Cart Total Items (0)

Cart

All Sports
দ্যুতি চাঁদ

সুচরিতা সেন চৌধুরী ○ ভুবনেশ্বর: লড়াইটা কী ভাবে যেন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে তাঁর। একটা ধাক্কা সামলে উঠতে না-উঠতেই নতুন সমস্যা এসে কড়া নেড়েছে দরজায়। আবার লড়াই। আবার ঘুরে দাঁড়ানো। আবার ফিরে আসা জীবনের মূলস্রোতে। কিন্তু না, এখনও স্বস্তি আসেনি। এখনও নিশ্চিন্তে বলতে পারেন না, ‘‘ভাল আছি।’’ শুধু বলেন, ‘‘আসলে লড়াইটাও অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। তবে আমি আশা ছাড়িনি। জানি আবার ঘুরে দাঁড়াব।’’

ঘুরে হয়তো দাঁড়াবেন। কিন্তু সেই চেনা গতি কি আর ফিরে পাবেন তিনি? প্রশ্নটা তাঁর মনেও ভীষণ ভাবে ঘুরছে। তাই হয়তো অকপট তিনি।

কথা বলছি স্প্রিন্টার দ্যুতি চাঁদের সঙ্গে। ভুবনেশ্বরে পৌঁছনোর পর থেকেই বার বার মনে হচ্ছিল কী ভাবে দ্যুতির সঙ্গে দেখা করা যায়। খোঁজ নিয়ে জানলাম, এই শহরেই আপাতত আছেন তিনি। এশিয়ান গেমস শুরু হয়ে গেলেও সেখানে জায়গা হয়নি তাঁর। ডোপ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন যে! সেই সব কথা দ্যুতির মুখ থেকেই শুনব। ফোনটা করেছিলাম এক দিন আগেই। এক কথায় বাড়িতে ডেকে নিলেন। পরের দিন সকালে পৌঁছে গেলাম দ্যুতির বাড়িতে। ঘর জুড়ে বিভিন্ন পদক। কাচের শো-কেসে উজ্জ্বল অর্জুন পুরস্কার।

কষ্ট হয় না?
“হয়। খুব খারাপ লাগে। কিন্তু তার পর ভাবি আমি তো কোনও ভুল করিনি। আমি ভগবানে বিশ্বাস করি। আমার ভগবানই আমাকে শক্তি জোগায়। শুরু হয় লড়াই। নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই। জিতে ফিরে আসি। বার বার ফিরে আসব।”

দ্যুতি চাঁদ মানে এক কথায় বিতর্ক। ১৮ বছর বয়সে পেশাদার অ্যাথলিট হিসাবে নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। জুনিয়র থেকে সিনিয়র— পদক কম জেতেননি। পদক জিততে যা খাটতে হয়েছে, তার থেকে বেশি খাটতে হয়েছে একটার পর একটা অভিযোগ থেকে নিজেকে বার করে আনতে। তার পর আবার শুধু দৌড় আর দৌড়। কিন্তু প্রথম যে অভিযোগ শুনে তাঁর পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছিল, সেই কথা বলতে আজও গলা কেঁপে ওঠে।

হঠাৎ এক দিন জানতে পারলেন, আপনি মেয়ে নন?
“সত্যি বলছি, সে দিন চমকে গিয়েছিলাম, স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। এখন আর এত অবাক হই না। কিন্তু তখন আমার বয়স একদম কম। কিছু একটা পরীক্ষা হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম ডোপ পরীক্ষা। কিন্তু যথন রেজাল্ট এল তখন জানতে পারলাম আমার শরীরে পুরুষ হরমোনের আধিক্য রয়েছে। তাই আমি আর মেয়েদের দলে নাম লেখাতে পারব না। মেয়েদের প্রতিযোগিতায় নামতে পারব না। আমাকে ‘ব্যান’ করে দেওয়া হল। ভেঙে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম সব ছেড়ে দেব। তার পর ভাবলাম, তা হলে তো পালিয়ে যাওয়া হবে। তাই শুরু করলাম লড়াই। আমি আদালতের দ্বারস্থ হলাম। তখন নতুন করে পরীক্ষা হল। তাতে জানা গেল আমার শরীরে যে হরমোন রয়েছে সেটা স্বাভাবিক ভাবেই তৈরি হচ্ছে। কোনও মেডিসিনের জন্য নয়। এবং সেখানে জিতে আবার ফিরি ট্র্যাকে।”

