অলস্পোর্ট ডেস্ক: ডার্বি জয়ের উৎসব পুরোপুরি শেষ করার আগেই মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের সামনে আরও এক কঠিন প্রতিপক্ষ হাজির, কেরালা ব্লাস্টার্স এফসি। লিগ টেবলের অবস্থানের দিক থেকে দেখতে গেলে ইস্টবেঙ্গলের চেয়ে বেশি শক্তিশালী তারা। কিন্তু সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের বিচারে ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রীতম কোটালের দল। লাল-হলুদ বাহিনীর মতো তারাও গত পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে একটিমাত্র জয় পেয়েছে। বাকি চারটিতেই হেরেছে।
তবে এটা যেহেতু ইন্ডিয়ান সুপার লিগ এবং এখানে যেহেতু যে কোনও দলই যে কোনও ম্যাচে যে কোনও প্রতিপক্ষকে হারাতে পারে, সে এক নম্বরই হোক বা পাঁচ বা দশ, তাই এই লিগে কোনও দলকেই দুর্বল মনে করার মতো বড় ভুল আর কিছুই হতে পারে না। আর কেরালা ব্লাস্টার্সকে কম গুরুত্ব দিলে তা হয়ে উঠতে পারে চরম সর্বনাশের কারণ।
বিপর্যস্ত, অথচ শক্তিশালী
এ পর্যন্ত ১৭টি ম্যাচের মধ্যে ন’টিতে জিতে ও দু’টিতে ড্র করে ২৯ পয়েন্ট নিয়ে ব্লাস্টার্স রয়েছে ১৭ নম্বরে। মোহনবাগান এসজি-র মতো তাদেরও এখনও পাঁচটি ম্যাচ বাকি। প্লে অফে জায়গা সুনিশ্চিত করার জন্য এই পাঁচ ম্যাচে পাঁচ পয়েন্ট পেতে হবে তাদের। গত মাসের শেষ সপ্তাহে এফসি গোয়াকে ঘরের মাঠে যে ভাবে ৪-২-এ হারায় তারা, যে ভাবে ম্যাচের শেষ দিকে মাত্র আট মিনিটের মধ্যে তিন-তিনটি গোল করে প্রতিপক্ষের মুখ থেকে গ্রাস কেড়ে নেয়, তার পরে এটা নিশ্চিত যে, কেরালা ব্লাস্টার্সের পক্ষে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়।
যে রকম ফর্মে রয়েছেন তাদের গ্রিক ফরোয়ার্ড দিমিত্রিয়স দিয়ামান্তাকস, তা যে কোনও প্রতিপক্ষকেই চিন্তায় রাখতে পারে। ১৪টি ম্যাচ খেলে দশ গোল করেছেন এই তারকা স্ট্রাইকার। গোয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেন তিনি। চলতি লিগে দলের গত এক ডজন ম্যাচের মধ্যে আটটিতেই গোল পেয়েছেন। এর মধ্যে তিনটি ম্যাচে কোনও গোল পায়নি ব্লাস্টার্স। দিয়ামান্তাকসের গতি, ক্ষিপ্রতা, প্রতিপক্ষের গোলের সামনে তাঁর সঠিক জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার প্রবণতা ও সুযোগসন্ধানী ভূমিকা নিয়ে আলাদা করে ভাবতেই হবে মোহনবাগানের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসকে। তাঁকে আটকাতে না পারলে বিপদ বাড়বে বই কমবে না।
ভরসার রক্ষণ
যদিও ইদানীং মোহনবাগানের ডিফেন্স ভাল ফর্মেই আছে। সর্বোপরি তাদের গোলকিপার বিশাল কয়েথ দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। রবিবার ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে তিনি দু’টি অবধারিত গোল বাঁচান। নতুন বছরে এ পর্যন্ত যে সাতটি ম্যাচ খেলেছে মোহনবাগান, তার মধ্যে চারটিতে ক্লিন শিট রাখতে পেরেছে তারা। তার আগে যে দশটি ম্যাচ খেলেছিল তারা, তার মধ্যে দু’টিতে কোনও গোল খায়নি। সব মিলিয়ে চলতি লিগে ৩৩টি সেভ করেছেন বিশাল, তাঁর সেভ পার্সেন্টেজ ৬৩%।
তবে রক্ষণে শুভাশিস বোস, হেক্টর ইউস্তে, আশিস রাই, আনোয়ার আলি-রা দলের কাছে যথেষ্ট ভরসার পাত্র হয়ে উঠেছেন। এ ছাড়াও প্রয়োজনে মাঝমাঠ থেকে নেমে এসে প্রায়ই রক্ষণে যোগ দেন অনিরুদ্ধ থাপা, জনি কাউকো, অভিষেক সূর্যবংশী, দীপক টাঙরিরা। ফলে প্রতিপক্ষের প্রতি আক্রমণ সামলানোয় তাদের সফলই বলা যায়। তাই বুধবারের ম্যাচে দিয়ামান্তাকস ও তাঁর সতীর্থ ফরোয়ার্ডদের কাছে গোল পাওয়াটা মোটেই সোজা হবে না।
