অলস্পোর্ট ডেস্ক: কথায় কথায় ম্যাচ ওয়াকওভার দেওয়াটা অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছে কলকাতা প্রিমিয়ার ডিভিশনের দল সাদার্ন সমিতি। তাও আবার বেছে বেছে বেশ কিছু ম্যাচে। এতো একধরনের ‘ম্যাচ ফিক্সিং’এর শামিল। এটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিনা, তা খোঁজার বা তদন্ত করার ভার রাজ্য ফুটবলের নিয়ামক সংস্থার আইএফএর নেওয়া উচিত।
অতীতেও দেখা গেছে, কলকাতা ফুটবল লিগের শেষদিকে সাদার্ন সমিতি মাঠে দল নামাতে পারেনি। তার কারণ হিসেবে নানা যুক্তি পেশ করতে ছাড়েনি। অতীতে যদিও বা সেটা ততটা দৃষ্টিকটূ লাগেনি, এখন লাগছে, তার কারণ এই দলের কর্ণধার সৌরভ পাল আইএফএর গুরুত্বপূর্ণ সহসভাপতি পদে রয়েছেন বলে। ওয়াকওভার দেওয়টাই যদি অভ্যাস হয়, তাহলে মরশুমের শুরুতে ঘটা করে দল গড়ার দরকারই বা কী, আর নামকে ওয়াস্তে মাঠে নেমে শুরুর দিকে ম্যাচ খেলার প্রয়োজন কী? এটা কি সহসভাপতি পদে বসে থাকা এক কর্তার পক্ষে এই আচরণ শোভা পায়, বা মেনে নেওয়া যায়?
এখন সাদার্ন সমিতির কর্তা বা কলকাতা ফুটবলপ্রেমীরা মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের দিকে মেসারার্স ম্যাচ না খেলে ওয়াকওভার দেওয়ার জন্য আঙুল তুলতেই পারেন। ডুরান্ড কাপে অংশগ্রহণের জন্য মোহনবাগানের দল না নামানোর বিষয়টি নিঃসন্দেহে সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ সবুজ মেরুনের টিম ম্যানেজমেন্ট যতই বলুক, ডুরান্ডের খেলা থাকায় তাদের হাতে কলকাতা লিগে খেলানোর মতো যুব ফুটবলার কম পড়িয়াছিল, সেটা মানা যায় না। ২ পয়েন্ট পকেটে থাকা মেসারার্সের বিরুদ্ধে খেলার মতো ফুটবলার মোহনবাগানের হাতে ছিল না, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এটা একধরনের অসহযোগিতা ছাড়া কিছু নয়। তার জন্য শাস্তিও পেতে হয়েছে সবুজ মেরুনকে। কাটা গেছে পয়েন্ট।
তবে এখানে সাদার্ন সমিতির দেওয়া ওয়াকওভারের সঙ্গে মোহনবাগানের মেসারার্স ম্যাচে দল না নামানোর মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। মোহনবাগান ওই ম্যাচ না খেলে নিজের পায়ে কুড়ুল মেরেছে ইগো বজায় রাখতে গিয়ে। আইএফএর সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে নিজেদের ক্ষতি করে সুপার সিক্সে যেতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা, মেসারার্স ম্যাচ না খেললেও তারা বাকি থাকা ম্যাচ ওয়াকওভার দেয়নি। পরের ম্যাচে দল নামায় ডুরান্ডের কোয়ার্টারফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের কাছে হারের পর।
কিন্তু শূণ্য পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকা সাদার্ন সমিতির পরপর ২ ম্যাচ ওয়াকওভার দেওয়ার পেছনে একটা অন্য অঙ্ক থাকতে পারে বলেই মনে হয়েছে। প্রাথমিক পর্বের লিগের গ্রুপ পর্যায়ের নিজেদের শেষ খেলায় ডায়মন্ড হারবার এফসির বিরুদ্ধে দল নামায়নি সাদার্ন সমিতি। এতে তো লাভই হয়েছে ডায়মন্ড হারবার এফসি। ওই ম্যাচের আগে পর্যন্ত ডায়মন্ড হারবারের সুপার সিক্সে যাওয়া নিশ্চিত ছিল না। সাদার্ন ওয়াকওভার দেওয়ায় ৩ পয়েন্ট পেয়ে ডায়মন্ডের সুপার সিক্সে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, অবনমন পর্বের প্রথম ম্যাচেও মহমেডানের বিরুদ্ধে দল নামায়নি সাদার্ন। এতে মহমেডানও ৩ পয়েন্ট পাওয়ার সুবাদে অবনমন বাঁচিয়ে ফেলেছে। এই দুটি দলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কি সাদার্ন নিয়েছিল বিশেষ কোনও কারণে, ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রতিবাদের আড়ালে? ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত ক্লাব, ফুটবল বা কর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের ভিত্তিতে কড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দায় যেমন আইএফএ এড়াতে পারে না, তেমন সাদার্ন সমিতির এহেন আচরণও সন্দেহের উর্ধে নয়। কলকাতা ফুটবলে মাঠের খেলার পাশাপাশি রাজনীতির খেলাও ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছে প্রবলভাবে।
