মুনাল চট্টোপাধ্যায়: চিরকাল মানুষটাকে শুধু হাসতে দেখেছি। অন্যদের হাসাতে দেখেছি মজার কথা বলে। সেই মানুষটাই মোহনবাগান দিবসের মঞ্চে রত্ন সম্মান প্রাপ্তির পরই নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। তিনি আর কেউ নন মোহনবাগান প্রাক্তন সভাপতি স্বপন সাধন(টুটু) বসু। নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে নিজের ছেলে সচিব সৃঞ্জয় বসু ও বর্তমান সভাপতি দেবাশিস দত্তর হাত থেকে মোহনবাগান রত্ন পেয়ে আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তাঁর কান্না ছুঁয়ে যায় ইন্ডোরে উপস্থিত মোহনবাগান জনতাকেও।
তবে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে চেনা মেজাজে ফেরেন টুটু বসু। শরীর অশক্ত। তাই হুইলচেয়ারে হাজির হয়েছিলেন মঞ্চে। বিশিষ্ট অতিথিদের মাঝে ঘোষকের হাত থেকে মাইক নিয়ে টুটু আগের মতোই হুঙ্কার ছাড়লেন, এদিনটা আমার। ১০ মিনিট আমি টানা কথা বলব। এই সময় আমাকে কেউ কোনও কথা বলবে না। সদস্য-সমর্থকদের জন্য কিচু কথা আমি বলব আজ। রত্ন সম্মানের কথা ঘোষণা পাওয়ার পর অনেকেই আমার কাছে জানতে চেয়েছিল কেমন লাগছে? ছেলেবেলায় কেউ ভাল কিছু করলে, তার মধ্যে খানিকটা দেমাক দেখতাম। দেখে মনে হত সে বোধহয় চাঁদ পেয়েছে। আজ আমার মনে হচ্ছে, হাতে চাঁদ পেয়েছি। কিছু প্রাপ্তির আশায় কখনও ক্লাব করিনি। মোহনবাগান আমার কাছে একটা ঐতিহ্য,আবেগ, ভালবাসার জায়গা। চেষ্টা করেছি সবসময় ক্লাবের সুনামটা যেন বজায় থাকে একজন একনিষ্ঠ সেবক হিসেবে। সাফল্যের ঝুলিটা ভরে ওঠে। তার জন্য আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি কখনও সচিব, কখনও সভাপতি পদে থেকে। ক্লাবের সুদিনে ও বিপদে পাশে থেকেছি। মোহনবাগান রত্ন সেখানে আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি। ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন প্রাপ্তির থেকেও। অসংখ্য সবুজ মেরুন সদস্য ও সমর্থকদের শুভেচ্ছা, প্রেরণা ছাড়া আজ এই জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব ছিল না।’
এমন একটা দিনে টুটু বসুর খুব মনে পড়ছে অভিন্ন হৃদয় বন্ধু অঞ্জন মিত্রর কথা। একইসঙ্গে প্রয়াত স্ত্রীর কথাও। মাইক হাতে টুটুর মুখে উঠে এল তাঁদের মিস করার বেদনাটা। বললেন,‘ অঞ্জনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ১১ বছর বয়স থেকে। তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। হাওড়ায় লঞ্চ পেরিয়ে আমি আর অঞ্জন খেলা দেখতে আসতাম হাত ধরাধরি করে। গোলপোস্টের পেছন দিকের গ্যালারিতে বসতাম। ওই জায়গাটা মূলত কারবালা লেনের সমর্থকদের দখলে থাকত। একজন সমর্থকের কথা মনে আছে। মোহনবাগান গোল করলে বা জিতলে গ্যালারিতে বাঁই বাঁই করে ছাতা ঘোরাতেন মাথার ওপর। ড্র করলে বা হারলে মুষড়ে পড়তেন। ইস্টবেঙ্গলের কাছে হারলে মনে হত প্রিয়জনকে খুইয়েছেন। নাওয়া খাওয়া ভুলে যেতেন। অসুস্থ হয়ে পড়তেন। আর একটা ব্যাপার ছোটবেলা থেকে খুব কষ্ট দিত। সেটা হল, দেখতাম ফুটবলার তোলায় ইস্টবেঙ্গল বারবার মোহনবাগানকে টেক্কা দেয়। আর তার জোরে কথায় কথায় হারিয়ে দেয়, এটা সহ্য হত না। আমি আর অঞ্জন মনে মনে ঠিক করেছিলাম, কোনওদিন যদি ক্লাব প্রশাসনে ক্ষমতায় আসি , তাহলে এই অবস্থাটা বদলাতে হবে। পরবর্তী সময়ে আমি মোহনবাগান সচিব হই। পরে আমি সভাপতি পদে বসলে অঞ্জন সচিব হয়। দু’জনে মিলে ক্লাবে এক বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। বন্ধুর মধ্যে ভাব, ভালবাসা, ঝগড়া, অভিমান সবকিছুই হয়। মাঝে অল্পদিনের ভুলবোঝাবুঝি হয়েছিল অঞ্জনের সঙ্গে অন্যদের কারণে। তবে সেটা মিটতে দেরি হয়নি। অঞ্জনের সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধনটা ছিল খুব স্ট্রং। অনেক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছি দু্’জনে মিলে। যে স্বপ্নগুলো দেখতাম, সেগুলো বাস্তবায়িত করতে পারার একটা তৃপ্তিসুখ পেয়েছি। আমার মতো মোহনবাগানে অঞ্জনের অবদান অনেক। তাই আমার একবছর পরে হলেও অঞ্জনের মোহনবাগান রত্ন প্রাপ্তিতে খুব খুশি। এত তাড়াতাড়ি ও আমাকে ছেড়ে চলে যাবে ভাবিনি। ওকে খুব মিস করি। আজ আমার স্ত্রী বেঁচে থাকলে, খুব খুশি হত। মোহনবাগানের সেবা করার পিছনে তার আত্মত্যাগ কম কিছু নয়।’
টুটু বসু থামার মুডে ছিলেন না মঞ্চে মাইক হাতে। বলেই চলেন, ‘ মোহনবাগান সচিব ও সভাপতি পদে থাকাকালীন অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। মোহনবাগানে বিদেশি ফুটবলার খেলানোর চল ছিল না। কিন্তু আমি বুঝেছিলাম, ভারতীয় ক্লাব ফুটবলে বিদেশিরাই পার্থক্য গড়ে দিচ্ছে। আমরা সেখানে বারবার অন্যদের কাছে মার খাচ্ছি। বিশেষ করে ইস্টবেঙ্গল। আমি সিদ্ধান্ত নি ওদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে পুরোন প্রথা ভেঙে ক্লাবে বিদেশি ফুটবলার নিতেই হবে। অঞ্জনকে বলেছিলাম, ওসব পুরোন ট্র্যাডিশন মন থেকে ঝেড়ে ফেল। বিদেশি আমরা খেলাবই। প্রথমবার চিমাকে টার্গেট করেও পাইনি। পরেরবার সফল হই। চিমার স্ত্রী ক্যাথিকে রাজি করাতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। তারপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আজ প্রমাণিত বিদেশি ছাড়া বড় সাফল্য মেলা ভার। দলবদলে ফুটবলার ছিনিয়ে নেওয়ায় ইস্টবেঙ্গলের মৌরসি পাট্টায় আঘাত হানা ছিল আর একটা বড় কাজ। আগেই বলেছি, বারবার ইস্টবেঙ্গলের কাছে হার আর ফুটবলার তুলে নেওয়ার ব্যাপারে পিছিয়ে থাকার বিষয়টা মাথায় ছিল। কৃশানু-বিকাশ জুটিকে ইস্টবেঙ্গলের গ্রাস থেকে ছিনিয়ে নিজের ডেরায় নিয়ে এসে সই করিয়ে দারুন আনন্দ পেয়েছিলাম। আবার চিমাকে আমি এনে ইস্টবেঙ্গলে খেলার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলাম, বন্ধু প্রণব দাশগুপ্তর অনুরোধে।’
টুটু বললেন,‘ আরও একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হল ক্লাবের জন্য স্পনসর ঠিক করা। ব্যক্তিগত অর্থে ক্লাব চালানো সবসময় কঠিন ছিল। তাতে কাজ চলে যায়, কিন্তু ভাল দল গড়া, বা পরিকাঠামোগত উন্নতি সম্ভব নয়। তাই স্পনসরের খোঁজে ছিলাম অনেকদিন ধরেই। একদিন হঠাৎ জানতে পারলাম, বিজয় মালিয়ার কিংফিশার ব্র্যান্ডের সঙ্গে ইস্টবেঙ্গলের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি হচ্ছে। এটা জেনেই নড়েচড়ে বসলাম। ইস্টবেঙ্গল মোটা টাকার স্পনসর পেয়ে যাবে, আর আমি থাকতে মোহনবাগান বঞ্চিত হবে? সেটা হয় নাকি। তখন ‘এশিয়ান এজ’ সংবাদপত্র প্রকাশে আমার পার্টনার ছিল বিজয় মালিয়া। আমি ছিলাম হাজারিবাগে। বিজয় মালিয়া কলকাতায় ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে চুক্তি করতে আসছে শুনেই ট্রেণ ধরে সোজা কলকাতায়। সেখান থেকে একবারে দমদম বিমানবন্দরে হাজির। বিজয় মালিয়া চার্টার্ড প্লেনে কলকাতা বিমানবন্দরে নামতেই আমি ওকে ধরি। বলি, আমার কাগজের অংশীদার তুমি। ইস্টবেঙ্গলকে স্পনসর করলে