দুর্ধর্ষ আক্রমণ
তাদের পক্ষে আরও কঠিন কাজ হবে মোহনবাগানের দুর্ধর্ষ আক্রমণ বিভাগকে রোখা। দিমিত্রিয়স পেট্রাটস, জেসন কামিংস, আরমান্দো সাদিকু, লিস্টন কোলাসো, মনবীর সিং প্রত্যেকেই দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। পিছন থেকে তাঁদের সঙ্গে সমানে আক্রমণ তৈরিতে সাহায্য করেন সহাল আব্দুল সামাদ, জনি কাউকো, অভিষেক সূর্যবংশীরা। আক্রমণের এই ঝাঁঝ সহ্য করা যে কোনও দলের ডিফেন্ডারদের কাছেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই ম্যাচে আবার প্রীতম কোটালের সঙ্গে লড়াই তাঁর প্রাক্তন ক্লাবের সতীর্থদের। যেমন সহাল আব্দুল সামাদের সঙ্গে তাঁর প্রাক্তন ক্লাবের। যদিও গত ম্যাচে প্রীতম প্রথম এগারোয় ছিলেন না। ৭৩ মিনিটে নামেন পরিবর্ত হিসেবে। তবে দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ইন্টারসেপশন করা প্রীতম এ পর্যন্ত যে ১৫টি ম্যাচে খেলেছেন, তাতে ফর্মেই ছিলেন বলা যায়। ডিসেম্বরে টানা তিনটি ম্যাচে ক্লিন শিট রাখেন তাঁরা। এর মধ্যে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে অ্যাওয়ে ম্যাচও ছিল। সেই ম্যাচে দিয়ামান্তাকসের দেওয়া ন’মিনিটের গোলে জেতে দল। তার পরে নিজেদের গোলের সামনে প্রায় দেওয়াল তুলে দেন প্রীতমরা।
অতীতের স্মৃতি
সে দিন প্রথম ৪৫ মিনিটে মোহনবাগানের একটিও শট ছিল না। না গোলে, না গোলের বাইরে। সেখানে ব্লাস্টার্সের ফুটবলাররা পাঁচটি শট নেন। প্রথমার্ধের শেষ দিকে সমানে পরপর আক্রমণ করেন। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে অবশ্য অন্য মোহনবাগানকে দেখা যায়। বিশেষ করে আক্রমণে। প্রথমার্ধে যেখানে কোনও শটই নিতে পারেনি হোম টিম, সেখানে দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ১৫ মিনিটের মধ্যে চারটি শট নেয় তারা, যার মধ্যে একটি ছিল গোলে। কেরালার দলের দুই বিদেশি ডিফেন্ডার মার্ক লেসকোভিচ ও মিলোস দ্রিনচিচ সে দিন প্রতিপক্ষের সামনে প্রায় দেওয়াল তুলে রেখেছিলেন। এঁদের তৈরি দেওয়াল ভেদ করে আর জালে বল জড়াতে পারেনি মোহনবাগান। বুধবারও সেই ফর্মুলায় খেলবে কি না ব্লাস্টার্স, সেটাই দেখার।
ঘরের মাঠে নেমে কেরালা-বাহিনীকে কী ভাবে নাস্তানাবুদ করতে হয়, তা গত মরশুমে দেখিয়ে দিয়েছিলেন পেট্রাটসরা। সেই ম্যাচ অনেকেরই মনে থাকার কথা। সে দিন কোচির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হাজার ৩৪ ব্লাস্টার্স-সমর্থকের চিৎকারের মধ্যেও অস্ট্রেলীয় তারকা পেট্রাটস হ্যাটট্রিক করে দলের জন্য ৫-২-এ জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। সেই ম্যাচে শুরু থেকেই এটিকে মোহনবাগানকে অপ্রত্যাশিত রকমের চাপে ফেলে দেয় কেরালা ব্লাস্টার্স এবং ছ’মিনিটের মধ্যে গোলও পেয়ে যায় তারা। কিন্তু ঘণ্টাখানেকের ব্যবধানে ছবিটা যে পুরো উল্টে দেবে তাদের প্রতিপক্ষ, তা বোধহয় ভাবতে পারেনি তারা।
এক বছর পরে সেই হারের বদলা নেওয়ার সুযোগ এসেছে ইভান ভুকোমানোভিচের সামনে। সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার তিনি ও তাঁর দল করতে পারবে কি না, সে তো অবশ্যই দেখার বিষয়। কিন্তু তাদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সই তাদের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে।
