Cart Total Items (0)

Cart

All Sports India

মুনাল চট্টোপাধ্যায়:‌ এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী দেবাশিস বিশ্বাসের কথা সকলেরই জানা। এখনও পর্যন্ত অর্থাৎ ২০২৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪৬টা পর্বত অভিযানে অংশ নিয়েছেন দেবাশিস। তার মধ্যে ৮ হাজারের ওপর শৃঙ্গ জয় যেমন আছে, তেমন তার নীচে অসংখ্য ছোট বড় দুর্গম শৃঙ্গ আরোহনের কৃতিত্ব রয়েছে দেবাশিসের। সদ্য লাদাখের চ্যাংথাং অঞ্চলের সাড়ে ৫ হাজার মিটারের ওপর উচ্চতার কোরজোক ফু ‌অভিযানে গিয়েছিলেন তিনি। পর্বতারোহনের পাশাপাশি ওই অঞ্চলের মাটি, জল, আবহাওয়া নিয়ে গবেষণার স্বার্থে। সেখানে পৌঁছে দেবাশিস ৬ হাজার মিটার উচ্চতার একটি অনামী পর্বত শৃঙ্গে আরোহন করেন। আর সেই শৃঙ্গটি গত বছর নৃশংসভাবে খুন হয়ে যাওয়া মহিলা ডাক্তারের নামে উৎসর্গ করেছেন দেবাশিস ‘‌ অভয়া’‌ নামকরণের মাধ্যমে।

কোরজোক ফু ‌অঞ্চলের মাটি, জল, বাতাস, গ্লেসিয়ার নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে পর্বতারোহী ও গবেষক মিলিয়ে ১১ সদস্যের দল নিয়ে দেবাশিসরা কলকাতা থেকে রওনা হয়েছিলেন ২৬ জুলাই। দেবাশিসের নিজের ভাষায়, ‘‌ আমরা কোরজোক গ্রামের সোমোরিরি হ্রদের জায়গাটা পছন্দ করেছিলাম, কারণ এখানে অনেকগুলো শৃঙ্গ আরোহনের যেমন সুযোগ পাব, তেমন একটা বড় হ্রদ, উপত্যকা, ও পাহাড়ি অধিবাসীদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগও হবে, গবেষণার কাজ চালানোর সঙ্গে সঙ্গে। আর একইসঙ্গে আমার একটা নিজস্ব ভাবনা ছিল, কোরজোক ফু-‌তে অনেকগুলো অনামী শৃঙ্গ আছে, তার একটায় আরোহন করে গত বছর ৯ আগস্ট খুন হয়ে যাওয়া হতভাগ্য মহিলা ডাক্তারের নামে সেই শৃঙ্গটার নামকরণ করার। ‘‌অভয়া’‌ নাম রাখার ইচ্ছা নিয়ে। সেইমতো কোরজোক ফু-‌তে পৌঁছে আমরা দলটাকে দুটো ভাগে ভাগ করে নি। গবেষকরা জল, মাটি, আবহাওয়া নিয়ে কাজ শুরু করেন। আর আমরা পর্বতারোহীর দল কোরজোক ফু-‌কে বেস ক্যাম্প বানালাম। ঠিক করলাম আমরা এখানকার বিখ্যাত শৃঙ্গ মেনটক কাঙ্গরি আরোহন করব। এখানে রয়েছে মেনটক কাঙ্গরি গ্রুপের ১, ২ ও ৩। কোরজক ফু থেকে বেস ক্যাম্প তুলে নিয়ে যাই ১ নম্বর। সেখানে থেকে ৪ আগস্ট আমরা আরোহন করি মেনটক কাঙ্গরি ওয়ান। সেই শৃঙ্গে আরোহন করার পর সরে আসি একটু পশ্চিম দিকে। ওখানে সেরোসো অঞ্চলে চিহ্নিত করি একটি অনামী শৃঙ্গকে। মনে মনে ঠিক করে নি, এই শৃঙ্গটি অভয়ার নামেই পরিচিতি করব বিশ্ববাসীর কাছে। আরোহনের রাস্তা খুঁজে বের করার পর ৭ আগস্ট অনামী শৃঙ্গের পেছন দিক থেকে ওঠার চেষ্টা করি। কিন্তু ওঠার সময় দেখি শৃঙ্গে উঠতে ৭০ থেকে ৮০ দুর্গম ঢাল বেয়ে যেতে হবে সেখানে। তারওপর ক্রমাগত পাথর গড়িয়ে পড়ছে। তখন আমি বাকি সাথীদের বেসক্যাম্পে ফিরে যেতে বলে, নিজে আরোহনের চেষ্টা চালিয়ে যাই। একটা সময় মনে হচ্ছিল, আমাকেও এই শৃঙ্গে ওঠার চেষ্টা ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু হার মানিনি হতভাগ্য ডাক্তার অভয়ার কথা স্মরণ করে। দুবৃত্তের হাতে ধর্ষিত ও খুন হওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছিল অভয়াকে। তাহলে আমি কেন পারব না, যতই কষ্ট হোক, শৃঙ্গে উঠবই, আর অভয়ার নামে সেটা উৎসর্গ করব। সেই জেদ থেকেই ৭ আগস্ট বেলা ১টায় শৃঙ্গে উঠে হাতে ভারতের তেরঙ্গা পতাকা নিয়ে ‘‌ অভয়া’‌ কে স্মরণ করে এর নাম রাখি ‘ ‌মাউন্ট ‌অভয়া।’‌ আর এটা আমার জীবনের প্রথম ট্রাভার্স ক্লাইম্ব। মানে হল, পাহাড়ের এক ঢাল দিয়ে উঠে অন্যদিকের ঢাল দিয়ে নেমে আসা। এর আগে এভারেষ্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা সহ অনেক দুর্গম, জীবনসংশয়কারী শৃঙ্গে আরোহন করেছিলাম। সেখানে অভয়া শৃঙ্গে আরোহনের তৃপ্তি ও অনুভূতি ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। অভয়ার জীবন তো আর ফিরিয়ে দিতে পারব না, বিচারও পাইয়ে দিতে পারব না, কিন্তু তার কথা স্মরণ করে তার একটা পরিচিতি পাহাড়ের কোলে রেখে যেতে পারছি, এটা ভেবেই খুব ভাল লেগেছে। পরদিন ৮ আগস্ট চোরদৌল নামে একটি শৃঙ্গে আরোহন করে ক্যাম্প গুটিয়ে ফিরে আসি কোরজোক ফু-‌তে।’‌

