অলস্পোর্ট ডেস্ক: মুম্বই সিটি এফসি-র ঘরের মাঠে গোলশূন্য ড্র করল ইস্টবেঙ্গল এফসি । শনিবার মুম্বই ফুটবল এরিনায় দুর্দান্ত রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে টানা চারটি ম্যাচে অপরাজিত রইল লাল-হলুদ ব্রিগেড। এ ছাড়াও টানা তৃতীয় ম্যাচে ক্লিন শিট রেখে মাঠ ছাড়ল তারা।
এ দিন মুম্বই সিটি এফসি-র অয্টাকারদের দুর্দান্ত দক্ষতায় সামলায় ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ। জর্ডনের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিজাজি মাহের এ দিন দুরন্ত ফর্মে ছিলেন। তাঁকেই ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় বাছা হয়। এই নিয়ে মুম্বইয়ের টানা দ্বিতীয় ম্যাচ গোলশূন্য রইল। তাদের নতুন কোচ পিটার ক্রাতকির প্রশিক্ষণে এখনও দলকে একটিও ম্যাচে জেতাতে পারলেন না গ্রেগ স্টুয়ার্ট, জর্জ পেরেইরা দিয়াজরা। এই ড্র-য়ের ফলে ইস্টবেঙ্গল এফসি ন’টি ম্যাচে দশ পয়েন্ট নিয়ে সাত নম্বরে উঠে এল এবং মুম্বই সিটি এফসি আট ম্যাচে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে রয়েছে চার নম্বরে, তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ মোহনবাগান এসজি-র পরেই।
যিনি এর আগে প্রায় প্রতি ম্যাচেই গোল পেয়ে এসেছেন, মুম্বইয়ের সেই আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার পেরেইরা দিয়াজ ও তাদের সবচেয়ে বিপজ্জনক গোলমেকার গ্রেগ স্টুয়ার্টকে এ দিন কড়া পাহাড়ায় রাখেন মাহের, লালচুঙনুঙ্গা, মন্দার রাও দেশাই, নিশু কুমাররা। মুম্বইয়ের ফুটবলাররা ইস্টবেঙ্গলের বক্সে ২৪ বার বলে পা লাগালেও একবারও বল জালে জড়াতে পারেননি।
এ ছাড়াও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার শৌভিক চক্রবর্তীকে এ দিন যথেষ্ট তৎপর ভূমিকায় দেখা যায়। স্টুয়ার্টকে দু-দু’বার পিছন থেকে আঘাতও করেন তিনি। কিন্তু তাঁর সৌভাগ্য যে দু’বার হলুদ কার্ড দেখে তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয়নি। তবে কোচ কার্লস কুয়াদ্রাত স্টুয়ার্টকে কড়া পাহাড়ায় রাখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন শৌভিককে, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। সেই দায়িত্ব এ দিন দুর্দান্ত ভাবে পালন করেন বাংলার এই ফুটবলার।
মুম্বইয়ের রক্ষণও এ দিন বেশ সঙ্ঘবদ্ধ ছিল। যার ফলে ম্যাচের ৭৩ মিনিট পর্যন্ত কোনও দলই একটিও শট ক্রসবারের নীচে রাখতে পারেনি। সারা ম্যাচে মুম্বই সিটি এফসি-র দু’টি ও ইস্টবেঙ্গলের মাত্র একটি শট লক্ষ্যে ছিল। ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের কার্যত নিজেদের বক্সে ঢুকতেই দেননি তিরি, রাহুল ভেকে, মেহতাব সিং, আকাশ মিশ্ররা। মুম্বইয়ের বক্সে সারা ম্যাচে মাত্র ছ’বার বলে পা ছোঁয়াতে পেরেছেন ক্লেটন, বিষ্ণু, নন্দুকুমাররা। এ দিন সব মিলিয়ে ৪৬টি ক্রসের চেষ্টা করে দুই দল। যার মধ্যে ৩২টিই ছিল মুম্বইয়ের। বল দখল (৬৯-৩১) ও পাসের সংখ্যার দিক থেকেও (৫৪৬-২৪১) মুম্বই এ দিন অনেক পিছনে ফেলে দেয় ইস্টবেঙ্গলকে। কিন্তু এতটা আধিপত্য বিস্তার করেও আসল কাজটা করতে পারেননি রাহুল ভেকে-রা।
