অলস্পোর্ট ডেস্ক: কয়েকদিন আগেই যাদের বিরুদ্ধে পরপর দুই ম্যাচে একবার ড্র করে ও একবার হারিয়ে হিরো ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত, এ বার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৩ ফাইনালে ওঠার লড়াই সেই লেবাননের বিরুদ্ধে। শনিবার, বেঙ্গালুরুর শ্রী কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে।
গতবার নেপালকে ফাইনালে হারিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়া ভারতের সামনে এ বার লড়াইটা অনেক কঠিন কুয়েত ও লেবাননের মতো শক্তিশালী দেশ এই টুর্নামেন্টে ঢুকে পড়ায়। এই প্রথম এই দুই দেশ দক্ষিণ এশীয় টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার ফলে এই টুর্নামেন্টের চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি কঠিন হয়ে গিয়েছে অংশগ্রহনকারী অন্য দেশগুলির কাছে। সেই চ্যালেঞ্জ সামলেও এ বারের সাফ সেমিফাইনালে পৌঁছেছে ভারত ও বাংলাদেশ।
ভারতের সামনে যেমন লেবানন, তেমনই বাংলাদেশের মুখোমুখি কুয়েত। শেষ পর্যন্ত কোনও দক্ষিণ এশীয় দেশ সাফ ফুটবলের খেতাবী লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবে, না দুই অতিথি দেশের মধ্যেই কোনও এক দল ট্রফি নিয়ে চলে যাবে, তা তো সময়ই জানে। কিন্তু শনিবার ভারত ও লেবাননের লড়াই যে প্রায় ফাইনালের মতোই হাড্ডাহাড্ডি হয়ে উঠতে চলেছে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
দ্বৈরথের ইতিহাসে পরিবর্তন
দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার সার্বিক নজিরের দিকে তাকালে মনে হতেই পারে যে, লেবাননের চেয়ে ভারত ফুটবলে পিছিয়ে। কারণ, আটবারের মুখোমুখিতে ভারত জিতেছে মাত্র দু’বার। লেবানন জিতেছে তিনবার। ড্র হয়েছে তিনবার। কিন্তু দুই দলের মধ্যে সাম্প্রতিক দ্বৈরথের দিকে দেখলে ধারনাটা অবশ্যই পাল্টে যাবে। কারণ, দুই ম্যাচেই ভারত রীতিমতো আধিপত্য বিস্তার করে প্রথমে গোলশূন্য ড্র করে ও পরেরবার জেতে।
সপ্তাহদুয়েক আগে ভুবনেশ্বরের ম্যাচের শুরু ও শেষ দিকে যে দুটি সহজ সুযোগ পেয়েছিল ভারত, সেগুলো হাতছাড়া না হলে হাসিমুখে ও ফাইনালের জন্য ভরপুর আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারতেন সুনীল ছেত্রীরা। লেবাননের দীর্ঘদেহী ফুটবলারদের শরীরি চ্যালেঞ্জকে সামলে ফুটবল দক্ষতা দিয়ে যে ভাবে তাদের আটকে গোলশূন্য ড্র করে ভারত, তা ছিল প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু একাধিক সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে না পারার মাশুল দিতে হয় সেই জয় হাতছাড়া করে।
তার তিন দিন পর ইন্টারকন্টিনেন্টাল ফাইনালে লেবাননকে ২-০-য় হারিয়ে টুর্নামেন্টের খেতাব জিতে নেয় ভারত। সেই ম্যাচে ৪৬ বছর পরে লেবাননকে ফুটবলের লড়াইয়ে হারায় ভারত। দ্বিতীয়ার্ধে সুনীল ছেত্রী ও লালিয়ানজুয়ালা ছাংতের গোলে ভারত এই খেতাব অর্জন করল। প্রথমার্ধে আক্রমণে তেমন সাফল্য না পাওয়া সত্ত্বেও দ্বিতীয়ার্ধে যে ভাবে তারা লড়াইয়ে ফিরে আসে, তার কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। অনিরুদ্ধ থাপা, সহাল আব্দুল সামাদ, লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে, সুনীল ছেত্রী, আশিক কুরুনিয়ান, নাওরেম মহেশ সিং-রা এক দলে থাকলে কতটা আগ্রাসী ফুটবল খেলতে পারে ভারতীয় দল, সেটাই সে দিন বুঝে নেন লেবাননের ফুটবলাররা। শনিবার সেই শিক্ষাই কি কাজে লাগাতে পারবে তারা?