এখনও পর্যন্ত যে ৪৬ টি পর্বতাভিযানে অংশ নিয়েছেন দেবাশিস, তার মধ্যে অন্যতম কঠিনতম অভিযান ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা শৃঙ্গ জয়। দেবাশিসের মতে, ‘‌ এই অভিযানে সময় লেগেছিল কলকাতা থেকে যাওয়া ও ফেরা মিলিয়ে ৬২ দিন। এতটা সময় ধরে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করতে হয়েছিল। এছাড়া ধৌলাগিরি, মাকালু কঠিন অভিযান। আবার ৫ হাজার মিটারের ওপর গোমুখের সামনে শিবলিঙ্গ শৃঙ্গ ওঠাটাও টেকনিকালি খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। আরও অনেক ছোট বড় শৃঙ্গে আরোহনের ক্ষেত্রে নানা সমস্যায় পড়েছি। তবে সবকটির ক্ষেত্রেই সফলভাবে বাড়ি ফেরা সম্ভব হয়েছে কোনওরকম শারীরিক ক্ষতি ছাড়াই। তাই আমার কাছে এসবগুলিই সফল অভিযানের তালিকায় পড়ে।’‌

কলকাতা ফিরে ২০ আগস্ট রাতের দিকে ‘‌অভয়া’র বাবা-‌মার সঙ্গে দেখা করে সদ্য শেষ করে আসা অভিযানের কথা জানান দেবাশিস। তাঁদের হতভাগ্য ডাক্তার মেয়ের নামে শৃঙ্গের নামকরণ ‘‌অভয়া’‌ রেখেছেন জেনে খুব খুশি হন। দেবাশিস জানালেন, ‘‌ আমি আগেই ওঁদের বলেছিলাম, মাউন্ট অভয়া থেকে বেশ কিছু পাথর নিয়ে এসেছি। তার কয়েকটা ওঁদের দিতে চাই। তখন ওঁরা আমাকে বাড়িতে আসতে বলেন। আমি দেখা করি। ওঁরা খুবই খুশি হয়েছেন ওঁদের মেয়ের নামে শৃঙ্গের নাম রেখেছি বলে। তবে ওঁরা আমাকে বারবার অনুরোধ করেছেন, এটা বলে যে আমাদের মেয়ে তো কোনও দোষ করেনি। তাই অভয়া নামে এই শৃঙ্গের পরিচিতি না হয়ে অভয়ার আসল নামে এই নাম রাখা হোক। তাহলে বিশ্বের মানুষের কাছে অভয়ার আসল ঘটনা ও পরিচয় থাকবে চিরকাল। আমি এব্যাপারে কোনও কথা দিতে পারিনি। কারণ গোটা বিষয়টা বিচারাধীন। তাছাড়া এসব ক্ষেত্রে আইন বলে পরিচয় আড়াল রাখাটা বাধ্যতামূলক। তাছাড়া নাম দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি কিছু নিয়মকানুন আছে। চিঠি চাপাটি করার। সেটা অনেক দীর্ঘমেয়াদী ব্যাপার। তাছাড়া অভয়ার আসল নামে সেটা করা যাবে কিনা, তা নিয়েও সংশয় থাকছে। কিন্তু আমার কাছে এর নাম এখন থেকে মাউন্ট অভয়াই থাকছে। আর দুটো পাথর এনেছিলাম মাউন্ট অভয়া থেকে। বাড়িতে অভয়ার ছবির নীচে পাথরদুটো সাজিয়ে রেখেছেন হতভাগ্য ডাক্তারের বাবা-‌মা।’‌