ইস্টবেঙ্গলের প্রথম এগারোয় নন্দকুমারের জায়গায় এ দিন বিষ্ণু পুথিয়াকে দেখা যায়। সামনে ক্লেটন সিলভা ও তাঁর পিছনে নাওরেম মহেশ সিং, বোরহা হেরেরা ও বিষ্ণুকে রেখে ৪-২-৩-১-এ খেলা শুরু করে ইস্টবেঙ্গল। অন্যজিকে, প্রথম দলে চারটি পরিবর্তন করে মুম্বই সিটি এফসি। ৩-৪-২-১-এ শুরু করে তারা। সামনে পেরেইরা দিয়াজ ও তাঁর পিছনে গ্রেগ স্টুয়ার্ট ও জয়েশ রানে ছিলেন। দুই উইং দিয়ে শুরু থেকেই নাগাড়ে আক্রমণ তৈরি করতে দেখা যায় বিপিন সিং ও আকাশ মিশ্রকে।
শুরু থেকেই এ দিন প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা শুরু করে মুম্বই। চতুর্থ মিনিটেই ডানদিক থেকে পেরেইরা দিয়াজ যে ক্রস দিয়েছিলেন ছ’গজের বক্সের মধ্যে, তা হেড করে বারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দেন জয়েশ রানে। ন’মিনিটের মাথায় বিপিন ফের ক্রস দেন ডানদিক থেকে এবং গোলের সামনে সেই ক্রসে পা লাগাতে পারলে অবধারিত গোল পেতেন পেরেইরা দিয়াজ।
তবে এ দিন ফুটবলের সঙ্গে শরীরি সঙ্ঘর্ষও প্রায়ই দেখা যায়। নিজেদের মধ্যে প্রায় হাতাহাতির উপক্রম করে হলুদ কার্ড দেখেন ক্লেটন ও তিরি। গ্রেগ স্টুয়ার্টকে পিছন থেকে আঘাত করে হলুদ কার্ড দেখেন শৌভিক চক্রবর্তী। ২৩ মিনিটের মাথায় ফের স্টুয়ার্টকে মারাত্মক ভাবে আঘাত করেন শৌভিক। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে রেফারি তাঁকে মাঠ থেকে বার করে দিলে কারও কিছু বলার থাকত না। কিন্তু এ বার কার্ড দেখাননি তিনি। প্রথমার্ধের শেষ দিকে দু-পা দিয়ে ভ্যান নিফের পায়ে আঘাত করেন লালচুঙনুঙ্গা, যা রেফারির চোখ না এড়ালে হয়তো লাল-কার্ড দেখতেন লাল-হলুদ ডিফেন্ডার। প্রথমার্ধেই মুম্বইয়ের তিন ফুটবলার ও ইস্টবেঙ্গলের দু’জন হলুদ কার্ড দেখেন।
প্রথমার্ধে বেশি চাপে ছিল ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ। সেই চাপ দারুন ভাবে সামলান লাল-হলুদ ডিফেন্ডাররা। ডিফেন্ডারদের পরষ্পরের মধ্যে এ দিন ভাল বোঝাপড়াও দেখা যায়। প্রথম ৪৫ মিনিটে প্রায় ৭০ শতাংশ পজেশন ছিল মুম্বইয়ের। তাদের মোট পাসের সংখ্যা যেখানে ছিল ২৬৬, সেখানে ইস্টবেঙ্গল ১১৮টি পাস দেয়। তবে বিরতির আগে পর্যন্ত কোনও পক্ষই গোলে শট রাখতে পারেনি। ইস্টবেঙ্গল একমাত্র ও প্রথম ভাল সুযোগটি পায় ৩২ মিনিটে। কিন্তু বক্সের বাঁদিকের মাথা থেকে কোণাকুনি ভাসানো শটে বারের ওপর দিয়ে বল উড়িয়ে দেন বোরহা হেরেরা।
বিরতির পর বিষ্ণুর জায়গায় নামেন নন্দকুমার শেখর, যিনি নর্থইস্টের বিরুদ্ধে জোড়া গোল পেয়েছিলেন। কিন্তু গত ম্যাচে তেমন কিছুই করতে পারেননি। এই অর্ধের শুরুতেই প্রতিপক্ষের রক্ষণে হানা দেন লাল-হলুদ ডিফেন্ডার নিশু কুমার। কিন্তু ডানদিক থেকে বক্সের মধ্যে ক্রস না দিয়ে নিজেই গোলে শট নেন, যা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কিন্তু ৫৬ মিনিটে বক্সের মাথা থেকে জয়েশ রানের নেওয়া যে দূরপাল্লার শটটি বারের সামান্য ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়, তাতে এই ম্যাচে তাদের দুর্ভাগ্যের স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল।
