অলস্পোর্ট ডেস্ক: প্রায় ১৬ মাস পরে তাঁকে মাঠে নামতে দেখে সবুজ-মেরুন সমর্থকেরা যুবভারতীর গ্যালারিতে তাঁর নামে যে রকম জয়ধ্বনী দিয়েছিলেন, তাতেই তাঁর শক্তি ও আত্মবিশ্বাস অনেকটা বেড়ে গিয়েছে বলে মনে করেন ফিনল্যান্ডের তারকা মিডফিল্ডার জনি কাউকো। যিনি চোট সারিয়ে প্রায় ১৫ মাস পর মাঠে নেমেছেন সম্প্রতি।
গত শনিবার সহাল আব্দুল সামাদ ৬১ মিনিটের মাথায় জনি কাউকোকে জায়গা করে দিতে মাঠ ছাড়েন। সে দিন ম্যাচের আগেই হুগো বুমৌসকে ছেড়ে দিয়ে কাউকোকে মরশুমের শেষ পর্যন্ত রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয় মোহনবাগান। সে দিন প্রায় ১৫ মাস পর মাঠে নেমে অবশ্য খুব একটা ছন্দে ছিলেন না কাউকো। মনবীরের একটি কাট ব্যাক তাঁর পায়ে এলে তিনি যে স্লাইস করেন, তা খুবই দুর্বল ছিল। বহু দিন পর যে ম্যাচে নেমেছেন, তা বোঝাই যায়।
কিন্তু তিনি মাঠে নামার পরে মোহনবাগান দলের চেহারা যে ভাবে পাল্টে যায়, তাতে বোঝা যায় দলে যে একজন যোগ্য নেতার প্রয়োজন ছিল, কাউকোর মধ্যেই সেই নেতাকে খুঁজে পেয়েছে সবুজ-মেরুন শিবির। কলকাতায় ফিরে এসে খুশি কাউকো বলেন, “খুবই ভাল লাগছে অনেক দিন পর মাঠে নেমে। এখানে ফিরে আসতে পেরে আমি সত্যিই খুশি এবং দলকে জেতাতে পেরেও ভাল লাগছে”।
সবুজ-মেরুন বাহিনীর সাফল্যের ফেরার ক্ষেত্রে কাউকোর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতার প্রভাব যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পরিবর্ত বেঞ্চ থেকে নামেন জনি কাউকো এবং সে দিনও তিনি নামার পরে দলের খেলা পুরো পাল্টে যায়। ম্যাচের ৬৩ মিনিটের মাথায় ওদেই ওনাইন্দিয়াকে ডজ করে বক্সে ঢুকে পড়েন কাউকো। কিন্তু সেই ওদেইয়ের ট্যাকলেই নিরস্ত হন তিনি।
তবু কাউকোর আফসোস, হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ২-০-য় জেতা ম্যাচে আরও গোল করতে পারতেন তাঁরা। বলেন, “হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে শুরুটা খুব ভাল করেছিলাম আমরা। আরও গোল করতে পারতাম। এই ধরনের ম্যাচে যখন একটা দল ২-০-য় এগিয়ে থাকে, তখন খেলাটা আরও ওপেন হয়ে যায় এবং প্রায়ই এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে খেলা হতে থাকে। সে দিন দ্বিতীয়ার্ধে সে রকমই খেলা হয়েছিল। দুই দলই প্রচুর হাফ চান্স তৈরি করে। তবে দলের পারফরম্যান্সে আমি খুশি। যা করা দরকার, সেটাই করেছি আমরা। ম্যাচ জিতেছি তিন পয়েন্ট পেয়েছি”।
তবে সে দিন কাউকো মাঠে নামার সময় গ্যালারিতে সমর্থকেরা যে ভাবে তাঁর নামে জয়ধ্বনী দেওয়া শুরু করেন, তাতে মুগ্ধ ফিনিস তারকা। বলেন, “সমর্থকেরা যে ভাবে আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, তাতে আমি অভিভূত। অনেক দিন পরে এই ধরনের কোনও ফুটবল ম্যাচে নামার সময় সমর্থকেরা যে ভাবে আমাকে উৎসাহ জোগান, তাতে আমি সত্যিই খুব খুশি। প্রত্যেক সমর্থকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। মাঠে নামার সময় আমার নাম ধরে চিৎকার করছিল তারা। এতে আমার শক্তি আরও বেড়ে গিয়েছে। এর ফলে দলের জন্য আরও পরিশ্রম করার উৎসাহ কয়েকগুন বেড়ে গিয়েছে”।
২০২২-এর নভেম্বরে এই এফসি গোয়ার বিরুদ্ধেই মোহনবাগানের ০-৩-এ হারের সঙ্গে সঙ্গে কাউকোর চোটের দুঃসংবাদও ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ে শিবিরে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্লাব জানিয়ে দেয়, দীর্ঘদিনের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে হবে কাউকোকে। তখনই বোঝা গিয়েছিল, সেই মরশুমে খেলা হবে না উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ খেলে আসা ফিনল্যান্ডের এই তারকা ফুটবলারের।