যা নিয়ে তাদের কোচ ভুকোমানোভিচ বলছেন, “আমরা এ পর্যন্ত সব ম্যাচেই সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বিশেষ করে বড় ম্যাচগুলোতে আমরা সমর্থকদের আকর্ষণীয় ফুটবল উপহার দিয়েছি। কিন্তু ছোট ছোট কিছু ভুলের মাশুল দিতে হয়েছে মাঝে মাঝে। লিগের এই অবস্থায় ছোট ছোট ভুলগুলোই এড়িয়ে চলতে হবে আমাদের”। হাবাসও নিশ্চয়ই একই পরামর্শ দেবেন তাঁর দলের ছেলেদের।
পরিসংখ্যান বলছে
গত টানা সাতটি ম্যাচে অপরাজিত রয়েছে মোহনবাগান এসজি। এর আগে ২০২৩-এর ফেব্রুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা টানা ১৩টি ম্যাচে অপরাজিত (৯টি জয়, চারটি ড্র) ছিল। চলতি লিগে এ পর্যন্ত ১৭টি ম্যাচে ৩৬ পয়েন্ট অর্জন করেছে মোহনবাগান। এই সংখ্যক ম্যাচে আর একবারই তারা এত পয়েন্ট পেয়েছে, ২০২০-২১ মরশুমে। সে বারও এ বারের মতো ১৭টির মধ্যে ১১টি ম্যাচে জয় পেয়েছিল তারা।
কেরালা ব্লাস্টার্স গত ন’টি হোম ম্যাচে অন্তত একটি করে গোল করেছে। এই ন’টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে হেরেছে তারা। বাকি আটটির মধ্যে দুটি ড্র হয়েছে ও ছ’টিতে জিতেছে তারা। এ পর্যন্ত ক্রস থেকে মাত্র একটি গোল করেছে ব্লাস্টার্স। চলতি লিগে ক্রস থেকে এর চেয়ে কম গোল আর কোনও দলই করেনি। মোহনবাগানও তিনটি গোল করেছে ক্রস থেকে।
আইএসএলে দুই দলের মধ্যে ম্যাচের ইতিহাসে দিমিত্রিয়স পেট্রাটসের গোল অবদান সবচেয়ে বেশি, পাঁচটি (গোল ৩, অ্যাসিস্ট ২)। রয় কৃষ্ণারও গোল অবদানের সংখ্যা সমান। বুধবার পেট্রাটস গোল পেলে দুই দলের দ্বৈরথে সর্বোচ্চ গোলদাতা রয় কৃষ্ণাকে ছুঁয়ে ফেলবেন অস্ট্রেলীয় তারকা। ব্লাস্টার্সের ‘দিমি’ দিমিত্রিয়স দিয়ামান্তাকসের শুটিং অ্যাকিউরেসি চলতি লিগে ৭২%, যা এ মরশুমে সর্বোচ্চ ও কনভারশন রেট ৩০.৩%, যা এ মরশুমে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। মোহনবাগানের বিরুদ্ধে শেষ দুই ম্যাচেই তিনি গোল পেয়েছেন। এ পর্যন্ত কোনও একটি দলের বিরুদ্ধে টানা তিন ম্যাচে গোল পাননি তিনি।
দ্বৈরথের ইতিহাস
ইন্ডিয়ান সুপার লিগে গত তিন মরশুমে দুই দল মুখোমুখি হয়েছে মোট সাত বার। তার মধ্যে পাঁচবারই জিতেছে কলকাতার দল। একটি ম্যাচ ড্র হয়। কেরালা ব্লাস্টার্স চলতি মরশুমেই প্রথম দেখায় প্রথম হারায় সবুজ-মেরুন বাহিনীকে। দুই দলের দ্বৈরথে ১৭ গোল করেছ মোহনবাগান ও দশ গোল করেছে ব্লাস্টার্স। ২০-২১ মরশুমে প্রথম ম্যাচে ১-০ ও দ্বিতীয় ম্যাচে ৩-২-এ জেতে এটিকে মোহনবাগান। ২১-২২ মরশুমে প্রথমে ৪-২-এ জেতে সবুজ-মেরুন বাহিনী ও পরের বার ২-২ হয়। গত মরশুমের প্রথম লেগে ৫-২-এ জেতে কলকাতার দল। দিমিত্রিয়স পেট্রাটস হ্যাটট্রিক করেন। দ্বিতীয় লেগে ২-১-এ আবার জেতে কলকাতার দল।
ম্যাচ- কেরালা ব্লাস্টার্স এফসি বনাম মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট
ভেনু- জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম, কোচি
সময়- ১৩ মার্চ, ২০২৩, সন্ধ্যা ৭.৩০
সরাসরি সম্প্রচার ও স্ট্রিমিং
টিভি চ্যানেল: ডিডি বাংলা ও কালার্স বাংলা সিনেমা- বাংলা, স্পোর্টস ১৮ খেল- হিন্দি, স্পোর্টস ১৮ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ, ভিএইচ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ
(লেখা আইএসএল ওয়েবসাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