কেন পরপর ওয়াকওভার দিল সাদার্ন শেষ দুটি ম্যাচে? আইএফএকে চিঠি দিয়ে সাদার্নের কর্ণধার সৌরভ পাল লিখেছেন, এটা কলকাতা লিগ জুড়ে ব্যাপক গড়াপেটা বা ম্যাচ ফিক্সিং চলার প্রতিবাদে। তিনি বারবার আইএফএর কাছে ম্যাচ ফিক্সিং সংক্রান্ত তথ্য জোগান দিলেও, রাজ্য ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা কোনও সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চালায়নি। এমনকি তাঁদের ক্লাবের তরফে কুন্তল চক্রবর্তী আইএফএতে গিয়ে একাধিক প্রমাণ দাখিলের পরেও। তাই যতক্ষণ না কলকাতা ফুটবল লিগ ঘিরে হওয়া ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঠিক তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দেওয়া না হচ্ছে, ততদিন তারা আর কোনও ম্যাচ খেলবে না। শুধু তাই নয়, চ্যাম্পিয়নশিপ ও অবনমন পর্যায়ের সব ম্যাচ বন্ধ রাখুক আইএফএ।
এটাই দুর্বোধ্য, ম্যাচ ফিক্সিংয়ের তদন্ত দাবির সঙ্গে কলকাতা ফুটবল লিগের চ্যাম্পিয়নশিপ রাউন্ড ও অবনমন পর্যায়ের সব ম্যাচ বন্ধ রাখতে হবে কেন? আর সেটা মনে হল একবারে শেষদিকে এসে। বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবারের বিরুদ্ধে গ্রুপ পর্যায়ের শেষ ম্যাচ খেলার আগে। আর অবনমন পর্যায়ে মহমেডান ম্যাচের আগে। প্রতিবাদে ওয়াকওভার দেওয়া শুরু করাটা আরও আগেই করে ফেলা যেতে পারত। এখন শেষ পর্যায়ে এসে বিপ্লব দেখিয়ে লিগ বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে কলকাতা ফুটবলকে স্তব্ধ করে দেওয়াটা মেনে নেওয়া যায় না। আসলে সাদার্ন জানে কলকাতা লিগের শেষপর্বের খেলা বন্ধ রাখতে পারলে, তাদের অবনমনটাও বেঁচে যাবে। তাই ম্যাচ ফিক্সিংয়ে প্রতিবাদের তাস খেলা। আর যদি মনেই হয়, আইএফএ কিছু করছে না, তাহলে সহসভাপতি পদ থেকে সরে এলেই হয়। তাহলে প্রতিবাদটা তো আরও জোরালো হবে।
বিশেষ করে যখন আইএফএর তরফে আগেই আশ্বাস দেওয়া হয়, ম্যাচ ফিক্সিংয়ের যাবতীয় অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একটি তদন্ত কমিটিও আইএফএ গড়ছে। যাতে সাদার্ন কর্তা সৌরভ পালকে থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল আইএফএ। কিন্তু সৌরভ সাদার্নের ও আইএফএর পদাধিকারী হিসেবে থাকার কথা তুলে স্বার্থের সংঘাতের যুক্তি দেখিয়ে সেই কমিটিতে থাকতে চাননি। তারপরও আইএফএ সৌরভের পাঠানো প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে, তদন্ত চালাচ্ছে। এমনকি লালবাজারে ম্যাচ ফিক্সিং সংক্রান্ত অভিযোগগুলি পেশ করেছে, তদন্ত চালানোর জন্য। তাই আইএফএ যে হাত পা গুটিয়ে বসে আছে, এমন নয়।
তাই সাদার্ন সমিতি ওয়াকওভার দেওয়া, ম্যাচ না খেলার পিছনে যে যুক্তি দেখাক না কেন, সেটা তদন্তসাপেক্ষ। সেই তদন্ত চলবে। অতীতে এমন দৃষ্টান্ত অনেক আছে। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় শাস্তি পেয়েছে ক্লাব, ফুটবল, বা কর্তারা। কিন্তু তার জন্য কলকাতা ফুটবল লিগ বন্ধ থাকেনি। এবারও তাই কলকাতা ফুটবল লিগ বন্ধ রাখার দাবিটা অযৌক্তিক। আর সেই দাবিতে ম্যাচ ওয়াকওভার দেওয়াটাও। বিশেষ করে যাদের ওই ওয়াকওভার দেওয়াটা একটা রোগ।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