এই একই সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে বাংলার অ্যাথলিট পিঙ্কি প্রামাণিককেও। তবে তিনি আর ফিরতে পারেননি স্বমহিমায়। সরে গিয়েছেন ট্র্যাক থেকে। বদলে গিয়েছে জীবন। বেছে নিয়েছেন অন্য পেশা। কিন্তু দ্যুতি আজও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে। ভুল অভিযোগে যে এশিয়ান গেমস থেকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল তাঁকে, চার বছর পর স্বমহিমায় ফিরে সেই এশিয়ান গেমসেই রুপো জয়। অদম্য একটা জেদ সেদিন কাজ করেছিল।

কী ভাবে এই অসাধ্যসাধন?
“আমার বদনামটা মেনে নিতে পারিনি। সবাই আমার বিরুদ্ধে বলছিল, লিখছিল। তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, এই মামলা আমি জিতবই। আর এ জন্য যে এশিয়ান গেমস থেকে আমাকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, চার বছর পর আবার সেই এশিয়ান গেমসেই আমি পদক জিতব। সেই সময় মামলা লড়ছিলাম। পাশাপাশি, ট্র্যাকেও লড়ছিলাম। প্রচুর খেটেছিলাম। ৬-৭ ঘণ্টা প্রতি দিন ট্রেনিং করতাম। তার ফল পেয়েছি। ২০১৮ এশিয়ান গেমসে ১০০ ও ২০০ মিটারে রুপো পেয়েছি। ১০০ মিটারে পয়েন্ট ওয়ান ব্যবধানের জন্য সোনা মিস হয়ে গিয়েছিল। আমার জীবনের সেরা রেস ছিল সেটা।”

সব ঠিক হয়ে গিয়েছে— ভাবতে ভাবতে আবার নতুন বিপদ চলে আসে সামনে। তাঁর জীবনের সঙ্গে সঙ্গেই চলে সমস্যা। নিজে মুখেই সেটা বলেন। ওটা তো তাঁর সঙ্গী। তবে যাঁকে বেছে নিয়েছেন জীবনসঙ্গী হিসেবে তা নিয়েও কম জলঘোলা হয়নি। সেই জল অনেক দূর গড়িয়েছিল। সমাজ, পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু— সবাই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল বিরুদ্ধে। কিন্তু বিচলিত হননি, ভয় পাননি একটুও। বরং সাহসী দ্যুতির সাহসটা তখন যেন দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। চিৎকার করে নিজের ভাললাগা, ভালবাসার কথা জানিয়েছিলেন। যাঁর কথা বলছেন সেই মোনালিসার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছবি টাঙানো রয়েছে তাঁর বাড়ির দেওয়ালে। নতুন সমস্যা থেকে বেরিয়ে এলেই ঘর বাঁধবেন দু’জনে।

মোনালিসার সঙ্গে কবে ঘর বাঁধছেন?
“খুব দ্রুত। সম্প্রতি যে সমস্যাটা নতুন করে দেখা দিয়েছে সেটা থেকে বেরিয়ে এলেই। আশা করছি, ২০২৪-এ আমরা বিয়ে করব। এত সহজে বলছি ঠিকই কিন্তু এটাও ছিল অন্য লড়াই। তবে ভয় পাইনি। বিশ্বাস করুন। বরং স্পষ্ট করে সবাইকে নিজের মনের কথা জানিয়েছি। আমার পরিবারের মেনে নিতে সমস্যা হয়েছে। আমার পাড়া, প্রতিবেশী কেউ মেনে নেয়নি। অদ্ভুত চোখে দেখত সবাই। ভয়ে, লজ্জায় কেউ বলতে চায় না। আমি ব্যতিক্রম নই। আমার মতো প্রচুর মানুষ আছেন। সমাজের ভয়ে স্বীকার করতে পারেন না। বিভিন্ন দেশে এটা খুব স্বাভাবিক। আমাদের দেশে এখনও নয়। আইন আসার পর আমার মনে হল এ বার সবাইকে বলা যায়।”

২০১৯-এ এই খবর সামনে এনে চমকে দিয়েছিলেন দ্যুতি। যিনি ঘর বাঁধতে চান মোনালিসার সঙ্গে। জাজপুরের গ্রামে পড়াশোনা শেষ করে দ্যুতির অপেক্ষায় রয়েছেন মোনালিসা। এখন শুধু নির্বাসন ওঠার অপেক্ষা। তার পরই চার হাত এক হয়ে যাবে। এখন পরিবার মেনে নিয়েছে। তাঁদের বোঝাতেও অনেকটা লড়াই দিতে হয়েছে।

