অলস্পোর্ট ডেস্ক: ফিফা বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের তৃতীয় রাউন্ডের দোরগোড়ায় পৌঁছনোর প্রস্তুতি চলছে ভারতীয় শিবিরে। সপ্তাহ খানেক আগেই ভারতীয় দল নিয়ে সৌদি আরবের শৈলশহর আভায় পৌঁছে গিয়েছেন সুনীল ছেত্রীদের হেড কোচ ইগর স্টিমাচ। উদ্দেশ্য বিশ্বকাপ (এশীয়) বাছাই পর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে আফগানিস্তানকে হারিয়ে তৃতীয় রাউন্ডের দিকে পা বাড়িয়ে রাখা।
এশীয় বাছাই পর্বের তৃতীয় রাউন্ডে উঠতে পারলে দেশের ফুটবল ইতিহাসে এক নতুন ঐতিহাসিক মাইলফলক স্থাপন করবেন সুনীলরা। কিন্তু সেই লক্ষ্য থেকে এখনও দূরে রয়েছেন তাঁরা। আগামী সাত দিনে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে দু’টি ম্যাচে ভাল ফল করলে সেই মাইলফলকের দিকে বেশ কিছুটা এগিয়ে যেতে পারবে ভারত। তাই এই দুই ম্যাচই খুব গুরুত্বপূর্ণ ভারতের কাছে। যার প্রথমটি হবে ভারতীয় সময় অনুযায়ী শুক্রবার মধ্যরাতে ও পরেরটি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গুয়াহাটিতে।
এ বারের এশীয় বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে ভারত রয়েছে ‘এ’ গ্রুপে। কাতার, কুয়েত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে। এই গ্রুপে ভারত এখন রয়েছে তিন নম্বরে। দুটির মধ্যে একটি ম্যাচে জিতে তাদের সংগ্রহ তিন পয়েন্ট। কুয়েতেরও সংগ্রহ তিন পয়েন্ট। কিন্তু গোলপার্থক্যে ভারতের (-২) চেয়ে এগিয়ে কুয়েত (৩)। তাই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে শুধু জয় না, ভাল ব্যবধানও দরকার সুনীলদের।
কেন এগিয়ে ভারত?
আফগানিস্তান এই গ্রুপে সবার শেষে রয়েছে। দু’টি ম্যাচের একটিতেও জিততে পারেনি তারা। কাতারের কাছে ১-৮ ও কুয়েতের কাছে ০-৪ গোলে হারে তারা। নভেম্বরে ভারত প্রথম ম্যাচে কুয়েতে গিয়ে তাদের ১-০-য় হারিয়ে আসে। তবে কাতারের বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে ০-৩-এ হেরে যায়। জানুয়ারিতে এএফসি এশিয়ান কাপের মূলপর্বে তিনটি ম্যাচেই ভারত হেরে যায় কোনও গোল করতে না পেরে।
বাছাই পর্বের পারফরম্যান্সের নিরিখে ভারত খাতায় কলমে যেমন এগিয়ে রয়েছে। তেমনই ফিফা ক্রমতালিকায় অবস্থানের দিক থেকেও আফগানদের চেয়ে এগিয়ে তারা। ভারত যেখানে রয়েছে ১১৭ নম্বরে, সেখানে আফগানিস্তানের অবস্থান ১৫৮-য়। ইতিহাসও ভারতকে এগিয়ে রেখেছে। এ পর্যন্ত যে এগারোবার দুই দেশের ফুটবল-দ্বৈরথ হয়েছে, তার মধ্যে ভারত জিতেছে সাতবার, আফগানিস্তান জিতেছে মাত্র একবার, তিনবার ড্র হয়েছে।
কিন্তু এ সবই খাতায় কলমে। মাঠে নেমে তারা নিজেদের এই এগিয়ে থাকার সুবিধা কতটা কাজে লাগাতে পারবে, সেটাই দেখার বিষয়। এই কঠিন রাস্তায় প্রতি ম্যাচ ধরে ধরে এগোতে চায় ভারতীয় শিবির। কোচ স্টিমাচ সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের ওয়েবসাইটে মন্তব্য করেছেন, “আত্মবিশ্বাস ও ফিফা ক্রমতালিকার দিক থেকে প্রতি ম্যাচই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হল বাছাই পর্বের তৃতীয় রাউন্ডে ওঠা। তার অনেক রাস্তা আছে। আসন্ন দুই ম্যাচে এই ব্যাপারটার ফয়সালা হবে না, জানি। তা ঠিক হবে জুনে কুয়েত ও কাতারের বিরুদ্ধে দুই ম্যাচে”।
এখনই ফয়সালা না হলেও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে দু’টি ম্যাচে ভাল ফল করলে যে জুনের দুই ম্যাচে অনেকটা চাপমুক্ত হয়ে নামতে পারবেন তাঁরা, সেটাই এখন গুরপ্রীত, শুভাশিস, লিস্টন, মনবীরদের বোঝাচ্ছেন স্টিমাচ। ইন্ডিয়ান সুপার লিগের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দেখে দল বাছাই করেছেন হেড কোচ। যেখানে ঠাঁই পেয়েছেন কলকাতার দুই প্রধানের ন’জন তারকা। এ ছাড়াও আইএসএলে খেলা সেরা ভারতীয় ফুটবলাররা স্টিমাচের দলে রয়েছেন।
জোড়া সমস্যার বাধা
কিন্তু এশিয়ান কাপে যে সমস্যা হয়েছিল তাদের, সেই সমস্যার সমাধান করতে না পারলে এই দুই ম্যাচেও বিপদে পড়ে যেতে পারে ভারতীয় দল। গোল না করতে পারার সমস্যা। কাতারে অনেক সুযোগ তৈরি করেও তা কাজে লাগাতে পারেননি মনবীর, সুনীলরা। গোলের খরা এখানেও কাটাতে না পারলে সমস্যা ভারতীয় দলের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
পাঁচ বছরে এই নিয়ে চতুর্থবার আফগানদের বিরুদ্ধে মাঠে নামছে ভারত। ২০১৯ ও ২০২১-এ গত বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দেশ। দু’বারই ফল হয়েছিল ১-১। দু’বছর আগে এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের ম্যাচও সেই একই ফলের দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোল করে দলকে জিতিয়েছিলেন সহাল আব্দুল সামাদ। এ বার তার চেয়ে দাপুটে ফুটবল খেলে শারীরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা আফগানদের হারানোটাই চ্যালেঞ্জ ভারতের সামনে।
কিন্তু চেনা শত্রুদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে ম্যাচের ভেনু, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,১০০ ফুট ওপরে। ভারতীয় পর্যটকদের প্রিয় শৈলশহর দার্জিলিং, গ্যাঙটক, সিমলা, মানালি, ধরমশালার চেয়ে অনেকটাই বেশি উচ্চতাসম্পন্ন এই শহর, যার সঙ্গে একমাত্র টাইগার হিল বা রিশপের উচ্চতার তুলনা করা চলে।
কিক অফের সময় শহরের তাপমাত্রা অবশ্য ২০ ডিগ্রি সেলসিয়সের আশেপাশেই ঘোরাফেরা করবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে পূর্বাভাস থেকে। তাপমাত্রা নিয়ে সমস্যা না হলেও উচ্চতা নিয়ে হতেই পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এতটা ওপরে ৯০ মিনিট ধরে গতিময় ফুটবল খেলতে হলে দমের ঘাটতি হতেই পারে। যদিও স্টিমাচের দাবি, পাঁচ দিন আগে সৌদি আরবের এই শৈলশহরে এসে পৌঁছনোর ফলে দলের ফুটবলাররা এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমরা যে রকম অনুশীলন করি, সে রকমই করছি এখানে। এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমরা পাঁচ দিন আগেই চলে এসেছি। এই নিয়ে সমস্যা হবে বলে মনে হচ্ছে না”।