আমাদের সমান টাকার স্পনসরশিপ দিতে হবে। নইলে ছাড়ব না। পরে ইস্টবেঙ্গলের প্রণব দাশগুপ্ত যখন মালিয়ার সঙ্গে কথা সেরে বেরুচ্ছে, তখন আমি আবার সেখানে পৌঁছে গিয়েছি। ওরা তো আমাকে দেখে রীতিমতো অবাক। ভাবছে কী ব্যাপার? আমি ভাঙিনি, কেন এসেছি। বরং বলি, আমি কাগজের বিষয়ে জরুরি কিছু কথা বলতে এসেছি। মালিয়া আমাকে বলে গোয়া চলে আসতে। আমি সেটাই করি। গোয়াতে বসে মোহনবাগানের সঙ্গে স্পনসরশিপ চুক্তি হয়। ম্যাকডাওয়েলের সঙ্গে নাম জোড়ে মোহনবাগানের। সেসময় ওই পদক্ষেপ না নিলে ক্লাবের হাল যে কী হত, সেটা আজ সবাই বুঝছে। অথচ সেসময় কম বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়নি। এমনও কথা শুনতে হয়েছিল, ক্লাব নাকি আমরা বেচে দিয়েছি স্পনসরের কাছে। যা একবারেই সত্যি নয়। ক্লাবের সংবিধান এমন যে কেউ চাইলেও বিক্রি করতে পারবে না। সদস্যদের অধিকার কখনও খর্ব হবে না। চার, ইউ বি চলে যাওয়ার পর আবার ক্লাব সমস্যায় পড়েছিল। ইস্টবেঙ্গল ইনভেস্টার পেয়ে যাওয়ায় শুনতে হচ্ছিল, মোহনবাগান কেন পারে না ইনভেস্টার আনতে? আমি তক্কে তক্কে ছিলাম। যেই দেখলাম সঞ্জীব গোয়েঙ্কা রাজি মোহনবাগান ফুটবল দলের হাল ধরতে, আর দেরি করিনি ওর সঙ্গে চুক্তি সেরে ফেলতে। আপাদমস্তক মোহনবাগানী সঞ্জীব গোয়েঙ্কার ফুটবল শুধু নয়, খেলাধুলোর প্রতি একটা আলাদা আবেগ আছে। ওর সময়ে আমাদের ক্লাবের ফুটবলের সাফল্য আকাশ ছুঁয়েছে। আইএসএল শিল্ড ও কাপ জিতেছে। সবচেয়ে বড় কথা, সেরা ফুটবল দল গড়া নিয়ে ক্লাবের আর কোনও চিন্তা নেই, যতদিন সঞ্জীব গোয়েঙ্কা আছে।’
টুটু জানালেন,‘ আর একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নি আমার সময়কালে, সেটা হল সদস্যদের সচিত্র পরিচয়পত্র সঙ্গে নিয়ে কাম কালেক্ট কাস্ট পদ্ধতিতে ভোটাধিকার প্রয়োগ। তার জন্য আমাকে কালো কোট পরে আদালতে লড়তে হয়েছিল। সেকথা এখনকার কতজন জানে। আমি খুশি, এখন আর ব্যালট ছিনতাই করে মোহনবাগানের কার্যকরী কমিটি তৈরি হয় না, হয় ক্লাব সদস্যদের নিজস্ব ভোটাধিকার প্রয়োগে। এটাই গনতন্ত্র।’
মোহনবাগান দিবসের মঞ্চে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস আবেদন রাখেন মোহনবাগান কর্তাদের কাছে, ফুটবল দল ট্রফি জিতলে ট্রফি যেন আগে সরাসরি ক্লাব তাঁবুতে আসে। তারপর যেখানে খুশি যাক। আর মোহনবাগান যে আগামী মরশুম থেকে কন্যাশ্রী কাপে খেলার জন্য মহিলা ফুটবল দল গড়ে ও অংশ নেয়। এনিয়ে টুটু বসুর প্রতিক্রিয়া, ‘ ক্লাবের মাথায় এখন আমার ছেলে সচিব টুম্পাই(সৃঞ্জয়) আর সভাপতি দেবাশিস। আমি বিশ্বাস রাখে ওরা ক্লাবকে আরও উন্নতর জায়গায় নিয়ে যাবে। আর ক্রীড়ামন্ত্রীর ইচ্ছাপূরণ করবে।’
এখানেই শেষ নয়, রত্ন সম্মানের সঙ্গে প্রাপ্ত ১ লাখ চেক নিয়ে রসিকতা করতে ছাড়লেন না টুটু বসু। বললেন, ‘ চেকটা আমার। আমাকে দে। আজ একটা ঘোষণা করছি। বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই। শরীর ভাল নেই। হয়ত পরের মোহনবাগান দিবসে আমি বেঁচে থাকব না। তাই তার আগে দুটো ব্যাপার বলে যেতে চাই। অনেক টাকা খরচ করে মোহনবাগানের ক্যান্টিনাকে আধুনিক রূপ দিয়েছিলাম। আমি মারা গেলে ক্যান্টিনটা যেন আমার নামে উৎসর্গ করা হয়। আর এই ১ লাখ টাকার সঙ্গে আমি আরও চার লাখ টাকা ক্লাবে পাঠিয়ে দেব। পরজন্মে মোহনবাগানের লাইফ মেম্বারশিপ ফি হিসেবে।’ সত্যি এই না হলে টুটু বসু।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