২০১৮-র পর সবটা ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আবার নির্বাসন?
“ডোপ পরীক্ষা হয়েছিল। তাতে আমি ফেল করি। দু’বারই পরীক্ষায় আমার নমুনায় অবৈধ সাবস্টেন্স পাওয়া যায়। কিন্তু আমি তেমন কিছুই করিনি। কী ভাবে এল বুঝতেই পারছিলাম না। চার বছরের জন্য আমাকে নির্বাসিত করা হয়েছে। আমি নিজের লড়াই আবার লড়তে শুরু করেছি। আশা করছি নির্বাসন কমিয়ে দেবে। ইতিমধ্যেই এক বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ফেলেছি। আমি নাডাকে সব ধরনের প্রমাণ দিয়েছি। ওদের কাছেও প্রমাণ হয়ে গিয়েছে আমার নমুনায় কোথা থেকে অবৈধ সাবস্টেন্স এসেছে। আবার সামনে শুনানি আছে, তার উপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।”

এই মুহূর্তে নির্বাসিত দ্যুতি চাঁদ। দেশের অ্যাথলিটরা যখন চিনের হ্যাংঝৌতে প্রতিযোগিতার আসরে নামছেন, তখন ভুবনেশ্বরে নিজের বাড়িতে নির্বাসন ওঠার অপেক্ষায় দ্যুতি। তবে হয়তো আর ফিরবেন না খেলায়। বয়স বেড়েছে। এত দিন বসে থাকার পর আবার সেই স্পিড ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি ভেবেছেন অ্যাকাডেমি খুলবেন ভুবনেশ্বরে। আপাতত ওড়িশা সরকারের চাকরিটাই সম্বল। ডোপিং ব্যানের জন্য চলে গিয়েছে স্পনসর। তাই নির্বাসন উঠে গেলেও অবসর নিয়ে নিতে চান দ্যুতি তৈরি করতে চান পরবর্তী প্রজন্মকে। নতুন পথে হাঁটার অপেক্ষাতেই রয়েছেন তিনি।

হঠাৎ জানতে পারলেন শরীরে ক্যানসার বাসা বেঁধেছে?
“এটাই তো সব বদলে দিল। তল পেটে একটা ব্যথা খুব কষ্ট দিচ্ছিল। বসে থাকলে হচ্ছিল না। দৌড়তে গেলেই লাগছিল। তখন সবে কমনওয়েলথ গেমস থেকে ফিরেছি। ডাক্তারকে দেখালাম। অনেক পরীক্ষা হল। শেষ পর্যন্ত এমআরআই-তে ধরা পড়ল। ডাক্তার বললেন, ক্যানসারের প্রথম স্টেজ। তাই আমাকে খেলা ছেড়ে দিয়ে বিশ্রামে থাকতে হবে। কারণ, এই সমস্যায় খেললে সেটা বেড়ে যাবে। একটা সমস্যা যে এভাবে সত্যিই আমার জীবন থেকে খেলা কেড়ে নেবে ভাবিনি। ওষুধ খাচ্ছিলাম। আমি খাওয়ার আগে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই ওষুধে কোনও সমস্যা হবে কি না। ডাক্তার বলেছিলেন, এটা একদম ন্যাচারাল মেডিসিন। কিন্তু সেই ওষুধই আমাকে ডোপ পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দিল। তবে ব্যথা কমেছে। কারণ, এখন খেলছি না। সেটাও একটা কারণ।”

ক্যানসারের খবর যতটা না তাঁকে ভেঙে দিয়েছিল তার থেকে অনেক বেশি এই ডোপ নির্বাসন। এখন জানেনই না, তাঁর শারীরিক অসুস্থতা কোন পর্যায়ে রয়েছে। নতুন করে আর টেস্ট করাননি। আসলে পুরো মনটাই পড়ে রয়েছে নির্বাসনে। ছটফট করছেন সেটা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। এই ক্যানসারের জন্যই এত সমস্যা। তাই নির্বাসন উঠলেই আবার নতুন করে পরীক্ষা করাবেন। তবে প্রমাণ করে দিয়েছেন, তাঁর শরীরে যে নিষিদ্ধ ওষুধ পাওয়া গিয়েছে তা তাঁর ক্যানসার চিকিৎসার জন্যই ব্যবহার করা হয়েছিল। তাই তাঁর আশা, নির্বাসন উঠে যাবে দ্রুত। আর তার পরই ভালবাসার ঘর বাঁধবেন। সঙ্গে গড়বেন সেই ঘর, যেখান থেকে উঠে আসবে আরও অনেক দ্যুতি। এখন এই স্বপ্ন দেখেন ২৬ বছরের তরুণী।

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *