অলস্পোর্ট ডেস্ক: ক্রমশ দুরাবস্থা যত কাটিয়ে উঠছে তাঁর দল, ততই আশাবাদী ও উচ্চাকাঙ্খী হয়ে উঠতে চাইছেন মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস। বুধবার তাদের ম্যাচ লিগ টেবলের দু’নম্বরে থাকা দল এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে। গোয়ায় গিয়ে এই ম্যাচ খেলবে সবুজ-মেরুন বাহিনী। টানা চার ম্যাচে জয়হীন থাকার পর গত ম্যাচে জয়ে ফিরেই যেন বেশ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন অভিজ্ঞ স্প্যানিশ কোচ।
দল নিয়ে গোয়ায় রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “শীর্ষে থাকতে গেলে আমাদের প্রতি ম্যাচে জিততে হবে। এটাই আমাদের লক্ষ্য। দুই বা তিন নম্বরে থাকা নিয়ে চিন্তাই করছি না। দলের ছেলেদের বলে দিয়েছি এক নম্বরটাই আমাদের লক্ষ্য”।
পাশাপাশি ফুটবলের বাস্তবটাও মনে করিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করেননি তিনি। বলেন, “ফুটবলে একেক দিন একেক রকম যায়। কোনওদিন জয়, কোনও দিন ড্র। কিন্তু প্রতি ম্যাচেই আমাদের তিন পয়েন্টের কথা ভেবে নামতে হবে। ফুটবলে ভারসাম্যই আসল কথা। আমাদের গোল দেওয়ার কথা বেশি ভাবতে হবে, গোল খাওয়া নয়। সে জন্য একে অপরকে সাহায্য করতে হবে। সেজন্য দলগত সংহতি, শৃঙ্খলা, সদিচ্ছা থাকা খুবই জরুরি”।
বুধবারের ম্যাচ নিয়ে তাঁর এই আত্মবিশ্বাসের অন্যতম কারণ কার্ড-শাস্তি শেষ করে দীপক টাঙরি, লিস্টন কোলাসো ও আরমান্দো সাদিকুর মাঠে ফেরা। তার ওপর শোনা যাচ্ছে আনোয়ার আলিও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছে। কোচ বলেন, আনোয়ার ৮০-৮৫ শতাংশ ফিট। শারীরিক ভাবে ভাল জায়গায় রয়েছে। পরের ম্যাচে ওর খেলার সম্ভাবনা আছে। তবে ওকে খেলানোর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব মঙ্গলবার। প্রত্যেক কোচই খেলোয়াড়দের সেরা অবস্থায় চায়। আমাদের ৯০ শতাংশ খেলোয়াড়ই ভাল অবস্থায় আছে। দু-একজনের চোট আছে। তবে আরমান্দো, লিস্টন, টাঙরিদের দলে ফেরার খবরটা ভাল”।
কিন্তু দল যে সমানে গোলের সুযোগ নষ্ট করে চলেছে! এখন পর্যন্ত ১৩৬টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছে তারা। কিন্তু গোল করেছে ২৩টি। অর্থাৎ সুযোগকে গোলে পরিণত করার শতকরা হার মাত্র ১৭%! যা নিয়ে হাবাসও উদ্বিগ্ন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই ব্যাপারটা খেলার তীব্রতা ও খেলোয়াড়দের মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। খেলোয়াড়দের সব সময় ভাবতে হবে ম্যাচে একটাই সুযোগ পাওয়া যাবে আর সেই সুযোগই কাজে লাগাতে হবে। গোল দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের ছেলেদের আরও মনযোগী হতে হবে। অনেক সুযোগ পেলে সমস্যা নেই। কিন্তু দু-একটা সুযোগ পেলে সেক্ষেত্রে নিখুঁত হওয়া জরুরি”।
ফিনল্যান্ডের তারকা মিডফিল্ডার জনি কাউকোর ওপর অনেক ভরসা হাবাসের। চোটের ধাক্কা সামলে প্রায় ১৫ মাস বাদে তিনি মাঠে ফেরার সুযোগ পান হাবাস দায়িত্বে আসার পরই। হায়দরাবাদ এফসি-র বিরুদ্ধে তিনি ৬১ মিনিটের মাথায় মাঠে নামেন সহাল আব্দুল সামাদের জায়গায়। হুগো বুমৌসকে ছেড়ে দিয়ে কাউকোকে মরশুমের শেষ পর্যন্ত যে রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা তার আগেই জানিয়ে দেয় মোহনবাগান ক্লাব। সেই কাউকো এত দিন পর মাঠে নেমে স্বাভাবিক ভাবেই খুব একটা ছন্দে ছিলেন না। ৬৫ মিনিটের মাথায় মনবীরের একটি কাট ব্যাক তাঁর পায়ে এলে তিনি যে স্লাইস করেন, তা খুবই দুর্বল ছিল। বহু দিন পর যে ম্যাচে নেমেছেন, তা বোঝাই গেল।
