অলস্পোর্ট ডেস্ক: নাটকীয়ভাবে অনেক বিতর্কের মাঝে মরক্কোকে আফ্রিকান নেশনস কাপের ফাইনালে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হল সাদিও মানের সেনেগাল। ম্যাচের শেষদিকে গোল বাতিল করায় এমনিতেই রেগেছিলেন সেনেগালের কোচ পাপে থিয়াও। তারপর রেফারি মরক্কোর অনুকূলে পেনাল্টি দিলে তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েন। মাঠ থেকে দল তুলে নিয়ে সাজঘরে চলে যান। কোচকে শান্ত করে সতীর্থ ফুটবলারদের মাঠে ফেরান সেনেগালের সর্বকালের সেরা ফুটবলার সাদিও মানে। অনেকটা সময় খেলা বন্ধ থাকার পর মরক্কোর ফুটবলারদের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটেছিল সম্ভবত। মরক্কোর ব্রাহিম দিয়াজ পেনাল্টি মারতে আসেন। তাঁর পানেনকা পেনাল্টি রুখে দেন সেনেগাল গোলকিপার। তাতেই মানসিকভাবে লড়াই করার শক্তি হারান মরক্কোর ফুটবলাররা। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত সময়ে চতুর্থ মিনিটে গোল করে পাপে গুয়ে সেনেগালকে ট্রফি জয়ের স্বাদ পাইয়ে দেন।
গন্ডগোলের শুরু রেফারি জাঁ জ্যাকস এনডালা নির্ধারিত সময়ের পর ২ মিনিটের সংযুক্তি সময়ে ফাউলের কারণ দেখিয়ে সেনেগালের ইসলামিয়া সারের হেডের গোল বাতিল করলে। সেনেগাল কোচ থিয়াও তখন থেকেই ফুঁসছিলেন। তাঁর মতে, রেফারি ন্যায্য গোল বাতিল করেছেন। থিয়াওয়ের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে সংযুক্তি সময়ের শেষ ও ৮ মিনিটের মাথায় দিয়াজকে বক্সের মাঝে মালিক দিওফের ফাউল করার অপরাধে রেফারি মরক্কোর অনুকূলে পেনাল্টির নির্দেশ দিলে। ৪ মিনিট পেনাল্টি দেওয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করার পর সেনেগাল ফুটবলারদের নিয়ে মাঠ ছাড়েন থিয়াও। দল নিয়ে চলে যান সাজঘরে।
এই ঘটনার ফলে প্রিন্স মোউলে আবদাল্লা স্টেডিয়ামে একটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। সংগঠক থেকে দর্শক, কেউই বুঝে উঠতে পারছিলেন না, খেলাটা আদৌ শেষ হবে কিনা? আশঙ্কা ছিল শেষপর্যন্ত সেনেগাল মাঠে না ফিরলে মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে দেওয়ার। আফ্রিকান ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারাও ধাঁধায় পড়েছিলেন, ঠিক কী করা উচিত সেটা ভেবে। সময় যখন বয়ে যাচ্ছিল, তখন আসরে নামেন সাদিও মানে। তিনি যে শুধু সেনেগালের সেরা ফুটবলার নন,সারা বিশ্বের চোখে একজন প্রকৃত সম্মানীয় খেলোয়াড়, তা বুঝিয়ে দেন তাঁর ভূমিকায়। কোচ ও ফুটবলারদের খেলতে রাজি করিয়ে মাঠে ফেরান সাদিও মানে সংযুক্তি সময়ের ২০ মিনিটে। সেনেগাল সমর্থকদেরও শান্ত করে গোটা মাঠ ঘুরে।
মনে হয়েছিল এই সময় পেনাল্টি থেকে মরক্কো গোল করলে , তাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত। কারণ তারপর তো খেলার কোনও সময় বাকি থাকত না। শেষ বাঁশি বেজে যেত। কিন্তু ফুটবলার দেবতার মনে অন্য ভাবনা ছিল। সাদিও মানের মতো একজন ফুটবলের সত্যিকারের পূজারীর প্রতি তিনি যে নির্দয় হতে পারেন না। তাই মাঠের পরিবেশ শান্ত হলে পেনাল্টি কিক নিতে আসেন ব্রাহিম দিয়াজ সংযুক্তি সময়ের ২৪ মিনিটে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে টুর্নামেন্টে ৫ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে শেষ করা দিয়াজের পানেনকা কিক রুখে দেন সেনেগালের গোলকিপার এডুয়ার্ড মেন্ডি। দিয়াজের ওই মূল্যবান মিসটা ৫০ বছরে প্রথমবার কোনও কন্টিনেন্টাল ট্রফি জয় হাতছাড়া করল মরক্কোর। এমন একটা মিস দিয়াজকে সারাজীবন দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে বেড়াবে। সেনেগালের কাছে হারের পর তাই ম্যাচ শেষে দিয়াজ এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন, তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েও স্বাভাবিক করতে পারেননি সতীর্থরা।
দিয়াজের ওই পেনাল্টি মিসের পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেনেগাল তখন পুনর্জীবন পেয়ে তুমুল উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়ে মরক্কোর ওপর। ৯৪ মিনিটে সুফলও মেলে। পেছন থেকে ধেয়ে আসা বল ধরে পাপে গুয়ে বাঁপায়ের জোরালো শটে মরক্কোর গোলকিপার বানাওকে হার মানান। ওই গোলেই ম্যাচের ফল নির্ধারণ হয়ে যায়। পেনাল্টি নষ্টের কারণে মরক্কো এতটাই হতোদ্যম হয়ে পড়িছিল,তারা আর লড়াইয়ে ফিরতে পারেনি।
এমনটা ফাইনাল যেমন বিতর্কের জন্য চিহ্নিত হয়ে থাকবে, তেমন ফুটবল দুনিয়া স্মরণ করবে ও কুর্নিশ জানাবে সাদিও মানেকে। যেভাবে সেনেগালের কোচ-ফুটবলারদের তিনি সাজঘর থেকে ফিরিয়ে আনেন মাঠে ফাইনাল শেষ করার জন্য, তার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। সাদিও মানে সত্যিকারের আফ্রিকান ফুটবলের মূল্যবান হীরে। এই কারণে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্ন ইনফান্তিনো যখন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি সাদিও মানের হাতে তুলে দেন, তখন হারের বেদনার মাঝেও মরক্কোর কোচ, ফুটবলার ও গ্যালারিতে থাকা দর্শকরা তুমুল হাততালি দেন। আসলে সাদিও মানের জন্যই তো আফ্রিকান ফুটবল কলঙ্কিত হওয়ার থেকে বাঁচল, বিশ্বের চোখে ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখল। বিতর্ককে পিছনে ফেলে জিতল ফুটবল। ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে যা একটা বড় দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
