মুনাল চট্টোপাধ্যায়: একটা যুগের অবসান। মোহনবাগানের প্রাক্তন সভাপতি ও সচিব স্বপন সাধন বসুর প্রয়াণে। সবুজ মেরুন সদস্য ও সমর্থক সহ গোটা ময়দানের মানুষের কাছে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন টুটু বসু নামে। তাই মঙ্গলবার রাতে মোহনবাগানের প্রাণপুরুষ টুটুদার জীবনাবসানের খবর ছড়িয়ে পড়া মাত্র ময়দান জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। বুধবার সকালে টুটু বসুর মরদেহ দক্ষিণ কলকাতার বাসভবনে নিয়ে এলে বিভিন্ন স্তরের মানুষের ঢল নামে শ্রদ্ধা জানাতে। বাংলার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন সেলিব্রিটি থেকে সাধারন ভক্তের আনা মালায় ঢাকা পড়েন প্রিয় টুটু বসু। সেখানে প্রাক্তন ফুটবলার সুব্রত ভট্টাচার্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিমান বসু, ইস্টবেঙ্গল কর্তা দেবব্রত সরকার সহ অনেকেই এসে শেষ শ্রদ্ধা জানান। যাঁরাই শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন তাঁদের সাদরে স্বাগত জানিয়েছেন টুটু বসুর দুই পুত্র মোহনবাগান সচিব সৃঞ্জয় বসু, সহ সভাপতি সৌমিক বসু, নাতি অরিঞ্জয় বসু, ক্লাব সভাপতি দেবাশিস দত্ত সহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।
পরে নিজের বাড়ি থেকে টুটু বসুর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সংবাদ প্রতিদিন অফিসে। এই সংবাদপত্র তৈরি হয়েছিল টুটু বসুর হাত ধরেই। বলতে গেলে মোহনবাগান ক্লাবের মতো এই সংবাদপত্রও ছিল তাঁর কাছে প্রাণের মতো প্রিয়। সেই সাংবাদপত্রের দপ্তর ছুঁয়ে টুটু বসুকে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর আর এক প্রিয় ক্লাব ভবানীপুরে। সেখানে কিছুটা সময় রাখার পর টুটু বসুকে নিয়ে যাওয়া হয় খিদিরপুরের একটি বিশেষ স্থানে। তারপর টুটু বসুক মরদেহ নিয়ে আসা মোহনবাগান তাঁবুতে। সবুজ মেরুন পতাকায় মোড়া টুটু বসুর মরদেহ ক্লাবে ঢুকতেই সদস্য-সমর্থকদের মুখে ওঠে ধ্বনি, ‘টুটুদা অমর রহে, তোমায় আমরা ভুলছি না, ভুলব না।’
মোহনবাগান ক্লাব তাঁবুর ভেতর রাখা টুটু বসুর মরদেহ ফুল মালায় শ্রদ্ধা জানানোর জন্য দুপুর থেকে লম্বা লাইন সদস্য-সমর্থকদের। অনেকের চোখে জল। আসলে মোহনবাগান ক্লাবের সাফল্যের শিখর ছোঁয়ার পিছনে যে দু’জন মানুষের অবদান অনস্বীকার্য, তাঁরা হলেন দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু প্রয়াত প্রাক্তন সচিব অঞ্জন মিত্র ও টুটু বসু। মোহনবাগান ক্লাবে যুগান্তকারী কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন এই দুই কর্তা। মোগনবাগান ক্লাবে স্পনসর আনার পিছনে টুটু বসু উদ্যোগ চিরকাল মানুষ মনে রাখবেন। আগে মোহনবাগান ক্লাবে বিদেশি খেলানোর চল ছিল না। সেই নিয়মে বদল ঘটিয়ে চিমাকে খেলিয়ে সবুজ মেরুন ক্লাবে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা ঘটান।
মোহনবাগান নির্বাচনে স্বচ্ছতা আনতে সচিত্র পরিচয় পত্রের সূচনা ঘটনাও টুটু-অঞ্জনের মস্তিষ্কপ্রসূত। ক্লাব যখনই সসম্যায় পড়েছে, তখনই টুটু বসু এগিয়ে এসেছেন সেই সমস্যা থেকে দলকে টেনে তুলতে। ফেডারেশন মোহনবাগানকে নির্বাসিত করলে, টুটু বসু সক্রিয় ভূমিকাই শুধু নেননি, জরিমানার ২ কোটি দিয়ে ক্লাবকে নির্বাসনমুক্তকরেন। আর তাতেই তিনি ক্লাবের পরিত্রাতা হিসেবে পূজিত হয়ে এসেছেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সবুজ মেরুনের জনতার কাছে। গত বছর ২৯ জুলাই টুটু বসুকে মোহনবাগান রত্ন সম্মান দেওয়া হয়। প্রকৃত অর্থেই তিনি ছিলেন মোহনবাগানের রত্ন ও গর্ব। রত্ন প্রাপ্তির দিন আবেগে টুটু বসু বলেছিলেন, এটা তাঁর কাছে হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো। তাঁর জীবনে আর কোনও আক্ষেপ রইল না। হয়ত পরের ২৯ জুলাই তিনি আর জীবিত থাকবেন না, তাঁর প্রিয় মোহনবাগান সমর্থকদের সঙ্গে মিলিত হতে। সেটাই সত্যি হল। আর তাই টুটু বসুর প্রয়াণে তাঁরা নিজেদের অভিভাবকহীন মনে করছেন,আত্মীয় বিয়োগের ব্যথা অনুভব করছেন।
মোহনবাগান তাঁবুতে শ্যাম থাপা, প্রদীপ চৌধুরি, সাংসদ প্রসূন ব্যানার্জি, এআইএফএফ সভাপতি কল্যান চৌবে, আইএফএ সচিব অনির্বান দত্ত, শিশির ঘোষ, অমিত ভদ্র, হেমন্ত ডোরা, সহ অনেক প্রাক্তন ফুটবলার বিভিন্ন সময় ফুল মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের তরফে সচিব রূপক সাহা, মহমেডান ক্লাব প্রতিনিধি ছাড়াও মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের তরফেও পুস্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
ক্লাব তাঁবুতে আসেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সঙ্গে ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামানিক , ফেডারেশন সভাপতি কল্যান চৌবে। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘ টুটু বসু মানেই মোহনবাগান, মোহনবাগান মানেই টুটু বসু। বাংলার ফুটবলের সঙ্গে টুটু বসুর সম্পর্ক ছিল বরাবরই আত্মিক। আমি মোহনবাগান ক্লাবে এসেছি ব্যক্তিগত ভাবে ও রাজ্য সরকারের তরফে প্রয়াত টুটু বসুকে শ্রদ্ধা জানাতে। আমার সঙ্গে ক্রীড়ামন্ত্রী ও ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন সভাপতি। মোহনবাগান ক্লাবকে এখনকার আধুনিক রূপ দেওয়ার পিছনে টুটু বসুর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি স্বামী বিবেকানন্দর মন্ত্র ‘চরৈবেতি, চরৈবেতি’তে বিশ্বাসী ছিলেন। তাতে ভর করেই ক্লাবকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন আমৃত্যু। একইসঙ্গে তৈরি করে গেছেন যোগ্য পরবর্তী প্রজন্ম ক্লাব পরিচালনায়। যেভাবে টুটু বসু ক্লাবকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন, সেই ভাবধারাকে রক্ষা করে ক্লাবের সাফল্য ও সুনাম অক্ষুন্ন রাখাটাই হবে এখন তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো।’
বাংলার ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামানিক বলেন, ‘ টুটু বসুর প্রয়াণ শুধু মোহনবাগানের নয়, বাংলার ক্রীড়াজগতের বড় ক্ষতি। তিনি খেলাধুলোর প্রাঙ্গনে একজন বড় যোদ্ধা ছিলেন।’ ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘ আমি ব্যক্তিগত ভাবে টুটুদাকে চিনতাম খেলোয়াড় জীবনের শুরু থেকে। অভিভাবকের মতো খেলোয়াড়দের ভালবাসতেন, আগলে রাখতেন। টুটুদার সঙ্গে আমার জীবনের অনেক মধুর স্মৃতি ভিড় করে আসছে এখন। মোহনবাগান আর টুটু বসুকে কখনও আলাদাভাবে ভাবা যায়নি। তাঁর চলে যাওয়াটা সত্যি খুব বেদনার। টুটু বসুর পরিবারের সকলের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা। সমর্থকদের মতো আমি সমব্যথী।’
মোহনবাগান তাঁবু থেকে কর্তা, সদস্য, সমর্থকদের কাঁধে চেপে শেষবারের জন্য টুটু বসুর মরদেহ বের করে নিয়ে যাওয়া হল, তখন সকলের মুখে আবার উঠল ধ্বনি, টুটুদা অমর রহে, তোমায় আমরা ভুলছি না, ভুলব না।
খেলার খবরের জন্য ক্লিক করুন: www.allsportindia.com
অলস্পোর্ট নিউজের সঙ্গে থাকতে লাইক আর ফলো করুন:ফেসবুক ও টুইটার