৬৪ মিনিটের মাথায় একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন করে মুম্বই। লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতের সঙ্গে নামেন বিনীত রাই ও রস্টিন গ্রিফিথ। তাঁরা নামায় পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন করে মুম্বই। আক্রমণে সংখ্যা বাড়াতে শুরু করে তারা। সে জন্য অবশ্য তাদের রক্ষণে বেশি জায়গা তৈরি হয়ে যায়। ৬৮ মিনিটের মাথায় এই জায়গা কাজে লাগিয়ে মুম্বইয়ের বক্সে ঢুকে পড়েন ক্লেটন ও শটও নেন। কিন্তু তা ব্লক হয়ে যায়।
দুই দলেরই রক্ষণ এ দিন এতটাই সঙ্ঘবদ্ধ ছিল যে ৭০ মিনিট পর্যন্ত কোনও দলই কোনও শট গোলে রাখতে পারেনি। ৭৩ মিনিটের মাথায় প্রথম গোলে শট নেন গ্রিফিথ। ছ’গজের বক্সের মধ্যে থেকে নেওয়া এই শট তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আটকে দেন প্রভসুখন গিল। বিপিনের ক্রস থেকে এই সুযোগ পেয়েছিলেন গ্রিফিথ। ৮০ মিনিটের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে গোলে শট নেন আপুইয়া। এ বারও তা আটকে দেন গিল।
ইস্টবেঙ্গল তাদের প্রথম গোলমুখী শটটি নেয় ৮৯ মিনিটের মাথায়, যখন নন্দকুমারের ফরোয়ার্ড থ্রু থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে শট নেন ক্লেটন। কিন্তু ব্রাজিলীয় স্ট্রাইকারের দুর্বল শট সোজা গোলকিপার ফুর্বা লাচেনপার হাতে চলে যায়।
ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটের বেশ কিছুটা রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে ইস্টবেঙ্গল, যার ফলে তাদের ওপর ক্রমশ চাপ বাড়াতে শুরু করে মুম্বই সিটি এফসি। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আট মিনিট আগে ইস্টবেঙ্গল যখন বোরহার জায়গায় হাভিয়ে সিভেরিওকে নামায়, তখন গ্রেগ স্টুয়ার্টের জায়গায় নামেন ডাচ ফরোয়ার্ড আবদেনাসের এল খয়াতি।
আট মিনিটের বাড়তি সময়ের তৃতীয় মিনিটে ইস্টবেঙ্গল তাদের জয়সূচক গোলের সুবর্ণ সুযোগ পায়. যখন মহেশের পাস পেয়ে নন্দকুমার প্রায় ফাঁকা বক্সে ঢুকে পড়েন এবং গোলের উদ্দেশ্যে শটও নেন। কিন্তু তা ব্লক করে দেন তিরি। তিরি বাধা হয়ে না দাঁড়ালে হয়তো মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে পুরো নম্বর নিয়ে পরীক্ষা পাস করে যেত ইস্টবেঙ্গল।
ইস্টবেঙ্গল এফসি দল: প্রভসুখন গিল (গোল), নিশু কুমার, লালচুঙনুঙ্গা, হিজাজি মাহের, মন্দার রাও দেশাই, শৌভিক চক্রবর্তী, সল ক্রেসপো, বোরহা হেরেরা (হাভিয়ে সিভেরিও-৮২), বিষ্ণু পুথিয়া (নন্দকুমার শেখর-৪৬), ক্লেটন সিলভা, নাওরেম মহেশ সিং।
(লেখা আইএসএল ওয়েব সাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