তার আগের মরশুমে (২০২১-২২) ভারতে এসে শুরুর দিকে কিছুটা শ্লথ থাকলেও ক্রমশ নিজের ছন্দ ফিরে পান কাউকো। হয়ে উঠেছিলেন দলের নির্ভরযোগ্য এক সদস্য, যিনি গোটা দলটাকে মানসিক ভাবে চাঙ্গা করে রাখতেন। যখন তাঁকে নেওয়া হয়, তখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছিল হুগো বুমৌস দলে থাকা সত্ত্বেও কাউকোকে এনে কী করতে চায় মোহনবাগান? যেহেতু চারজনের বেশি বিদেশি প্রথম এগারোয় রাখার নিয়ম নেই, তাই এই প্রশ্ন আরও বেশি করে ওঠে। কিন্তু দু’জনকেই দারুন ভাবে ব্যবহার করেন দুই কোচ হাবাস ও ফেরান্দো। কিন্তু গত মরশুমেই গুরুতর চোট পেয়ে যান কাউকো। সেই কাউকো ফিরে আসায় সমর্থকেরা খুবই খুশি।
খুশি কোচ হাবাসও শুক্রবার তিনি বলেন, “কাউকো একশো শতাংশ ফিট। ১২ মাসেরও বেশি ফুটবল খেলেনি জনি। ও একজন পেশাদার ফুটবলার, আন্তর্জাতিক ফুটবলের অভিজ্ঞতাও ওর আছে। তাই ক্রমশ খেলায় ফিরে আসছে। ওকে একেবারে ৯০ মিনিটের জন্য মাঠে নামানো যাাবে না। ক্রমশ যতটা সম্ভব বেশিক্ষণ ওকে খেলিয়ে ও অনুশীলন করিয়ে আগের জায়গায় নিয়ে আসতে হবে”। লিগের সেরা হওয়ার দৌড় এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছে। এই সময় যে কাউকোকে খুবই প্রয়োজন দলের, তা বুঝতেই পেরেছেন অভিজ্ঞ কোচ হাবাস।
বুধবার দিমিত্রিয়স পেট্রাটসের যে গোলে এফসি গোয়াকে হারায় মোহনবাগান এসজি, সেই গোলেও কাউকোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মাঝমাঠ থেকে দূরপাল্লার ফরোয়ার্ড পাসে প্রতিপক্ষের বক্সের সামনে পাঠান ফিনল্যান্ডের ইউরো কাপার, যা ক্লিয়ার করতে বেরিয়ে আসেন গোয়ার গোলকিপার অর্শদীপ সিং। কিন্তু তাঁর ক্লিয়ারেন্স প্রায় ছিনিয়ে নেন পেট্রাটস এবং সোজা ফাঁকা গোলে শট নেন। এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে জয়ই মোহনবাগানকে লিগ টেবলের তিন নম্বরে তুলে দিয়েছে। নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি-কে হারাতে পারলে তারা গোয়ার দলকে টপকে চলে যাবে দু’নম্বরে।
মাঠে ফিরে আসা প্রসঙ্গে কাউকো বলেন, “এখানে এসে মাঠে নামার আগে কয়েক সপ্তাহ অনুশীলন করেছি। তবে ম্যাচ খেলতে নামা অন্যরকম ব্যাপার। ম্যাাচে অনেক সময় অন্যরকম কিছু করতে হয়। আমি খুশি। তবে সুযোগ হাতছাড়া করে মোটেই খুশি হতে পারিনি। কামব্যাক ম্যাচে একটা গোল করতে পারলে কত ভাল হত। পরিশ্রম করে যাব। আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে আরও ভাল খেলব”।
২০২১-এ এই আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের তত্ত্বাবধানেই আইএসএলে অভিষেক হয় কাউকোর। এ বার হাবাসের প্রত্যাবর্তনের দিনই কাউকোও মাঠে ফিরলেন। এই দু’জনের কম্বিনেশন যে দলের যথেষ্ট উপকার করবে, তার ইঙ্গিত কাউকোর কথার মধ্যেই রয়েছে।
“এখানে আমার প্রথম মরশুমে আমি আন্তোনিও হাবাসের অধীনেই ছিলাম। ওঁর ফুটবল-ভাবনা কী রকম, তা আমি জানি। উনি কী ভাবে দলকে খেলাতে পছন্দ করেন, আমার কাছ থেকে উনি কী চান, তাও জানি। সেটাই করার চেষ্টা করছি। তবে আমার ভূমিকা আগে যে রকম ছিল, সে রকম থাকবে বলে মনে হয় না। দলকে জেতানোর জন্য নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার”, বলেন কাউকো।
তবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সমর্থকদের প্রশংসাই বারবার শোনা গেল কাউকোর গলায়। বলেন, “যখন চিকিৎসা চলছিল আমার, তখন সোশ্যাল মিডিয়া মারফৎ সমর্থকদের প্রচুর বার্তা পেয়েছি। এখানে দীর্ঘ সময় আগে ম্যাচ খেলেছি। খুব মিস করেছি। যারা মেসেজ পাঠিয়েছেন, তাঁদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমার নামে স্লোগান, চিৎকার এগুলো আমাকে সত্যই অনেক উৎসাহিত করেছে। ফিরে আসার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি। এ বার ফিরে আসার পর আরও পরিশ্রম করতে চাই”।
ব্যর্থতার অন্ধকার থেকে দল সাফল্যের আলোয় ফিরে আসায় খুশি কাউকো। তিনি এখন তাকিয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে। বলেন, “আশা করি, সাফল্যের ছন্দ ধরে রাখতে পারব আমরা। কয়েকটা ম্যাচ আমাদের কাছে সত্যিই কঠিন। এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচটা সে রকমই। এই ম্যাচে জেতাটা বড় ব্যাপার। আশা করি, এই মরশুমেও সফল হব আমরা”।
(লেখা আইএসএল ওয়েব সাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
