নম্বর পছন্দ ইস্টবেঙ্গল। বলছিলেন, ‘‘আপাতত আরএফডিএল, কলকাতা লিগ খেলতে চাই। ইস্টবেঙ্গলে খেলতে চাই।’’
তাঁর এই উত্থানে ব্যারেটোকে কৃতিত্ব দিতে ভুলছেন না দীপ। বলছিলেন, ‘‘আমার উপর পুরো টুর্নামেন্টে ভরসা রেখেছে। সব ম্যাচ খেলিয়েছে। আমিও চেষ্টা করেছি নিজের সেরাটা দিতে। সেমিফাইনালে ম্যাচের সেরা হয়েছি, ফাইনালে গোল করেছি। আশা করি কলকাতার দলগুলো সেটা দেখে আমাকে সুযোগ দেবে।’’
এদিন ছেলের খেলা দেখতে গ্যালারিতে হাজির হয়েছিলেন দীপের বাবা-মাও। ছেলের লুটিয়ে পড়া আর মাঠের উত্তেজনা দেখে তাঁদের মনের অবস্থা কী হয়েছিল তা বাকিদের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। দীপ বলছিলেন, ‘‘মা তো কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছিল। বাবা আমার সঙ্গেই হাসপাতালে ছুটেছিল। সুস্থ আছি জেনে সবাই নিশ্চিন্ত হয়।’’ দীপকে মাঠে দেখে বাকিরাও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। দলের সহকারি কোচ সুমন দত্ত বলছিলেন, ‘‘আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মাঠে দৌঁড়ে যাই। সত্যি কথা বলতে কী আমারও তখন জুনিয়ের ঘটনার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। আমি সামনে থেকে সেই ঘটনা দেখেছিলাম কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে বসে। তখন আমি টালিগঞ্জ অগ্রগামীতে। সেমিফাইনালে ডেম্পোর কাছে হেরে গিয়েছিলাম। তখনও বেঙ্গালুরুতে থাকায় ফাইনাল দেখতে গিয়েছিলাম। চোখের সামনে সেই ঘটনার স্মৃতি আজও তাজা।’’
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