প্রতিপক্ষের কোচের সুবিধা
আফগানদের কোচ অ্যাশলে ওয়েস্টউড আবার ভারতীয় ফুটবলে পরিচিত মুখ। অতীতে বেঙ্গালুরু এফসি, এটিকে ও রাউন্ডগ্লাস পাঞ্জাবের কোচ ছিলেন তিনি। গত বছর বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব শুরুর আগে নভেম্বরে আফগানিস্তানের জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন ওয়েস্টউড। ভারতীয় ফুটবলে কাজ করে যাওয়ার অভিজ্ঞতা যে তাঁকে ভারতের বিরুদ্ধে বাড়তে সুবিধা দিতে পারে, এই ব্যাপারে একমত ভারতের কোচও।
প্রতিপক্ষের কোচকে নিয়ে স্টিমাচ বলেন, “আমাদের ছেলেদের অনেককেই চেনে অ্যাশলে। আমাদের বিরুদ্ধে ম্যাচের জন্য ও আফগান দলে তৈরি করছে সেই এশিয়ান কাপের সময় থেকে। কয়েক মাস আগে ওরা এখানে প্রস্তুতি শিবির করে গিয়েছে এবং প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেছে। এখানে বসেই ওরা এই ম্যাচের গেমপ্ল্যান তৈরি করেছে। চলতি বাছাই পর্বের শুরুর দিকে ওরা যে অবস্থায় ছিল, তার চেয়ে এখন অনেক ভাল অবস্থায় আছে বলে আমি নিশ্চিত”।
আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে এর আগে সাতটি ম্যাচে মাঠে নামা ভারত অধিনায়ক সুনীল ছেত্রীও তাঁদের কোচের সঙ্গে একমত। তিনি বলেছেন, “ওরা দল হিসেবে খেলবে এবং আগ্রাসী ফুটবল খেলবে। অ্যাশলে ওয়েস্টউড নিশ্চয়ই ওদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, ওদের ঠিক কী কী করতে হবে। উনি এ রকমই কোচ। কিন্তু আমাদের নিজেদের নিয়ে বেশি ভাবতে হবে। এশিয়ান কাপের পর আমাদের এ বার ঘুরে দাঁড়াতে হবে। কাজটা অবশ্য সোজা হবে না। কিন্তু আমাদের করে দেখাতে হবে”।
ভারতীয় অধিনায়কের এই প্রত্যয় তাঁর সতীর্থদের মধ্যেও দেখা যাবে কি না, সেটাই দেখার। গোলের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে এবং আভার আবহাওয়া ও উচ্চতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারলে অবশ্য তা সম্ভব। প্রতিপক্ষকে দক্ষতার লড়াইয়ে হারানো ছাড়াও এই দুই সমস্যা কাটানোটাও ভারতীয় দলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
ভারতীয় স্কোয়াড
গোলরক্ষক: অমরিন্দর সিং, গুরপ্রীত সিং সান্ধু, বিশাল কয়েথ।
ডিফেন্ডার: আকাশ মিশ্র, মেহতাব সিং, নিখিল পূজারি, রাহুল ভেকে, শুভাশিষ বোস, আনোয়ার আলি, অময় রানাওয়াডে, জয় গুপ্তা।
মিডফিল্ডার: অনিরুদ্ধ থাপা, ব্র্যান্ডন ফার্নান্ডেজ, দীপক টাংরি, লালেংমাওইয়া রালতে, লিস্টন কোলাসো, নাওরেম মহেশ সিং, সহাল আব্দুল সামাদ, সুরেশ সিং ওয়াংজাম, জিকসন সিং, ইমরান খান।
ফরোয়ার্ড: লালিয়ানজুয়ালা ছাংতে, মনবীর সিং, সুনীল ছেত্রী, বিক্রম প্রতাপ সিং।
ম্যাচ: আফগানিস্তান বনাম ভারত, বিশ্বকাপ (এশীয়) বাছাই পর্ব, দ্বিতীয় রাউন্ড
ভেনু: দামাক স্টেডিয়াম, আভা, সৌদি আরব
কিক-অফ: ২২ মার্চ, রাত ১২.৩০ (ভারতীয় সময়)
সম্প্রচার: ডিডি স্পোর্টস চ্যানেল ও ফ্যানকোড অ্যাপ
(লেখা আইএসএল ওয়েবসাইট থেকে)
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