সন্দেশের অভাব পূরণ হবে: সুনীল
শনিবার লেবাননের একটা বড় সুবিধা, তারা প্রতিপক্ষের গোলের সামনে পাবে না ভারতীয় দলের সেরা ফর্মে থাকা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার সন্দেশ ঝিঙ্গনকে। গত ম্যাচে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখায় তিনি এই ম্যাচে খেলতে পারবেন না। গত ম্যাচে দ্বিতীয় লাল কার্ড দেখা ভারতীয় কোচ স্টিমাচ যেমন এই ম্যাচে মাঠের বাইরে থেকে দলকে পরিচালনা করতে পারবেন না। দুজনকেই থাকতে হবে গ্যালারিতে। এ ছাড়াও ক্লান্তিও একটা ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে ভারতীয় দলের ক্ষেত্রে। ১৮ দিনে সাতটি ম্যাচ খেলার পরে যেটা খুবই স্বাভাবিক।
তবে এগুলো তাদের ভাল খেলার পক্ষে কোনও অন্তরায় হয়ে উঠবে বলে মনে করেন না সুনীল ছেত্রী। শনিবারের ম্যাচে মাঠে কোচ স্টিমাচ থাকবেন না। ফলে তাঁকে নেতৃত্বের ভূমিকাটা পুরোপুরিই নিতে হবে। এবং সেই কাজটা ম্যাচের আগের দিন থেকেই শুরু করে দিলেন তিনি।
শুক্রবার বেঙ্গালুরুতে সাংবাদিক বৈঠকে তিনিই ছিলেন প্রধান বক্তা, যিনি বলেন, “লেবাননের বিরুদ্ধে যেহেতু সম্প্রতি দুটো ম্যাচ আমরা খেলেছি, তাই ওদের অনেক কিছুই আমাদের জানা। একই ভাবে ওরাও আমাদের সম্পর্কে অনেক জানে। তাই ওরা নিশ্চয়ই চাইবে, ওদের বিরুদ্ধে গত দুই ম্যাচে আমরা যা খেলেছি, তার সামান্য অংশই যেন আমরা খেলতে পারি”।
সন্দেশ ঝিঙ্গনের না থাকাটা একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হলেও, সুনীল এই ব্যাপারে একমত নন। তাঁর মতে, “ব্যক্তিগত ভাবে ঝিঙ্গনকে আমি মাঠে, অনুশীলনে সবসময়ই চাই। কারণ, ও হারতে একদম পছন্দ করে না। আশা করি, কাল ম্যাচের পরে আপনাদের বলতে পারব, ওর অভাব টের পাইনি। ওর জায়গায় যে-ই খেলুক, সে নিশ্চয়ই নিজের সেরাটা দিয়ে সেই সুযোগের প্রতি সুবিচার করবে”।
কোচ স্টিমাচের মাঠে অনুপস্থিতি নিয়ে সুনীল বলেন, “ম্যাচের আগে আমরা অনেক প্রস্তুতি নিই। যেখানে কোচ স্টিমাচ পুরোপুরি ভাবে জড়িয়ে থাকেন। অবশ্য তিনি সাইডলাইনে থাকবেন না। তবে ওঁর সহকারী মহেশ গাওলি নিশ্চয়ই তাঁর অভাব পূরণের যথাসাধ্য চেষ্টা করবে”।
ঘরের মাঠ কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে খেলা বলে একটু বেশিই উত্তেজিত সুনীল। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বেঙ্গালুরুতে খেলার ব্যাপারে আমি ও আমার সতীর্থরা সবসময়ই বেশ উত্তেজিত বোধ করি। গত তিন ম্যাচে আমরা সমর্থকদের কাছ থেকে যে সমর্থন পেয়েছি, তার পরে এটাই স্বাভাবিক। আমার বিশ্বাস কালও গ্যালারি ভর্তি থাকবে। কারণ, আমাদের কাছে এটা একটা বিশাল ম্যাচ”।
ছন্দে ফেরা লেবানন
ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ ফাইনালে হারার পর থেকে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে টানা তিন ম্যাচ জিতে শেষ চারে উঠেছে লেবানন। বাংলাদেশকে ২-০-য় হারানোর পরে ভুটানকে ৪-১ ও মলদ্বীপকে ১-০-য় হারায় তারা। চার ম্যাচে সাত গোল দেওয়া দলটা এ বার তেল খাওয়া গাড়ির মতো ছুটতে শুরু করেছে। চলতি টুর্নামেন্টে তারাই এখন একমাত্র দল, যারা সব ম্যাচ জিতে এসেছে।
তা সত্ত্বেও অবশ্য ভারতকে যথেষ্ট সমীহ করছেন তাদের কোচ আলেকজান্দার ইলিচ। তাঁর মতে, “ভারতের সঙ্গে ম্যাচটা বেশ কঠিন। ভারত ইদানীং যে রকম খেলছে, তাতে তাদের আমরা খুবই শ্রদ্ধা করি। যদিও ওদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই দুটো ম্যাচ খেলে ফেলেছি আমরা। আমার মনে হয়, আমরা দু’পক্ষই এখন একই জায়গায় রয়েছে। ছোটখাটো ভুলই তফাৎ গড়ে দিতে পারে।”
ভুবনেশ্বরের ফাইনালে গোলদাতা ভারতীয় দলের অধিনায়ক সুনীল ছেত্রীকে নিয়েও আলাদা করে বলতে শোনা গেল ইলিচকে। বলেন, “ভারত যেমন শক্তিশালী দল, ওদের অধিনায়কও খুবই বিপজ্জনক খেলোয়াড়। (গত দুই ম্যাচে) আমরা বুঝে নিয়েছি ওরা কতটা কী করতে পারে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো লড়াই করব”।
উন্নতিতে খুশি স্টিমাচ
ভারতীয় দলের হেড কোচ ইগর স্টিমাচ শনিবার গ্যালারিতে না থাকলেও তিনি যে মাঠে ঢোকার আগে পর্যন্ত দলকে উৎসাহ জুগিয়ে যাবেন, সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেমিফাইনালের লড়াই নিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের দলের ছেলেদের সেই মুহূর্তগুলোতে চরম মনসংযোগ বজায় রাখতে হবে, যখন তা থাকা দরকার। এই মুহূর্তগুলোতে কোনও ভুল করলে চলবে না। তবে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে আমি খুশি। দলের এখন যে জায়গায় থাকা দরকার, ওরা সেই জায়গার কাছাকাছিই আছে”। সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতার জন্য ফিফার বিশ্ব ক্রমতালিকায় ভারত এক ধাপ উঠে ১০০-য় এসেছে। এই খবরে খুশি স্টিমাচ বলেন, “খুবই ভাল খবর। কিন্তু আগামী ম্যাচগুলোতে এই জায়গাটা আমাদের আরও পাকা করে তুলতে হবে”।
শিবিরের মেজাজ নিয়ে তিনি বলেন, “প্রতি ম্যাচে আমরা উন্নতি করছি। যখনই অনুশীলনে নামে দলের ছেলেরা, তখনই দারুন একটা মুড থাকে। একদিন না একদিন যে গোল খেতেই হবে, তা আমাদের জানাই ছিল। কিন্তু সেটা যে নিজগোল হবে, তা অপ্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু এটা ফুটবলেরই অঙ্গ এবং এটা মেনে নিতেই হবে”।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন: ফেসবুক ও টুইটার