তবে তিনি মাঠে নামার পরে মোহনবাগান দলের চেহারা যে ভাবে পাল্টে যায়, তাতে বোঝা যায় দলে যে একজন যোগ্য নেতার প্রয়োজন ছিল, কাউকোর মধ্যেই সেই নেতাকে খুঁজে পেয়েছে সবুজ-মেরুন ব্রিগেড। কাউকোর এই প্রভাব এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সে জন্যই হাবাস তাঁকে এই ম্যাচেও খেলাতে চান। তবে পুরোটা সময় যে তাঁকে মাঠে রাখবেন না, সেই ইঙ্গিতও পাওয়া গেল। হাবাস বলেন, “কাউকোকে ক্রমশ বেশি সময় ধরে খেলাব। এখনই শুরু থেকে বা পুরো ম্যাচ ওকে দিয়ে খেলানো যাবে না। প্রতি দিন যথাসম্ভব বেশিক্ষণ খেলাতে হবে ওকে”।
ডিসেম্বরে বড় দিনের ঠিক আগে মোহনবাগান শিবিরে হতাশার অন্ধকার নেমে এসেছিল এই এফসি গোয়ার কাছেই হেরে। সে দিন যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে গোয়ার দল ৪-১-এ জিতে মাঠ ছাড়ে। জোড়া গোল করেন মার্কিন মিডফিল্ডার নোয়া সাদাউই। এ ছাড়া স্প্যানিশ মিডফিল্ডার ভিক্টর রড্রিগেজ ও পরিবর্ত স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড কার্লোস মার্তিনেজ দুজনেই পেনাল্টি থেকে গোল করে দলকে তিন পয়েন্ট এনে দেন।
তবে সেই ম্যাচের স্মৃতি মাথায় রেখে আতঙ্কে ভুগতে রাজি নন মোহনবাগান কোচ। বলেন, “ওই ম্যাচে যা হয়েছিল, তা এ বারেও হবে বলে মনে হয় না আমার। এটা নতুন ম্যাচ আর আমাদের দলের অবস্থাও এখন অন্য রকম। অনেকেই দলে ফিরেছে। জাতীয় দলের খেলোয়াড়রাও ফিরে এসেছে। আমরা আমাদের লক্ষ্যে অবিচল রয়েছি। একশো শতাংশ দিয়ে ম্যাচটা জিতব, এটাই আমাদের লক্ষ্য। দলের অবস্থা বেশ ভাল। দলের ছেলেদের ওপর আমার যথেষ্ট ভরসা আছে”।
সেই ম্যাচের জোড়া গোলদাতা নোয়া সাদাউইকে নিয়ে আলাদা করে নিশ্চয়ই পরিকল্পনা ছকে রেখেছে মোহনবাগান। তবে তা ভাঙতে চাইলেন না কোচ। শুধু বলেন, “পুরো গোয়া দলটা নিয়ে ভাবছি। কোনও একজনকে নিয়ে নয়। আমার কাছে আমার দলই সবচেয়ে জরুরি। আমাদের প্রস্তুতিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রতিপক্ষকে বিশ্লেষণ করছি ঠিকই। কিন্তু আমাদের দলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনও কোচের চিন্তার বিষয় পুরো দলটা, কোনও একজন-দুজন নয়। তা ছাড়া প্রতিপক্ষকে নিয়ে বেশি ভেবে লাভ নেই। আমি চাই আমাদের ছেলেরা নিজেদের দল নিয়ে বেশি ভাবুক”।
বুধবারের ম্যাচে আরও এক তারকা নজরে থাকবেন, তিনি মোহনবাগানের প্রাক্তনী কার্ল ম্যাকহিউ, যিনি এখন এফসি গোয়া দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য তারকা। তাঁকে নিয়েও প্রায় একই রকম জবাব দেন হাবাস। বলেন, “কার্লকে নিয়ে আলাদা করে এখন ভাবতে চাই না। ওকে নিয়ে পরিকল্পনা অবশ্যই আছে। তবে ম্যাচ জেতাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। কার্লকে ভালমতোই চিনি। ওকে দলে ফেরানোর ব্যাপারে অনেকদিন আগে আমাদের মধ্যে কথা হয়েছিল। কিন্তু ফুটবল তো এগারো বনাম এগারোর খেলা। একজনের বিরুদ্ধে তো আর খেলতে হবে না আমাদের”।
এ দিন দলের তরুণ ফুটবার অভিষেক সূর্যবংশী সাংবাদিক বলেন, “জুনিয়র দল থেকে সিনিয়র দলে উঠে আসার পথটা বেশ কঠিন ছিল। এখন সিনিয়র দলে এসে অনেক কিছু শিখতে পারছি। রোজই নতুন কিছু না কিছু শিখি। আমার জায়গায় যে সিনিয়ররা খেলে, তাদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করি। নিজেকে ওদের মতো উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি”। বুধবার কঠিন পরীক্ষায় কতটা ভাল খেলতে পারেন তিনি, তা জানার আগ্রহ অনেকেরই থাকবে।