দেবাশিস আরও একটা বিষয়ে খুব খুশি অভিযানের সার্থকতায়। সেটা হল ওখানকার জল, মাটি, বাতাস সংক্রান্ত গবেষণার ফলে। দেবাশিস বললেন, ‘‌ ওখানে সোকার বলে একটা হ্রদ আছে। সেখানে আশেপাশি নুন জমে থাকতে দেখেছি। প্রথমে ভেবেছিলাম, ওই জলটা তাহলে নোনা হবে। কিন্তু মুখে দিয়ে দেখেছি, ওই জলটা মিস্টি। অথচ একটু দূরেই থাকা সোমোরিরি হ্রদের টলটলে জল ওপর থেকে দেখলে মনে হবে মিস্টি, কিন্তু মুখে দিলে বোঝা যাবে নোনতা। এর ফলে ওই হ্রদে মাছ বা অন্য জীব বিশেষ নেই। অথচ সোকার হ্রদে ঠিক এর উল্টো। আমাদের দলের গবেষকেদের বক্তব্য, সোকার হ্রদে এমন কোনও অ্যালগি বা অন্য কোনও উদ্ভিদ আছে, যারা নুনটা খেয়ে হ্রদের জলের মিস্টতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমি গবেষকদের কাছে জানতে চেয়েছি, সোকার হ্রদে সেই অ্যালগি বা উদ্ভিদ যদি সোমোরিরি হ্রদেও চাষ করা যায়, তাহলে নোনতা ভাব কাটিয়ে মিস্টতা আনা যাবে কিনা?‌ প্রচুর স্যাম্পল সংগ্রহ করেছি। ওগুলো কুরিয়ারে পাঠানো হয়েছিল। এখনও হাতে আসেনি। এলে গবেষণার কাজ চলবে। গোটা ব্যাপারটায় লে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইসচ্যান্সেলর ও স্থানীয় প্রশাসন খুব আগ্রহী। তাঁরা তো স্থানীয় যে ২০ ‌থেকে ২৫ জনের পাহাড়ি পরিবার আছে, তারা খুব সহযোগিতা করেছে আমাদের অভিযানে। লে বিশ্ববিদ্যলয়ের শিক্ষার্থীরাও চায় আমাদের অভিযানে অংশ নিতে, গবেষণায় কাজে লাগতে।’‌

দেবাশিস চান কোরজোক ফু-‌র যে অল্পসংখ্যক অধিবাসীর সুস্থ জীবনযাপনের জন্য পাকা টয়লেটের ব্যবস্থা করার। কারণ ওরা এখনও খোলা বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। টয়লেট তৈরি করে দিলে, সেই অভ্যাস ওরা ত্যাগ করবে পরিবেশ আরও স্বচ্ছ রাখার স্বার্থে। আর এই মানুষগুলোর জীবনযাপন চলে ভেড়া, ইয়াকের দুধ থেকে মাখন, পনির বের করে আদি পদ্ধতিতে জ্যারিকেনের মধ্যে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে। ওদের জন্য একটা ছোট সাইজের মাখন বা পনির তৈরির মেশিনের ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়, তাহলে ওদের জীবনযাত্রা আরও মসৃন হবে। সমৃদ্ধিও আসবে ধীরে ধীরে।

খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com

অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *